বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতা-বিজয় পূর্ণতার প্রতীক বঙ্গবন্ধু

January 11, 2021 | 6:16 pm

কবীর চৌধুরী তন্ময়

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতাকামী জনতা তাদের রণকৌশল পেয়ে যায়। যার যা কিছু ছিল, তা নিয়ে প্রস্তুত হতে লাগল। সশরীরে লাখ লাখ উত্তাল জনতা সেদিন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) শেখ মুজিবুর রহমানের শেষ কণ্ঠস্বর অবগাহন করলেও পরের দিন বেতারের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কানে-কানে পৌঁছে যায়, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে’।

বিজ্ঞাপন

‘.... প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলো। এবং আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’-বঙ্গবন্ধু তার বাঙালিদের মুক্ত করতে, স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব দিতে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন বাঙালিদের। তাদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন করেছেন।

সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম হয়েছিল যে পাকিস্তান, শেখ মুজিবুর রহমান সেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। আর ন্যায়সঙ্গত দাবি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন তিনি দীর্ঘ ২৪ বছর। জীবনের সোনালী সময়ের রাজনৈতিক জীবনের ৪ হাজার ৬৮২ দিন তিনি কারাভোগ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

প্রতিটি মানুষের কিছু স্বপ্ন থাকে। জিজ্ঞেস করলে শোনা যায়, কেউ ডাক্তার হবেন, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবেন। আবার কেউ কেউ ব্যবসায়ী, ব্যারিস্টার হতে চায়। এক-একজন মানুষের, এক-একটি স্বপ্ন। আলাদা আলাদা স্বপ্ন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একেবারেই আলাদা। একটি জাতিসত্তা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরোপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র আর সাম্যের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

আর তাই সেই ছাত্রজীবন থেকেই নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। অধিকার বঞ্চিত মানুষদের সাহস দিয়েছেন। যেখানে অত্যাচার হয়েছে, সেখানেই শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আর এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মপ্রত্যয়। মানুষ প্রতিবাদী হয়েছে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে।

বিজ্ঞাপন

যার যা কিছু ছিল, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঙালি। নিরস্ত্র বাঙালি বঙ্গবন্ধুর মন-মন্ত্রময় ভাষণের মুক্তির রণকৌশল নিয়ে একে একে পরাজিত করেছে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও সদস্যদের। পরাভূত করল পাকিস্তানিদের সহযোগী স্বাধীনতাবিরোধী জামাত ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দল ও দলের বিভিন্ন ঘাতক বাহিনীর রাজাকার, আলবদর, আল শামস সদস্যদেরও। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান ত্রিশ লাখ সবুজের মাটিতে শহীদ হয়েছেন। দুই লাখেরও বেশি নারী মুক্তিযোদ্ধা অজস্র অত্যাচার, নির্যাতন আর সম্ভ্রম বিনাশ করেছেন। আর এক কোটিরও বেশি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সব কিছু হারিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। আর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব-মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম লাল-সবুজ’র বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

কিন্তু এ বিজয়, এ অর্জন বাঙালিকে পূর্ণতা দিতে পারেনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার মানুষ। বাঙালির মাঝে আতঙ্ক আর সংশয় বিরাজ করছে। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা কখন মুক্ত হবেন পাকিস্তানি কারাগার থেকে-এ উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ প্রতীয়মান। সবাই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর শুনতে চায়, দেখতে চায় বাঙালির মুজিব ভাইকে। কারণ, “This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.” এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ কথা। শেষ কণ্ঠস্বর যা বেতারের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি শ্রবণ করেছে—স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওই স্বাধীনতা ঘোষণার পর বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা, ভাই, বন্ধু, পিতা, প্রিয় স্বজনের আর দেখা হয়নি, বাঙালি আর কোনও শব্দ শুনতে পায়নি। পুরো বাঙালি জাতির আশা ও বাসনা যে একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে, সেই বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌম বিজয়—রীতিমত অসম্পূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাঙালির মুজিব ভাই খ্যাত শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে বর্বর পাকিস্তানি সেনারা গ্রেফতার করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।

দেশি, বিদেশি পত্র-পত্রিকা থেকে জানা যায়, ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি মালয়েশিয়া নিউজ এজেন্সি সর্বপ্রথম ব্রেকিং নিউজ করে জানায়, ‘পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট ভুট্টো বাংলাদেশের নেতা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছে’। আর এই সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির মুজিব ভাইয়ের মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির প্রাণে। কিন্তু স্বাধীন বাঙালির এই বাঁধভাঙ্গা আনন্দের মাঝেও ঘোর সন্দেহ আর উৎকণ্ঠা বহতা নদীর মতন টলমল করতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে, নয় মাস নির্জন কারাবাসের কষ্টকর যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা অনিশ্চয়তা অতিক্রম করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চাপে ৮ জানুয়ারি মুক্তিলাভ করেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময়ের পত্রিকাগুলো থেকে জানা যায়, ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডি থেকে পাকিস্তান সরকারের চার্টার করা পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়ে গ্রিনিচ সময় ৬টা ৩৬ মিনিট (বাংলাদেশ সময় ১২টা ৩৬ মিনিট) হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছেন।

আর হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতির প্রটোকল দেওয়া শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু লন্ডন পৌঁছেছেন—এই খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে প্রথমেই ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ বলে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্বোধন করেন, সমাদৃত করেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা হ্যারল্ড উইলসন। এরপর বঙ্গবন্ধু ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে দেখা করেন। তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী সফরে থাকলেও বঙ্গবন্ধু আসার খবরে তার সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরেন। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গাড়ি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছানোর সাথে সাথে এডওয়ার্ড হিথ নিজে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে নামা পর্যন্ত।

সেদিন লন্ডনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘‘....আজ আমি স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এ মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে তখন আমি ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’র দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটিয়েছি।...পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুনানি অর্ধেক সমাপ্ত হবার পর পাক কর্তৃপক্ষ আমার পক্ষ সমর্থনের জন্যে একজন আইনজীবী নিয়োগ করে। আমি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ‘বিশ্বাসঘাতক’-এর কলঙ্ক নিয়ে মৃত্যুদন্ডের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর, আমার বিচারের জন্যে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল তার রায় কখনও প্রকাশ করা হবে না। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠান করে আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ফন্দি এঁটেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে অস্বীকার করেন। জনাব ভুট্টো আমাকে না বলা পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। জেলখানা এলাকায় বিমান আক্রমণের জন্যে নিষ্প্রদীপ জারি করার পর আমি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা জানতে পারি। জেলখানায় আমাকে এক নিঃসঙ্গ ও নিকৃষ্টতম কামরায় বন্দী করে রাখা হয়েছিল যেখানে আমাকে তারা কোনো রেডিও, কোনো চিঠিপত্র দেয় নাই। এমনকি বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে, তা জানতে দেয়া হয় নাই।”

আর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের দুর্বিষহ কালরাতের পর ১৯৭২ সালের ৮ তারিখই প্রথমবারের মতো ‘তোমরা সবাই বেঁচে আছো তো’ বলেই পরিবারের সাথে কথা বলা শুরু করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথমে বড় ছেলে শেখ কামাল, পরে ক্রমান্বয়ে বেগম মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ছোট ছেলে শেখ রাসেলের সঙ্গে কথা বলেন। পাকিস্তান কারাগারের ৯ মাসের দুর্বিষহ ঘটনাগুলো পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের কণ্ঠ শুনতে পান। বেগম মুজিব আবেগঘন কণ্ঠে শুভেচ্ছা বিনিময়ও করেন।

বঙ্গবন্ধু লন্ডনে অবস্থানকালেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা হয়। ইন্দিরা গান্ধী তখন নয়াদিল্লী সফরের আমন্ত্রণও জানান। শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মাধ্যমে ভারতের জনগণকে অভিনন্দন জানান। এরপর ইন্দিরা গান্ধী জানতে চান, “কেমন আছেন?” জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি ভালো আছি। আমি আপনাদের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ।”

৮ তারিখেই বঙ্গবন্ধুর কথা হয়েছিল তারই ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। টেলিফোনে যুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, “হ্যালো তাজউদ্দীন, আমি সাংবাদিক পরিবৃত আছি, তাদের কী বলবো? দেশের মানুষ কেমন আছে? বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে যে অগণিত নারী-পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছেন, এই মুহূর্তে তাদের কথা আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে।”

পরদিন বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বহরের কমেট জেটে করে স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হলেন। বিমানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন দুইজন ভারতীয় কূটনীতিবিদ—ভেদ মারওয়া ও শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি।

দিল্লীতে বিমান অবতরণের পর এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সূচনা হয়। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এক ঐতিহাসিক অভ্যর্থনার আয়োজন করেন। তখনকার পত্র-পত্রিকা থেকে জানা যায়, ভারতের ইতিহাসে ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ে এক সঙ্গে উপস্থিত থেকে বিমানবন্দরে এমন করে কোনো অতিথিকে অভ্যর্থনা—এটিই স্মরণীয়। শুধু তাই নয়, দিল্লীর বিমানবন্দরে ইন্দিরা গান্ধী তার পুরো ক্যাবিনেট নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সেই কনকনে শীতের সকালেও। আর এই ধরণের অভ্যর্থনা বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল বলে অনেকে বর্ণনা করেন।

১১ জানুয়ারি ভারতের বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রতিবেদনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে এটি প্রতীয়মান হয়। দিল্লি থেকে ‘যুগান্তর’ সেদিন জানিয়েছিল—‘পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগৃহে ৯ মাসের অধিককাল যাপনের পর স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান আজ সকালে লন্ডন থেকে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি কমেট বিমানে এখানে এসে পৌঁছুলে তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিপুল সংবর্ধনা জানানো হয়। স্বাধীনতার পর গত ২৫ বৎসর বহু রাষ্ট্রপ্রধানকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছে, কিন্তু এমনটি আর কখনও দেখা যায়নি। এ যেন যুদ্ধজয়ের পর স্বদেশ প্রত্যাগত বীরের প্রতি সংবর্ধনা। অভ্যর্থনার স্বতস্ফুর্ততা ও আন্তরিকতার জন্য আজ দিনটি স্মরণীয়। ...২১ বার তোপধ্বনি করে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। মুজিব বিমান থেকে বেরিয়ে এলে সমবেত জনতার ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবের বিমানটি যখন অবতরণ করে তখন বিমানঘাঁটিতে ভারতের ত্রিবর্ণরক্ষিত জাতীয় পতাকা ও বাংলাদেশের সবুজ পটভূমিকায় লাল ও সবুজ রঙের জাতীয় পতাকা উড়ছিল। সেনাবাহিনীর ব্যান্ডে দুই দেশের জাতীয় সংগীত ‘জনগণ মন’ ও ‘সোনার বাংলা’ বাজতে থাকে। শেখ মুজিবের আগমনের পরে ভারতীয় স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর ১৫০ জনের সম্মিলিত গার্ড অব অনার পরিদর্শন করে। বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি দিয়ে তার প্রীতিভাষণ শেষ করেন। কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষ হওয়ার পর শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্যারেড গ্রাউন্ড অভিমুখে যাত্রা করেন। প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও হাজার হাজার নর-নারী পথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ‘জয় বাংলা’ ও ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানান। বিমানঘাঁটি থেকে ২ কিলোমিটার দূরে প্যারেড গ্রাউন্ডে যখন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধীর সঙ্গে শেখ মুজিব এসে পৌঁছান তখন মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হতে থাকে। বাংলাদেশের স্রষ্টার ভাষণ শোনার জন্য সমবেত হাজার হাজার নর-নারীর কণ্ঠে শুধু ‘মুুজিবুর রহমান জিন্দাবাদ’, ‘ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ’ ধ্বনি শোনা যায়। বিমানঘাঁটিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভেকিয়া, মঙ্গোলিয়া, পূর্ব জার্মানি, ভুটানসহ বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণ ইংরেজিতে শুরু করেন। তিনি ‘ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টার শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’ বলে তার বক্তৃতা শুরু করতেই জনতা শেখ মুজিবকে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান। জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি তখন বাংলায় তার ভাষণ দেন। এতে জনসাধারণ তাকে চিৎকার করে অভিনন্দন জানান। শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, ভারত ও বাংলাদেশের মৈত্রী চিরস্থায়ী হবে। বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যে পৈশাচিক ও কাপুরুষোচিত অত্যাচার চালিয়েছে ইতিহাসে কোনো শাসকের এরূপ জঘন্য অত্যাচারের কথা জানা যায়নি। তিনি আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, “বাংলাদেশ বলতে গেলে এক নারকীয় তাণ্ডবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে।...এক কোটির বেশি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পুরুষদের সামনেই মা-বোনদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়। কী অন্যায় করেছিল বাঙালিরা? তারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চেয়েছিল—এটাই ছিল তাদের অন্যায়। বাঙালিরা বাঁচতে চেয়েছিল কিন্তু তার জবাবে তারা পেয়েছে বুলেট। বাংলাদেশ এখন একটা স্বাধীন রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ ও ভারত চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। এই দু’টি দেশ চিরদিন শান্তি ও বন্ধুত্বের মধ্যে বসবাস করবে।”

স্বাধীনতা ও বিজয়ের পূর্ণতার বাংলাদেশের আকাশ ছিল এক উত্তাপে ভরা সকাল। রাজধানী ঢাকার রাজপথে রাজপথে মানুষের জয়ধ্বনি, আনন্দঘন মিছিল। তখনকার গণমাধ্যমের রিপোর্ট আর দেশি-বিদেশি সিনিয়র সাংবাদিকদের স্মৃতি থেকে জানা যায়, ঢাকার রাজপথ ছিল মিছিলে মিছিলে একাকার। রাস্তা ও রাজপথের অলিগলিতে খণ্ড-খণ্ড মিছিল। পুরনো বিমানবন্দর বা কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে ঢাকার রেসকোর্স (বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দান জুড়ে জনতার মিছিল, বাঙালির মিছিল, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ‘মুজিব ভাই’ আগমনের মিছিল। কেউ মিছিল নিয়ে কুর্মিটোলার দিকে যাচ্ছে, আবার কেউ তাদের পাশ ঘেঁষে আরেকটি মিছিল নিয়ে রেসকোর্স ময়দানের দিকে ফিরে আসছে। মাঝে মাঝে ফাঁকা গুলি। ‘জয় বাংলা’র জয়ধ্বনিতে মুখরিত পুরো রাজধানী। রূপকথার গল্পকে হার মানিয়ে পুরো বিশ্বকে জয় করেই বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে ফিরে এসেছেন বাঙালির কাছে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা জানিয়েছে, সেদিন ঢাকার রাজপথে ১০ লাখ লোক হয়েছিল। পত্রিকাটি আরও জানায়, এই লোকের সংখ্যা আরও বেশি হতো যদি ঢাকায় আসার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতো। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির খবরে মুক্তিকামী জনতা দেশের শহরতলী বা কাছাকাছি জেলা শহরগুলো থেকে রাজধানী ঢাকায় আসার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। জনস্রোতের অনেকেই পথে পথে আটকা পড়তে হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অধিকাংশ কালভার্ট, ব্রিজ ভেঙে গিয়েছিল। খাল, নদী, নালা পারাপারের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। তারপরেও বাঙালি জাতির প্রাণ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এক পলক দেখার জন্য, একটু তার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য রীতিমত পায়ে হেঁটে দূরদূরান্তে থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে, পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।

প্রিয় নেতা মুজিব ভাইকে ফিরে পেয়ে বাঙালি সেদিন জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ বাতাস। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে খোলা ট্রাকে করে বঙ্গবন্ধু পৌঁছান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেখানে দাঁড়িয়ে প্রায় কুড়ি মিনিটের আবেগঘন বক্তৃতায় সদ্য স্বাধীন জাতির উদ্দেশ্যে জাতির পিতা বলেন—পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দিদশায় তিনি ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, বাঙালিকে কেউ ‘দাবায়ে রাখতে’ পারবে না। “..যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কি-না। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।”

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন