বিজ্ঞাপন

মূলত সিনহা হত্যার মধ্য দিয়েই বন্ধ হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’

January 4, 2021 | 8:21 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আইন ও শালিস কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত ২০ বছরের বাংলাদেশে মোট তিন হাজার ৪৪ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৯ সালের মার্চ মাসে কোনো ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেনি। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২ আগস্ট সিলেটে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন একজন। এরপর থেকেই আর কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের শুরুতে বন্দুকযুদ্ধ চলমান থাকলেও মেজর (অব.) সিনহা হত্যার মধ্য দিয়েই মূলত দেশে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২ আগস্টের পর আর কোনো ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেনি। সেই হিসেবে বলা যায়, সাড়ে ১১ বছর পর ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ হয়েছে। আইন ও শালিস কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন ১৮৪ জন, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬৭ জন। এছাড়া ২০১৮ সালে নিহত হন ৪২১ জন, ২০১৭ সালে ১৪১ জন এবং ২০১৬ সালে ১৭৭ জন।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গত ৩১ জুলাই রাতে মেজর (অব.) সিনহা হত্যার না ঘটলে হয়তো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ হতো না। যদিও এর দুদিন পর ২ আগস্ট সিলেটে আরও একটি ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। সেখানে একজন নিহত হন। মূলত কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের আইজি ড. বেনজির আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, এটাই শেষ ঘটনা। আর কোনো ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটবে না।

বিজ্ঞাপন

সেনাপ্রধান ওই সময় বলেন, ‘সিনহা মৃত্যুর ঘটনায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ মর্মাহত। তদন্ত কমিটির ওপর সেনাবাহিনী ও পুলিশের আস্থা আছে। এ ঘটনার দায় ব্যক্তির, কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের কোন অবনতি ঘটবে না, চিড়ও ধরবে না।’

জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী এবং পুলিশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। দেশের অগ্রযাত্রায় কাজ করেছে। এই ঘটনায় কেউ যেন সেনা-পুলিশের সম্পর্ক নষ্ট না করে সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তে যারা দোষী হবে এর দায় দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে আইজিপি বলেন, ‘যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরাবার জন্য কোনো কোনো মহল অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কেউ কেউ উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে।’

পুলিশ প্রধান এই উস্কানিমূলক বক্তব্য পরিহার করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘যে ঘটনাটি ঘটেছে, এর জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তবাহিনী নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যারাই অপরাধ করেছে তাদের আইনের আওতায় আনবে। কিন্তু এই ঘটনায় কেউ যেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার না করতে পারে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সম্পর্কের মধ্যে কেউ যেন ফাটল ধরানোর চেষ্টা না করে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। যারা এই চেষ্টা করছে তারা সফল হবে না।’

বিজ্ঞাপন

ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ এবং সেনাবাহিনী দুটি অত্যন্ত পেশাদার বাহিনী। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে অতীতে একসঙ্গে কাজ করেছে। এই ঘটনার তদন্তের যে রিপোর্ট হবে তার ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখন যেন এখানে কেউ উস্কানিমূলক বক্তব্য না রাখে এবং দুই বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরানোর চেষ্টা যেন না করে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইন ও শালিস কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব ও মানবাধিকার কর্মী নুর খান বলেন, ‘অনেক পরে হলেও সরকার তথা প্রশাসনের হুশ হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধের মত ঘটনা এড়িয়ে চলছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে দেশে কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। এরপরেও তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি বলে মনে হচ্ছে। তাহলে আগে কেন বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যা করা হয়েছে?’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে সাধারণ জনগণ ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে।’

অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হয়েছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কখনও ইচ্ছা করে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটায় না। পুলিশের ওপর আক্রমণ করা হলে কেবল আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়ে থাকে। আবার অনেক সময় সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলির সময়ও নিহত হয়ে থাকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ইচ্ছা করে বন্দুকযুদ্ধ ঘটায় না। নিজের ওপর আক্রমণ হলেই কেবল গুলি চালিয়েছে। এখন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাই বন্দুকযুদ্ধের মতো কোনো ঘটনা ঘটছে না। দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। সেগুলো শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। আর ব্যক্তি দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর কখনও পড়ে না। যারাই অপরাধ করুক না কেন আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। আমরা অনেক বড় ও নামি ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনেছি। ভবিষ্যতেও এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন