বিজ্ঞাপন

প্রতিমন্ত্রীর সমাধান ঘোষণা, ড্রাগনের শ্রমিকরা বলছেন বঞ্চিত

December 16, 2020 | 1:50 am

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: পাওনা বঞ্চিত ড্রাগন সোয়েটারের শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে শ্রমিকরা বলছেন, চুক্তি করেও ন্যায্য পাওনা দিতে নারাজ কারখানাটির মালিক। তাদের দাবি পূরণ হয়নি। কারখানাটির স্টাফ ও শ্রমিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের সভাপতিত্বে সরকার, ড্রাগন সোয়েটার কর্তৃপক্ষ, তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন সমূহের প্রতিনিধি ও শ্রমিক নেতাদের এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পরে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিমন্ত্রীর আন্তরিকতা প্রচেষ্টায় ড্রাগন সোয়েটার লি.-এর দীর্ঘদিনের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান হয়েছে। তবে পাওনা বঞ্চিত শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- আইন মানে না ড্রাগন সোয়েটার, পাওনা চাইলে চাকরি যায় শ্রমিকের

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সভায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ড্রাগন সোয়েটারে কর্মরত শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা কী হিসেবে প্রদান করা হবে, এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মালিক শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীনের পরপরই বাংলাদেশ শ্রমিক আইনে শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।’

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ভাতা নিয়ে ড্রাগন সোয়েটারে সমস্যা দেখা দিলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর এবং শ্রম অধিদফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে উভয় পক্ষ বেশ কয়েকবার বৈঠকে সুষ্ঠু সমাধান না হওয়ায় গত ১ ডিসেম্বর শ্রম প্রতিমন্ত্রী সরকার, মালিকদের সংগঠন ও শ্রমিক নেতাদের দিয়ে কমিটি করে দিয়েছিলেন। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে উভয় পক্ষের লাভালাভের বিষয়টি মাথায় রেখে শ্রম আইনের আলোকে সুষ্ঠু সমাধান করা হয়েছে। ড্রাগন সোয়েটার কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুতই শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করবেন বলে প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন- চুক্তি করেও শ্রমিকদের পাওনা দিচ্ছেনা ড্রাগন সোয়েটারের মালিক

বিজ্ঞাপন

তবে ওই কারখানার শ্রমিক কুদ্দুস সারবাংলাকে বলেন, মালিকপক্ষ চুক্তির বাইরে এসে টাকা দিতে চায়। স্টাফদের টাকা দিতে চায় না। শ্রমিকদের কিছু টাকা দেবে, কিন্তু চুক্তি মানবে না। প্রোডাকশন শাখার শ্রমিকদের জন্য ১৫ লাখ টাকা দেবে। ৭৫ জন স্টাফ তাদেরকে তদারকি কর্মকর্তা দেখিয়ে কোনো টাকা না দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তারা নাকি শ্রমিকের সংজ্ঞায় পড়ে না। আমরা আগের চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলেছিলাম। কিন্তু মালিকপক্ষ চুক্তি মানেনি।

এক প্রশ্নের উত্তরে এই শ্রমিক বলেন, আমাদের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে। প্রভাব খাটিয়ে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। শ্রমিকদের টাকা মেরে দিয়েছে। আমরা আদালতের দ্বারস্ত হব।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- ড্রাগন সোয়েটারে ১০ মাসের বেতন পাওনা কর্মচারীদের

জানতে চাইলে শ্রমিকদের আন্দোলনে যুক্ত থাকা গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার সারাবাংলাকে বলেন, আলোচনা হয়েছে। টাকা-পয়সা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখন দেখা যাক শ্রমিকরা কতটুকু পায়।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কর্মচারীদের টাকা দেবে না বলে জানানো হয়েছে। অন্যায়ভাবে তাদের কর্মচারী আখ্যা দিয়ে শ্রমিকদের থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে।

এদিকে কারখানাটির মালিক বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ওসি  মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন- পাওনা আদায়ে আন্দোলন, ড্রাগন সোয়েটারের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা!

এর আগে, শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়— শ্রমিক, মালিক ও সরকারের সমন্বয়ে ত্রিপাক্ষিক চুক্তির পরও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করেনি ড্রাগন সোয়েটারের মালিক। পাওনার প্রায় ৭০ শতাংশ ছাড় দিয়ে শ্রমিকরা যে শর্তে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন, সেই অর্থের মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ দিতে চান বিতর্কিত এই কারখানাটির মালিক। শুধু তাই নয়, বকেয়া পাওনার দাবিতে যে ৫০০ শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন, সেই পাওনাদারের তালিকা থেকে ৩০০ শ্রমিককে বাদ দেওয়া হয়েছে। করপোরেট শাখার ১০ জন শ্রমিকের কোনো পাওনা নেই বলেও দাবি ড্রাগন সোয়েটারের মালিকের। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠান কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী সব শ্রমিকেরই পাওনা রয়েছে মালিবাগের ওই কারখানাটিতে।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর গেল ১২ অক্টোবর কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরির্দশন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায়ের সভাপতিত্বে অধিদফতরের সভাকক্ষে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ওই কারখানার চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুছসহ শ্রমিক ও বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সবার সম্মতিতে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে— প্রত্যেক শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে চাকরির ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রতিবছর চাকরির জন্য ১৫ দিনের মূল মজুরি মালিক কতৃপক্ষ পরিশোধ করবে; জমা থাকা সাপেক্ষে ২০১৮ সালের পরবর্তী সময়ের জন্য প্রত্যেক শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে বাৎসরিক ছুটির (অর্জিত ছুটি) পাওনা শ্রম আইন অনুযায়ী মালিক কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করবে; মালিকের কাছে সঞ্চিত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার সব অর্থ মালিকের কাছে থাকা হিসাব অনুযায়ী মালিক কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করবে। ৭ নভেম্বর, ২২ নভেম্বর, ৭ ডিসেম্বর ও ২২ ডিসেম্বর— এই চার তারিখে চার কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করার বিষয়ে চুক্তি হয় বৈঠকে। কিন্তু ওই চুক্তি মানা হয়নি।

মঙ্গলবারের সবশেষ সভায় মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আব্দুস সালাম, অতিরিক্ত সচিব ড. রেজাউল হক, শ্রম অধিদফতরের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মো. শামসুল আলম খান, ঢাকা জেলার উপমহাপরিদর্শক মো. সালাহ উদ্দিন, বিকেএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম, ড্রাগন সোয়েটারের র মালিক মো. আব্দুল কুদ্দুস, বিজিএমইএ পরিচালক এ এন এম সাইফুদ্দিন, শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ, জলি তালুকদারসহ শ্রম মন্ত্রণালয় এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বেতন-ভাতার দাবিতে ড্রাগন সোয়েটার কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলন— ফাইল ছবি

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন