বিজ্ঞাপন

থামো, শান্ত হও, জেনে-বুঝে খবর ছড়াও

December 6, 2020 | 2:45 pm

আসাদ জামান

হ্যাঁ, আমাদের— মানে, আমরা যারা সংবাদের ফেরিওয়ালা, তাদের একটু থামা উচিত! কেন? এই কেন’র উত্তর দিতে হলে একটু পেছনে ফিরতে হবে।

বিজ্ঞাপন

৫ জুন ২০১১ সালে মারা যান পপ সম্রাট আজম খান। কিন্তু তার মৃত্যুর আগেই তাকে মেরে ফেলেছিলাম আমরা। অর্থাৎ মৃত্যুর দেড় মাস আগেই আজম খানের মৃত্যুর খবর পরিবেশন করেছিলে মূল ধারার বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের ওই খবরের ওপর আস্থা রেখে দেশের অন্যতম প্রধান একটি রাজনৈতিক দল শোকবার্তাও পাঠিয়েছিল!

গণমাধ্যমের হাতে আজম খানের এমন ‘অপমৃত্যু’র ঘটনায় প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ ‘শঙ্কিত’ হয়ে পড়েন। তার শঙ্কাটা ছিল— সাংবাদিকতার ‘বিলো স্ট্যান্ডার্ড লেভেল’ নিয়ে। শুনেছি— তিনি নাকি তার সহকর্মী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমাকে তোমরা মরার আগে মেরে ফেলো না।’

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস— ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি যখন মারা যান, তার আগে কয়েক দফা তাকে মেরে ফেলা হয় এবং সে কাজটিও করেছিলো গণমাধ্যম। অর্থাৎ মারা যাওয়ার আগেই তার মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করেছিল দেশের বেশ কয়েকটি মূলধারার সংবাদ মাধ্যম।

মিডিয়ার হাতে তরতাজা মানুষের সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল গত বছর ২১ এপ্রিল। এবারও শিকার আরেক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব— সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ। ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ-প্রচার করে। কিন্তু এরপরও তিনি এক সপ্তাহ বেঁচেছিলেন!

বিজ্ঞাপন

মৃত্যুর আগেই মেরে ফেলানোর ঘটনার পাশাপাশি এখন পর্যন্ত বেঁচে আছেন— এমন ব্যক্তিদের কয়েক দফা মেরে ফেলানোর নজিরও স্থাপন করেছে এই গণমাধ্যমই। প্রখ্যাত অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরুদ্দিন সরকার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এখনো বেঁচে আছেন। অথচ বেশ কয়েকবার এই তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মেরে ফেলেছে মিডিয়া। নিজেদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে রীতিমতো প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে হয়েছে তাদের!

তাই বলছি— আমাদের একটু থামা উচিত!

বিজ্ঞাপন

উত্তেজনা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর— মিডিয়ার জন্যও! তাই উত্তেজনা প্রশমিত করে মিডিয়া একটু শান্ত থাকলে মন্দ হয় না। উত্তেজনাবশত সংবাদ পরিবেশন মিডিয়ার ‘বিলো স্ট্যান্ডার্ড’ লেভেলটাকে উলঙ্গ করে দেয়! কীভাবে?— দাঁড়ান বলছি।

সবচেয়ে সজ্জন, ধী-বুদ্ধিসম্পন্ন, মিষ্টভাষী, বিচক্ষণ, সৎ লোক হিসেবে সমধিক পরিচিত— যিনি কখনো মন্ত্রিত্বের ভারে ‘ইমব্যালেন্স’ হয়ে পড়েননি। উল্টা-পাল্টা কথা বলে সংবাদের শিরোনাম হননি। তাকে নিয়েও মিডিয়া ‘কচুরিপানা’ সাংবাদিকতায় মেতে উঠেছিল! কেন?— নিউজ খাওয়াতে হবে না?

বিজ্ঞাপন

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এ দেশের মিডিয়ার উত্তেজনা কম নয়! এই অস্বাস্থ্যকর উত্তেজনায় আমরা কখনো বাইডেনকে জিতিয়ে দিয়েছি, কখনো নিরঙ্কুশ বিজয়ের বরমাল্য পরিয়ে দিয়েছি ডোনাল্ড ট্রাম্পের গলায়। হেফাজতকাণ্ডের সময় শাপলা চত্বরে ‘এক কোটি তৌহিদী জনতার’ কাল্পনিক উপস্থিতির গল্প দিনভর প্রচার হয়েছে কোনো কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া।

অন্যদিকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ হিসেবে উপস্থাপন করে সস্তা ও বস্তা পচা ‘রাজনৈতিক’ বাহবা নিয়েছে হঠাৎ জাতির কর্ণধার হয়ে ওঠা বিশেষ একটি প্রিন্ট মিডিয়া। তাই বলছি মিডিয়া একটু শান্ত থাকলে মন্দ হয় না।

জেনে-বুঝে সংবাদ পরিবেশন!— এ দেশের মিডিয়ায় ‘নাই’ হতে বসেছে। বাংলাদেশকে নিয়ে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম ‘এক্সট্রিম সাপোর্ট (Extreem Saport)’-এর বাংলা অনুবাদ ‘জোরালো সমর্থন’ না হয়ে ‘ইন্ধন’ হয়ে যাচ্ছে। সংবাদ পরিবেশনের সময় সংবাদের ফেরিওয়ালারা বুঝতেই চাচ্ছেন না— ‘জোরালো সমর্থনে’র জায়গায় ‘ইন্ধন’ শব্দটা বসিয়ে দেওয়ায় দেশ ও জাতির কতটা ক্ষতি হচ্ছে। তাই সংবাদটা ছড়ানোর আগে একটু জেনে-বুঝে নিলে মিডিয়ার কৌলিন্য রক্ষার পাশাপাশি নিজেদেরও ইজ্জতটাও বাঁচে। নইলে তো আমাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে খবরের ভোক্তাশ্রেণি।

এত যে কথা বলছি— কিসের ওপর ভর করে? হ্যাঁ, তিন বছর আগে জন্ম নেওয়া সারাবাংলা ডটনেট এসব উত্তেজনা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে অনেকটাই মুক্ত। ‘আমরাই আগে দেবো’, ‘আমরাই প্রথম’— এ রকম মানসিকতা সারাবাংলার কখনো ছিল না। জেনে-বুঝে সংবাদ পরিবেশনের পথে শুরু থেকেই হেঁটে আসছে সারাবাংলা। তরপরও সারাবাংলা একেবারেই যে ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে— সেটা দাবি করছি না। তবে এটুকু গ্যারান্টি দিতে পারি, সারাবাংলা বর্তমানে সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা, বস্তুনিষ্ঠতার ব্যাপারে অধিকমাত্রায় সচেতন। নিজস্ব পলিসি অক্ষুণ্ণ রেখে সারাবাংলা তার পাঠককে সঠিক নিউজটাই দেওয়ার চেষ্টা করছে, চেষ্টা করে যাবে— প্রতিষ্ঠার তৃতীয় বর্ষে এটাই সারাবাংলার অঙ্গীকার।

লেখক: স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সারাবাংলা ডটনেট

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন