বিজ্ঞাপন

সাকার মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী প্রফুল্ল মারা গেছেন

December 3, 2020 | 8:59 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নৃশংস হত্যার শিকার চট্টগ্রামের রাউজানের শিক্ষানুরাগী নূতন চন্দ্র সিংহের ছেলে প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ মারা গেছেন, যিনি পিতৃহত্যায় অভিযুক্ত সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীসহ ঘাতকদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। একাত্তরে যে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সাকা চৌধুরী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে, সেই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন প্রফুল্ল।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর বেসরকারি ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে জানিয়েছেন প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহের ছেলে রাজীব সিংহ।

রাজীব সিংহ সারাবাংলাকে জানান, ৮০ বছর বয়সী প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ দীর্ঘদিন ধরে কিডনিজনিত রোগে ভুগছিলেন। নিয়মিত তাকে ডায়ালাইসিস করা হতো। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৮ নভেম্বর তাকে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহের স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে আছেন। শুক্রবার সকালে রাউজানের গহিরায় পারিবারিক শ্মশানে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন রাজীব।

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে নিজ বাড়িতে প্রফুল্ল রঞ্জনের বাবা আয়ূর্বেদিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহ ১৯৬০ সালে নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য দুটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একই এলাকায় বাড়ি ‍কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর।

বিজ্ঞাপন

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নূতন সিংহের গড়ে তোলা সেই প্রতিষ্ঠানগুলো পুড়িয়ে দেয়। তাকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পিতৃহত্যার জন্য ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দায়ী করেছিলেন প্রফুল্ল। সাকা চৌধুরীর যখন দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল, তখনও তার বিচার দাবিতে সোচ্চার হতে কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের বিচার শুরু হলে ট্রাইব্যুনালে ২০১২ সালের ২০ জুন রাষ্ট্রপক্ষের পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সাকা চৌধুরী ও কয়েকজন বাঙালি আমাদের বাড়ি ও কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে আসেন। পাকিস্তানি সেনারা আমার বাবা নূতন চন্দ্র সিংহের কাছে কিছু টাকা ও বই চায়। তারা সেগুলো নিয়ে ফিরে যায়। এরপর আবার ফিরে আসে। এসময় বাবা মন্দিরে প্রার্থনারত ছিলেন। সেখান থেকে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে মন্দিরের সামনে ফেলে গুলি (ব্রাশফায়ার) করে। পরে তাদের সঙ্গে থাকা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পিস্তল দিয়ে বাবার শরীরে আরও তিনটি গুলি করে হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর সেখান থেকে বের হয়ে যায়।’

বিজ্ঞাপন

সাক্ষ্যে প্রফুল্ল আরও জানিয়েছিলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিবুর রহমান রাউজানে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার বাবাকে (নূতন চন্দ্র সিংহ) কাকাবাবু বলে সম্বোধন করতেন। সেই নির্বাচনে তার বাবা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ায় ফজলুল কাদের চৌধুরীর রোষানলে পড়েন। সত্তরের নির্বাচনে রাউজানে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভরাডুবির পর তার বাবাকে একাধিকবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

বেশ কয়েকটি অভিযোগের সঙ্গে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যার দায় প্রমাণিত হওয়ায় সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন আদালত। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর তার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়।

বিজ্ঞাপন

মৃত প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ তাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। এছাড়া তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।

এদিকে প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাউজান থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বৃটিশ আমল থেকে উনাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক। ব্যক্তিগতভাবে উনি আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। আমি অবশ্যই আপনজন হারানোর ব্যাথা অনুভব করছি। আমার মতো পুরো রাউজানবাসী আজ শোকাহত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শুধু নয়, পুরো রাউজানবাসী তাদের পরিবারের পাশে থাকব।’

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন