বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন প্রয়োগের রোডম্যাপ

January 12, 2021 | 12:27 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে আগামী ২১ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটের তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে আসবে। এরপর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই দেশে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনলাইন নিবন্ধনের জন্য ২৬ জানুয়ারি থেকে ‘সুরক্ষা’ নামের একটি মোবাইল ও ওয়েব-ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হতে পারে। দেশে ভ্যাকসিন আসার পরে মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে প্রয়োগ করা হবে। এরপর এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ শেষে মাঠ পর্যায়ে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা শুরু হবে।

বিজ্ঞাপন

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগের ব্যবস্থাপনা

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, বেক্সিমকো ফার্মা আমাদের জানিয়েছে, ২১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে যে কোনো দিন ভ্যাকসিন নিয়ে আসতে পারবে। বিদেশে রফতানি করতে সিরাম ইন্সটিটিউটের যে আইন কানুন আছে তা সম্পন্ন করতে এই সময়টুকু লাগবে। দেশে আসার পরে ভ্যাকসিন শুরুতে রাখা হবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ওয়্যার হাউজে। কিছু কাগজপত্র ঠিক করে পরে তা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্ধারিত স্থানে পাঠিয়ে দেবে।

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বৈঠক হয়েছে। ভ্যাকসিন ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানো পর্যন্ত যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা দেবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা

চুক্তি অনুযায়ী সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে পাওয়া ৩ কোটি বা ততোধিক ডোজ ভ্যাকসিন ৬টি ধাপে সরাসরি বাংলাদেশের নির্ধারিত জেলা ইপিআই কোল্ড স্টোরগুলোতে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটক্যাল লিমিটেড।

বিজ্ঞাপন

দেশের ৬৪ জেলার ইপিআই স্টোরে (ডব্লিউআইসি/আইএলআর) এক লাখ থেকে চার লাখ ২৫ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন রাখা যাবে। এছাড়াও ৪৮৩টি উপজেলার ইপিআই স্টোরে (আইএলআর) রাখা যাবে সাত হাজার একশ ডোজ ভ্যাকসিন। কোল্ড বক্সে ৯শ ডোজ ভ্যাকসিন পরিবহন করে নেওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করবো। তা যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য দেশের সব জেলা ও সিটি করপোরেশনের ইপিআই সেন্টারে ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়ার মাধ্যমে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে জাতীয় পর্যায়ে কোল্ড চেইন ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বিএডিসি ও অন্যান্য জায়গা থেকে কোনো রুম ভাড়া নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিনেশন সেন্টার পরিকল্পনা

দেশের বিভিন্ন জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ, বিশেষায়িত হাসপাতাল, পুলিশ-বিজেপি হাসপাতাল ও সিএমএইচ, বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য সাত হাজার ৩৪৪টি দল তৈরি করা হয়েছে। একটি দলের মধ্যে ছয়জন সদস্য থাকবে। এর মধ্যে দু’জন ভ্যাকসিনদানকারী (নার্স, স্যাকমো, পরিবারকল্যাণ সহকারী) ও চারজন স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন।

ভ্যাকসিন বিষয়ক প্রশিক্ষণ

ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১২ থেকে ১৩ জানুয়ারি জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ১৬ থেকে ১৭ জানুয়ারি জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়াও ১৮ থেকে ১৯ জানুয়ারি জাতীয় পর্যায়ে জেলা প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ডেপুটি সিভিল সার্জন, এমওসিএস অথবা এমওডিসি, ইউএইচএফপিওদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে জেলা ও উপজেলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ২০ থেকে ২৪ জানুয়ারি। উপজেলা পর্যায়ে প্রথম সারির সুপারভাইজার ও ভ্যাকসিন দানকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ২৩ থেকে ২৬ জানুয়ারি। ২৬ থেকে ২৭ জানুয়ারি দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবক ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবকদের ওরিয়েন্টশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরবর্তীতে কোনো প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেলে সে সময়ের করণীয় বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে। এক্ষেত্রে ২০ জানুয়ারি জাতীয় পর্যায়ে চিকিৎসক, নার্সদের এইএফআই (ভ্যাকসিন দান পরবর্তী বিরূপ ঘটনা) প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দেশের জেলা পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্সদের জন্য কোভিড-১৯ এইএফআই সার্ভিলেন্স ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি। দেশের উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্সদের জন্য কোভিড-১৯ এইএফআই সার্ভিলেন্স ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি। একই সঙ্গে এ সময়ে সিটি করপোরেশন পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্সদের জন্য কোভিড-১৯ এইএফআই সার্ভিলেন্স ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এছাড়াও ২৬ জানুয়ারি জাতীয় এইএফআই এক্সপার্ট রিভিউ কমিটির করণীয় সম্পর্ক নির্ণয় বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দেশের বিভাগীয় এইএফআই এক্সপার্ট রিভিউ কমিটির কারণিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ২৭ থেকে ২৮ জানুয়ারি।

নিবন্ধন করতে হবে অ্যাপের মাধ্যমে

ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনলাইন নিবন্ধনের জন্য ২৬ জানুয়ারি থেকে ‘সুরক্ষা’ নামের একটি মোবাইল ও ওয়েবভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, দেশে ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরুর জন্য সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। সে জন্য আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে একটি অ্যাপ্লিকেশন চালু করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। ‘সুরক্ষা’ নামের একটি মোবাইল ও ওয়েবভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহীরা নিবন্ধন করতে পারবেন।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা জেলা প্রশাসন কার্যালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বয়ে এই অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুরক্ষা অ্যাপ্লিকেশনে কেউ প্রবেশ করলে তাকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মতারিখ উল্লেখ করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেখে অ্যাপ্লিকেশনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনআইডি ডাটাবেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বাকি তথ্য পূরণ করে নেবে। এসময় ভ্যাকসিন গ্রহীতাকে আরও কিছু তথ্য দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিবন্ধন করার সময়েই ভ্যাকসিন গ্রহীতাকে তার ডায়াবেটিস, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য রোগ আছে কি না, সেই তথ্যগুলো জানাতে হবে।

নিবন্ধনের দ্বিতীয় ধাপে ভ্যাকসিন গ্রহীতাকে তার বর্তমান ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিতে হবে। এ সময় অ্যাপ্লিকেশন থেকে নিবন্ধনকারীর দেওয়া মোবাইল নম্বরে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) পৌঁছে যাবে। এই ওটিপি দিয়ে অ্যাপ্লিকেশনটিতে প্রবেশ করতে হবে। সেখান থেকে গ্রহীতার দেওয়া তথ্যানুযায়ী একটি ভ্যাকসিন কার্ড তৈরি করে দেওয়া হবে। সেই কার্ডেই উল্লেখ থাকবে ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ কবে এবং কখন সময়ে দেওয়া হবে।

দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া শেষ হলে গ্রহীতা এই অ্যাপ্লিকেশন থেকেই কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে মর্মে একটি প্রত্যয়ন-পত্র বা সনদ ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এছাড়া যদি কখনও বিশ্বের কোনো দূতাবাস বা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কারও ভ্যাকসিন পাওয়া বিষয়ে তথ্য জানতে চায়, তবে সেটিও ওয়েব-পোর্টালের সাহায্যে জেনে নিতে পারবেন।

ভ্যাকসিন প্রয়োগ প্রক্রিয়া

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার নতুন তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ডোজ দেওয়ার দুই মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া যাবে। সে কারণে প্রথম চালানে পাওয়া ভ্যাকসিন প্রথম মাসেই একসাথে ৫০ লাখ মানুষকে দেওয়া হবে। কারণ দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য আমরা ৮ সপ্তাহ সময় পাব। এর মধ্যে ভ্যাকসিনর আরও চালান চলে আসবে। এভাবে আমরা বেশি সংখ্যক মানুষকে দ্রুত ভ্যাকসিন দিতে পারব।

কোভিড ভ্যাকসিন প্রয়োগ পরিকল্পনা তুলে ধরে ডা. শামসুল হক বলেছেন, তালিকাভুক্ত জনগোষ্ঠীকে ৮ সপ্তাহ ব্যবধানে (১ম ডোজের ৮ সপ্তাহ পর ২য় ডোজ) ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিকদের ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে। কেউ যদি ২ ডোজ ভ্যাকসিন গ্রহণে ইচ্ছুক হন তবে তাকে অবশ্যই ২ ডোজের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান নির্ধারিত ৮ সপ্তাহ দেশে অবস্থান করতে হবে। এক্ষেত্রে তাকে বৈধ কাগজ-পত্রাদি (পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ইত্যাদি) দাখিল করতে হবে।

সুরক্ষা নামের অ্যাপ্লিকেশনে নিবন্ধন করার পরে দেশে ফেব্রুয়ারি মাসে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হবে। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন আসার পরে শুরুতেই মাঠ পর্যায়ে তা দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন আসার পরে কোনো মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে প্রয়োগ করা হবে। এরপর এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ শেষে মাঠ পর্যায়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা শুরু হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী ভ্যাকসিন পাবার তালিকাতে ফেজ-১ এর এ-তে থাকছেন ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ এক কোটি ৫০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে কোডিভ-১৯ স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি সম্পৃক্ত চার লাখ ৫২ হাজার ২৭ জন সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী প্রথম মাসেই ভ্যাকসিন পাবেন।

কোডিভ-১৯ স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি সম্পৃক্ত সকল অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছয় লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ভ্যাকসিন পাবেন। এর পরে দেশের দুই লাখ ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে।

দেশের পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৬১৯ জন সম্মুখ সারির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য প্রথম মাসে ভ্যাকসিন পাবেন। দ্বিতীয় মাসেও একই সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ভ্যাকসিন পাবেন।

তিন লাখ ৬০ হাজার ৯১৩ জন সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মাঝে প্রথম মাসেই এক লাখ ৮০ হাজার ৪৫৭ জন ভ্যাকসিন পাবেন। দ্বিতীয় মাসেও একই সংখ্যক সদস্য ভ্যাকসিন পাবেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় অপরিহার্য কার্যালয়ের ৫০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাঝে প্রথম মাসে ২৫ হাজার ও দ্বিতীয় মাসে ২৫ হাজার ভ্যাকসিন পাবেন। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিত এক লাখ ৭৮ হাজার ২৯৮ জন জনপ্রতিনিধির মাঝে প্রথম মাসে ৮৯ হাজার ১৪৯ জন এবং ২য় মাসে সমান সংখ্যক জনপ্রতিনিধি ভ্যাকসিন পাবেন।

সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সম্মুখসারির এক লাখ ৫০ হাজার কর্মচারীর মাঝে প্রথম মাসে ৭৫ হাজার ও দ্বিতীয় মাসে সমান সংখ্যক কর্মচারী ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাঁচ লাখ ৪১ হাজার প্রতিনিধির মাঝে প্রথম মাসে কেউ ভ্যাকসিন পাবেন না। তবে দ্বিতীয় মাসে দুই লাখ ৭০ হাজার ৫০০ জন এবং ৫ম মাসে সমান সংখ্যক ধর্মীয় প্রতিনিধিরা ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃতদেহ সৎকার কাজে নিয়োজিত ৭৫ হাজার ব্যক্তির মাঝে প্রথম মাসে ৩৭ হাজার ৫০০ জন এবং দ্বিতীয় মাসে সমান সংখ্যক ব্যক্তি ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশে জরুরি পানি, গ্যাস, পয়নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবহন কর্মচারীদের সংখ্যা চার লাখ। এর মাঝে প্রথম মাসে ২ লাখ এবং ২য় মাসে সমান সংখ্যক ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশের বিভিন্ন স্থল, নৌ ও বিমান বন্দরের এক লাখ ৫০ হাজার কর্মীর মাঝে প্রথম মাসে ৭৫ হাজার এবং ২য় মাসে ৭৫ হাজার ভ্যাকসিন পাবেন।

এছাড়াও এক লাখ ২০ হাজার প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিকদের মাঝে প্রথম মাসে ৬০ হাজার এবং ২য় মাসে সমান সংখ্যক শ্রমিককে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

জেলা ও উপজেলাসমূহে জরুরি জনসেবায় সম্পৃক্ত চার লাখ সরকারি কর্মচারীর মধ্যে প্রথম মাসে দুই লাখ এবং ২য় মাসে দুই লাখ ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

দেশের এক লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন ব্যাংক কর্মকর্তা কর্মচারীকে ২য় মাসে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

দেশের ৬ লাখ ২৫ হাজার স্বল্প রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জনগোষ্ঠী(যক্ষ্মা, এইডস রোগী, ক্যান্সার রোগী) ও ৮০ বছরের উপরে থাকা ১৩ লাখ ১২ হাজার ৯৭৩ জনের সবাই প্রথম মাসেই ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশে থাকা ৭৭ থেকে ৭৯ বছরের বয়সসীমার ১১ লাখ ৩ হাজার ৬৫৩ জন প্রথম মাসেই ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশে ৭৪ থেকে ৭৬ বছরের বয়সী ৯ লাখ ৫৩ হাজার ১৫৩ জন দ্বিতীয় মাসে ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশের ৭০ থেকে ৭৩ বছর বয়সসীমার ২০ লাখ ৬ হাজার ৮৭৯ জন দ্বিতীয় মাসে ভ্যাকসিন পাবেন।

এছাড়াও দেশের ৬৭ থেকে ৬৯ বছর বয়সসীমার ২৪ লাখ ৭৫ হাজার জনসংখ্যা ভ্যাকসিন পাবে পঞ্চম মাসে। তবে এই বয়সসীমার ২২ লাখ ৪ হাজার ৫০০ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে এই সময়ে।

দেশের ৬৪ থেকে ৬৬ বছর বয়সসীমার ২৪ লাখ ৭৫ হাজার জনসংখ্যা পঞ্চম মাসে ভ্যাকসিন পাবেন।

দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় দলের ২১ হাজার ৮৬৩ জন খেলোয়াড়দের (ফুটবল, ক্রিকেট, হকি ইত্যাদি) মাঝে প্রথম মাসে ১০ হাজার ৯৩২ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। দ্বিতীয় মাসেও সমান সংখ্যক খেলোয়াড় ভ্যাকসিন পাবেন।

এছাড়াও দেশে জরুরি প্রয়োজনে এবং মহামারি মোকাবিলায় অতিরিক্ত হিসেবে প্রথম মাসে ৭০ হাজার, ২য় মাসে ৫০ হাজার এবং ৫ম মাসে ৫০ হাজার জন ভ্যাকসিন রাখা হবে।

সর্বমোট দেড় কোটি লোকের প্রথম মাসে ৫০ লাখ, ২য় মাসে ৫০ লাখ এবং ৫ম মাসে ৫০ লাখ ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খসড়া পরিকল্পনা বিষয়ে জানিয়ে ডা. শামসুল হক বলেছেন, এছাড়াও আগামী মার্চ থেকে জুনের মধ্যে যেকোনো সময়ে কোভ্যাক্স থেকে ভ্যাকসিন চলে আসবে। এতে করে আরও মানুষকে ভ্যাকসিন কর্মসূচির আওতায় আনা যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, ১৮ বছরের নিচে এবং গর্ভবতী নারী ও ৩৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী ১৮ বছরের কম বয়সী, তাদেরও টিকা দেওয়া হবে না। কারণ, তাদের কোনও ট্রায়াল হয়নি।

ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্কতা

দেশে ভ্যাকসিন আসার পরে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের আগে সাত দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনা করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

এ বিষয়ে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) ভ্যাকসিন বিতরণ কমিটির সদস্য ডা. শামসুল হক বলেন, যেহেতু প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিন আসছে, সে কারণে আমরা দুয়েকটা জায়গায় অল্প কিছু মানুষের ওপর প্রয়োগ করবো। সেটা মেডিকেল কলেজ হতে পারে, অথবা হাসপাতালও হতে পারে। সেখানে ভ্যাকসিনেটর বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যদি কেউ ভ্যাকসিন নিতে চান, তাদের ওপর প্রয়োগ করা হবে।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিন দেওয়ার পর সাত দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনা আছে আমাদের। এরপর ফিল্ডে কাজ শুরু করে দেব। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়ে যাবে।

এছাড়াও ভ্যাকসিন দেওয়ার পরবর্তী সময়েও কোনো ধরণের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করার কথা জানান ডা. শামসুল হক।

ডা. শামসুল হক বলেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার দুই থেকে তিন শতাংশের মতো। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে গ্রহীতার মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বমি হওয়া, ভ্যাকসিন নেওয়ার স্থানে ব্যথা করা সহ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। শ্বাসকষ্ট হওয়ার মতো সিভিয়ার রিঅ্যাকশনও হতে পারে। তবে এ সব বিষয় ভেবে আমাদের সকল পর্যায়ে সতর্ক অবস্থানে থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হবে।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে সবচাইতে বেশি যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে সেটি হলো শ্বাসকষ্ট হওয়া। এক্ষেত্রে সিভিয়ার জ্বরও হতে পারে। এটা এক ধরণের সাডেন শক। মাথা ঘোরা, মাথা ব্যথা, হালকা জ্বর ভাব, যেখানে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে সেখানে ব্যথা এবং মাথা ঝিমঝিম করা, বমি ভাবের কথা জানা গেছে। তবে এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ভ্যাকসিন নেওয়া ব্যক্তিদের দুই থেকে তিন শতাংশের মধ্যে। যে কোনো ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এমন মাইল্ড থেকে মডারেট বা সিভিয়ার এফেক্ট হতে পারে। এজন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার খুবই কম উল্লেখ করে ডা. শামসুল হক বলেন, বাংলাদেশে শিশু এবং বড়দের যে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় সেখানে এনাফাইলিক্সিস বলে একটা কথা রয়েছে। এই এনাফাইলিক্সিস হচ্ছে একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া—যেটা হতেই পারে। এটাকে আমরা বলি আফটার ইফেক্ট ফলোয়িং ইমিউনাইজেশন। বাচ্চাদের ভ্যাকসিন দেওয়ার সময় এনাফাইলেক্সিস বলে একটা কথা আছে, এটা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু এনাফাইলেক্সিসেরও ধরন আছে। এজন্য যারা ভ্যাকসিন দেবে, তাদের প্রশিক্ষণের সময় এ বিষয়টা অবহিত করা হবে। এটা ঘটলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে জানাবে।

তিনি বলেন, উপজেলা, জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আমাদের কেন্দ্র-ভিত্তিক প্রয়োজনীয় মেডিকেল টিম, কেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ এনাফাইলিক্সিসের জন্য মজুত রাখা হবে। কারও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। চিকিৎসক দল সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত হতে পারে অথবা উপজেলা হাসপাতালে চলে আসে। উপজেলা হাসপাতালেও যদি এমন দুর্ঘটনা ঘটে সে বিষয়টি ভেবে সেখানে প্রস্তুতি নেওয়া থাকবে।

ডা. শামসুল হক বলেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার আগে গ্রহীতাকে একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। কারণ, যাকে আমরা ভ্যাকসিন দিচ্ছি, তার একটা অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। আমরা এজন্য একটি সম্মতিপত্র তৈরি করেছি। সেখানে নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, তারিখ ও পরিচয়পত্র থাকবে।

এই সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের পর সেটি আমাদের কাছে সংরক্ষিত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন ডা. শামসুল হক।

শামসুল হক বলেন, সম্মতিপত্রে লেখা থাকবে­– করোনার ভ্যাকসিন সম্পর্কে আমাকে অনলাইনে এবং সামনাসামনি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিন গ্রহণের সময়, অথবা পরে যেকোনো অসুস্থতা, আঘাত বা ক্ষতি হলে, তার দায়ভার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বা সরকারের নয়।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, আমার ধারণা খুবই কম মানুষের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকবে। যে কোনো নতুন ওষুধের ক্ষেত্রেই এ ধরণের আশঙ্কা থাকে। তবে যেহেতু নতুন ভ্যাকসিন দেওয়া হবে তাই আমরা প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করেছি। এছাড়াও মোবাইল টিম থাকবে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে।

ভ্যাকসিন যেখানে প্রয়োগ করা হবে সেসব সেন্টারে প্রাথমিক পর্যায়ের ওষুধ ছাড়াও অন্যান্য ওষুধ লাগলে ইমিডিয়েটলি ম্যানেজ করার জন্য সেগুলোও থাকবে বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা।

তিনি বলেন, উপজেলার যে সব কেন্দ্রগুলিতে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে যতদূর সম্ভব সেখানে এই ধরণের ব্যবস্থা রাখা হবে। এছাড়াও ভ্যাকসিন প্রদানের ব্যাকআপ হিসেবে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি থাকবে। যদি কারো মাঝে সমস্যা দেখা যায় তবে সেগুলো ভ্যাকসিনের কারণে হয়েছে নাকি তার আগে থেকেই অন্য অসুস্থতায় আক্রান্ত থাকার কারণে হয়েছে সেগুলো বিবেচনা করা হবে। তারা সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করবেন।

সারাবাংলা/এসবি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন