বিজ্ঞাপন

দীনতা তোমার আড়াল করছ শারীরিক সীমাবদ্ধতার নামে

January 11, 2021 | 6:30 pm

কবির য়াহমদ

বাংলাদেশের সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) হতে পারবেন না, এমন সিদ্ধান্তে হাইকোর্টের একটি রায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত এই রায়ে নারীর মাসিক বা তাদের ভাষায় ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশনের ব্যাপার উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ রয়েছে নারী বিয়ে পড়াতে মসজিদে যেতে পারবেন না, উল্লেখ রয়েছে নারী রাতবিরাতে বিয়ে পড়াতে বাইরে যেতে পারবেন না। অন্যান্য দাফতরিক কার্যক্রমের মতো নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ আলাদা বলে নারীদের এই কাজের অনুমতি দেওয়া হয়নি। উল্লিখিত বিষয়গুলো আইনজীবীদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নারী কাজী হতে পারবেন না কি না এই আলোচনার অবতারণার ইতিহাসটি এখানে উল্লেখ প্রাসঙ্গিক। পত্রিকান্তরে জানা যাচ্ছে, ২০১৪ সালে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়িয়ার পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে তিন নারীর নাম প্রস্তাব করে উপদেষ্টা কমিটি। তিন সদস্যের ওই প্যানেলের বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ জুন আইন মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’ মর্মে চিঠি দিয়ে তিন সদস্যের প্যানেল বাতিল করেন। পরে আইন মন্ত্রণালয়ের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্যানেলের এক নম্বর ক্রমিকে থাকা আয়েশা সিদ্দিকা। সেই রিটের শুনানি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের চিঠি কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। শুনানি শেষে জারি করা রুলটি খারিজ করে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। রোববার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

নারীরা বিয়ের কাজী হতে পারবে না, হাইকোর্টের রায়

বিজ্ঞাপন

‘হাইকোর্টের রায় সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৪০ অনুচ্ছেদ পরিপন্থি’

রায় প্রসঙ্গে আইনজীবীদের মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। আইনজীবী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘‘আদালতের প্রকাশিত রায়টির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নারীরা মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশনে (শারীরিকভাবে অসুস্থ) থাকেন। সেক্ষেত্রে মুসলিম বিবাহ হচ্ছে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আমাদের দেশে বেশিরভাগ বিয়ে মসজিদে পড়ানো হয়ে থাকে। ওই সময়ে নারীরা মসজিদে প্রবেশ করতে পারেন না এবং তারা নামাজও পড়তে পারেন না। সুতরাং বিয়ে যেহেতু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সেহেতু এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নারীদের দিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়।’’ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস কে সাইফুজ্জামান বলছেন, ‘‘আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, একজন নারী একজন মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হতে হলে কিছু কিছু কার্যক্রম করতে হয়। নারী হিসেবে সব জায়গায় যেতে পারবেন কিনা। রাতবিরাতে বিয়ের অনুষ্ঠান হতে পারে। সেখানে যেতে পারবেন কিনা। মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রারদের কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে নারীদের প্রত্যেক মাসে একটি বিশেষ সময় আসে, যে সময়টাতে ধর্মীয়ভাবেই নারীরা মসজিদেও যেতে পারেন না। আবার নামাজও পড়তে পারেন না। এ সময় যদি কারও বিয়ের অনুষ্ঠান হয়, সেখানে তো কোনো নারী যেতে পারবে না। তাই পাবলিক অফিসের নারীদের অন্যান্য কাজের থেকে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কার্যক্রমটি একেবারেই আলাদা।’’

বিজ্ঞাপন

দেখা যাচ্ছে, একজন নারীর বিবাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী হতে কথিত ধর্মীয় বিধিনিষেধকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নারীর ঋতুস্রাবকে এখানে শারীরিকভাবে অসুস্থতাকে অযোগ্যতা হিসেবে নির্ণয় করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, মুসলিমদের বিবাহ সাধারণত মসজিদে হয়, এবং মসজিদে নারী প্রবেশ করতে পারেন না। বলা হচ্ছে নারী রাতবিরাতে বাইরে যেতে পারবেন না। খেয়াল করে দেখুন এই বিষয়গুলোর অধিকাংশই কি পশ্চাৎপদ চিন্তার প্রকাশ নয়? এতে চিন্তার দীনতার কি প্রকাশ হয়ে গেল না? নারী অন্তঃপুরবাসিনী এই তত্ত্বকে কি এখানে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে না? এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে যে বার্তা গেল সেখানে নিশ্চিতভাবেই ঋতুস্রাবকে নারীর অযোগ্যতা, নারীর সীমাবদ্ধতা হিসেবে কি দেখানো হচ্ছে না?

কাজী পদের যোগ্যতায় সামাজিক ও ধর্মীয় যে বিধিনিষেধ ও সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এটা সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণের অন্তরায় বলে মনে করি। শারীরিকভাবে অসুস্থ হিসেবে যে বিষয়টির অবতারণা হয়েছে সেটা কোনোভাবেই নারীর সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটা প্রকৃতি প্রদত্ত ব্যবস্থা। মানুষের বংশ প্রক্রিয়াসহ নানাবিধ ব্যাপার যেখানে জড়িত সেটাকে ‘নিষিদ্ধ’ করে রাখার, নিষিদ্ধ হিসেবে দেখার এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ আর যাই হোক আমাদের অগ্রগতির স্মারক নয়। এর-মাধ্যমে নারীকে অচ্ছুৎ করে দেখার, অচ্ছুৎ করে রাখার আদি ও পশ্চাৎপদ মানসিকতাকেই বরং স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘নারীও মানুষ’ এ বিশ্বাসটাই এখানেই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। কথিত শারীরিকভাবে অসুস্থতার সময়ে নারী কাজী হলে বিয়ে পড়াতে পারবে না, এটা কী ধরনের যুক্তি? এই যুক্তিকে যদি আমলে নেওয়া হয় তাহলে কথিত এই ‘ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশন’-এর সময়ে অন্য সকল জায়গায় নারীর কোনো কাজই অবৈধ হিসেবে ধরা হবে? কথিত এই ‘ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশন’-এর সময়ে নারী কি সংসারে-সমাজে কোনোকিছুই করতে পারবে না? এইধরনের নানা বিভ্রান্তি এখানে সামনে আসে। এটা বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন আসতো না যদি নারীকে কাজী হিসেবে অযোগ্য সিদ্ধান্ত দিতে আইনি এই আদেশ না আসত।

বিজ্ঞাপন

বিবাহ কি স্রেফ ধর্মীয় বিষয়, অনুষ্ঠান? নাকি এটা সামাজিক ও পারিবারিক প্রবণতা ও রীতি—এই প্রশ্নটিও এক্ষেত্রে সামনে আসে। বিবাহ কি কেবলই মুসলমানেরা করে থাকেন? প্রতি ধর্মে যেখানে বিবাহ ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে এটাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ভাবার অবকাশ নাই। সকল সমাজে-দেশে বিবাহ নামক ব্যবস্থা চালু আছে বলে এটাকে সামাজিক রীতি হিসেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে বিবাহের সময়ে ধর্মে বিশ্বাসীরা নিজেদের ধর্মের কিছু রীতি পালন করে থাকে বলে এটাকে স্রেফ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ভাবা ঠিক হবে না। এছাড়া আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এখানকার সকল মুসলমান মসজিদে গিয়ে বিয়ে করে থাকে, মসজিদে বিয়ে পড়ানো হয় এটা সর্বাংশে সঠিক নয়। বাস্তবতা বিবেচনায় এক শতাংশ লোকেরও বিয়ে মসজিদে সম্পাদিত হয় না। আলোচনার স্বার্থে এক শতাংশ কিংবা অন্য যে কোনো সংখ্যক লোকের বিয়ে মসজিদে সম্পাদিত হয়ে থাকলেও ওখানে কনের উপস্থিতি থাকে না। কথিত এই ‘ফিজিক্যাল ডিসকোয়ালিফেশন’-এর সময়ে বিয়ের দিন ধার্য হলে কোনো নারীর বিয়েও আটকে গেছে এমনটাও হয় না বলে ধারণা করি। তাহলে কেন এখানে নারীকে বিবাহ রেজিস্ট্রার হতে এই আইনি বাধা দেওয়া হবে? নারী রাতবিরাতে বাইরে যেতে পারবে না এমন অজুহাতও আছে এখানে। এটা চূড়ান্ত রকমের চিন্তার দীনতা। এই দীন চিন্তায় আচ্ছন্ন সমাজ বলে এখনও নারী পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত। এটা প্রগতির পথে অন্তরায়, একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত।

শেষ করি এদিকে, রিটকারীর এক আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিমের মন্তব্য দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘‘দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। নারীরা বিমানের পাইলট হচ্ছেন, সশস্ত্র বাহিনীতেও কাজ করছেন। তাহলে কেন নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না?’’ তার প্রশ্নের মতো একই প্রশ্ন আমাদেরও। পাশাপাশি সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ ও অগ্রগতির অন্তরায় হয়ে থাকা সকলের উদ্দেশে একটি কথাই বলি—দীনতা তোমার আড়াল করছ শারীরিক সীমাবদ্ধতার নামে!

বিজ্ঞাপন

লেখক: প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন