বিজ্ঞাপন

৯০ কোটি নয়, ভ্যাকসিন নিবন্ধন অ্যাপ তৈরি হচ্ছে বিনামূল্যে

January 13, 2021 | 12:22 am

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনলাইন নিবন্ধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে ‘সুরক্ষা’ নামের একটি অ্যাপ্লিকেশন। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাপ্লিকেশনটি বানানোর জন্য ৯০ কোটি টাকা খরচ হবে বলে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার সাবেক পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, এই তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলছেন, অ্যাপ তৈরি করার জন্য কোনো টাকাই খরচ করা হবে না। স্বাস্থ্য সচিব বলছেন, সরকারের কোনো কর্মকর্তা যদি দায়িত্বহীন মন্তব্য করে বসেন, তবে সে বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সেন্টারের (এমআইএস) সদ্য সাবেক পরিচালক হাবিবুর রহমানকে হোমিও ও দেশজ শাখার পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়।  " 'সুরক্ষা’ অ্যাপটি তৈরির জন্য ৯০ কোটি টাকা ব্যয় হবে' ডা. হাবিবুর রহমান এমন কথা বলেছেন দাবি করে সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, হাবিবুর রহমান বলেছেন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিবন্ধন অ্যাপ তৈরির জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টাকা চাওয়া হয়েছে।

তবে বিষয়টি ভিত্তিহীন বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতর।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ভ্যাকসিন প্রদান সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ওপেন সোর্সভিত্তিক সফটওয়্যার কাস্টমাইজেশন করে একটি অ্যাপ তৈরি করছে সরকারের আইসিটি বিভাগ। এখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ জড়িত নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস ও ইপিআই বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী আইসিটি বিভাগ তাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই অ্যাপ কাস্টমাইজেশন করছে। এই অ্যাপের জন্য যে প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে, তার মূল সফটওয়্যারটি দেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সাধারণ ছুটি চলাকালীন ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সময় ব্যবহার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন- অ্যাপে ৯০ কোটি টাকা খরচের তথ্য ভিত্তিহীন: স্বাস্থ্য অধিদফতর

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে, সরকারিভাবেই তৈরি করা হচ্ছে বলে অ্যাপটি বানাতে প্রকৃত অর্থে কোনো খরচই লাগছে না। তবে অ্যাপ বানাতে খরচ না লাগলেও এই অ্যাপ দিয়ে কাজ শুরু হলে এর মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া এই অ্যাপের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের জন্য নিবন্ধন করা নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর যাচাই করতে হবে। এর জন্য একবছরে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের কয়েক কোটি এসএমএস পাঠাতে হবে।

অধিদফতর বলছে, এই বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করতে ব্যবহার করা হবে ক্লাউড সার্ভার। আর সেই ক্লাউড হোস্টিংটি করা হবে আন্তর্জাতিক মানের কোনো ক্লাউড সার্ভারে। এর বাইরে অ্যাপ সংশ্লিষ্ট বাকি সব কাজই করবে সরকারের বিভিন্ন দফতর। এ ক্ষেত্রে এসএমএস পাঠাতে পারে টেলিটক, এনআইডি ভেরিফিকেশনের কাজটি করবে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়। অর্থাৎ অ্যাপটি তৈরির এসব খরচও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে হবে।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে ‘সুরক্ষা’ অ্যাপ তৈরির খরচ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে এটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইসিটি বিভাগ। তাতেও বলা হয়েছে, অ্যাপটি তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা খরচের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি তৈরিতে প্রকৃত অর্থে কোনো খরচই হচ্ছে না।

আরও পড়ুন- নিবন্ধন শুরু ২৬ জানুয়ারি: যেভাবে কাজ করবে করোনা ভ্যাকসিনের অ্যাপ

বিজ্ঞাপন

‘সুরক্ষা’ অ্যাপটি তৈরিতে সংযুক্ত আইসিটি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে বলেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনলাইন নিবন্ধনের জন্য যে অ্যাপটি করা হচ্ছে, সেটির সিস্টেম প্ল্যাটফর্ম ও ডেভেলপমেন্টের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। আমার জানামতে আমাদের কোনো কমিটির বৈঠকে এ ধরনের আর্থিক কোনো বিষয় নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি। ফলে অ্যাপটি তৈরির পেছনে ৯০ কোটি টাকা খরচের বিষয়ে উনি কী বলেছেন, তা উনিই বলতে পারবেন। কমিটিতে থাকা আমরা কেউ এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। আর যিনি খরচের বিষয়টি বলেছেন, তিনি কমিটির কোনো সদস্যই নন।

আইসিটি বিভাগের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অ্যাপটির পেছনে রয়েছে ঢাকার জেলা প্রশাসকের একটি উদ্ভাবন। তবে কাজটি করছে আইসিটি অধিদফতর। কাজটির তদারকির দায়িত্বে আছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক মহোদয়। সরকারি কিছু প্রোগ্রামারের মাধ্যমে কাজটি হচ্ছে একটা পর্যায় পর্যন্ত। এতে হোস্টিংয়ের জন্য কিছু খরচ লাগতে পারে। এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু খরচ লাগতে পারে। কিন্তু এর জন্য যে টাকার অঙ্কের বিষয়ে বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। কারণ অ্যাপটি কিন্তু বিনামূল্যেই বানানো হচ্ছে।

অ্যাপটি নির্মাণ ও এর খরচ নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সারাবাংলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত অ্যাপ্লিকেশনটির সার্ভিসের যে ব্যাপ্তির বিষয়ে শুনছি, সেটি অনেক বড়। সেটির খরচ কত হতে পারে, সেটি অ্যাপ না দেখলে মন্তব্য করা কঠিন। তবে অ্যাপটি কাজ করতে গেলে এনআইডি’র যে ডাটাবেজ প্রয়োজন হবে, তা তো নির্বাচন কমিশন অফিসে আছেই। সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন ওই ডাটাবেজের ইন্টারফেস, যাকে আমরা বলি এপিআই কল করা, সেভাবে করা যায়। এটি মোটেও ব্যয়সাপেক্ষ না। এক্ষেত্রে প্রতিটি ভেরিফিকেশনে এনআইডি অ্যাকসেসের জন্য হয়তো নির্বাচন কমিশন অফিস একটি ন্যূনতম ফি নিতে পারে। কিন্তু এই ইন্টারফেসটি করাই আছে।

ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই অ্যাপে নিবন্ধনের জন্য কিছু তথ্য লাগবে। সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ডাটাবেজ ও হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম লাগবে। এক্ষেত্রে অ্যামাজন ক্লাউডে যদি হোস্ট করা হয়ে থাকে, তবে সেটার একটা ফি লাগবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সেটিও অনেক কমে এসেছে, যা মাসিক হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ফি’র পরিমাণ হয়ে থাকে ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে। তাছাড়া এসএমএস পাঠাতে কিছু খরচ হবে। এক্ষেত্রে সরকার যদি নিজস্ব অপারেটরের সাহায্য নেয়, সেক্ষেত্রে খরচ অনেক কমে আসবে। বেসরকারি অপারেটর দিয়ে করতে গেলে হয়তো একটু বেশি খরচ লাগবে। আর অ্যাপ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু খরচ হতে পারে। কারণ কিছু মানুষ তো লাগবে এটি চালানোর জন্য।

জানতে চাইলে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সারাবাংলাকে বলেন, অ্যাপ তৈরি করতে কোনো টাকাই খরচ হবে না। কারণ আমাদের একটি ডাটাবেজ সফটওয়্যার আগে থেকেই তৈরি আছে। আমরা সেই ডাটাবেজের ওপর ‘সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করব।

তিনি বলেন, সুরক্ষা অ্যাপটি তৈরি করবেন আইসিটি বিভাগে কর্মরত প্রোগ্রামাররাই। এক্ষেত্রে আলাদা জনবল, অফিস ব্যবহার বা সোর্সের প্রয়োজনও হচ্ছে না। সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগেই এটি করা হচ্ছে। আর তাই এই অ্যাপটি বানাতে কোনো খরচ হচ্ছে না। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যাদেশও দেওয়া হয়নি।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ক্যামস) নামে আমাদের একটি সফটওয়্যার আছে। এটিও আমাদের এখানে কর্মরতরাই তৈরি করেছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দেশে এই সফটওয়্যার নানাভাবে কাজ করেছে। এক্ষেত্রে আমাদের একটি ডাটাবেজও তৈরি আছে, যা এরই মধ্যে পরীক্ষিত। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই ডাটাবেজ ব্যবহার করেই সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিনের জন্য অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে অ্যাপে গ্রহীতার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, যেমন— নাম-ঠিকানা, বয়স ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেক তথ্য চেক ও ক্রস চেকও করতে হতে পারে। আর এ সবকিছুর জন্য একটা প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমরা ‘সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম’ ব্যবহার করব। অ্যাপটি তৈরির জন্য আমরা সরকারের অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদফতর কারও কাছেও কোনো টাকা চাইনি। এক্ষেত্রে ৯০ কোটি টাকার যে বিষয় নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন যার প্রতিবাদপত্র পাঠানোর জন্য বলেছি আমি।

সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান সারাবাংলাকে বলেন, যিনি এই ধরনের মন্তব্য করেছেন, তিনি আসলে না জেনে ও না বুঝে করেছেন। তার নানা জটিলতা, অজ্ঞতার কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অ্যাপের টাকার বিষয়ে যেটি বলা হচ্ছে, সেটি এমন না যে কোনো প্রাইভেট কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এটি সম্পূর্ণভাবে আইসিটি বিভাগ করছে। তারাই এই অ্যাপ ডেভেলপ সংক্রান্ত সবকিছু করছে। এক্ষেত্রে সরকারিভাবেই সবকিছু হচ্ছে। তাই খরচও যদি হয়ে থাকে, সেটিও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমেই হবে। এক্ষেত্রে অ্যাপ বানানোর জন্য যে খরচ বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগে সদ্য পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, গণমাধ্যমে অ্যাপ বানানোর জন্য ৯০ কোটি টাকা খরচ করা হবে বলে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। আমি ১১ জানুয়ারি থেকে এমআইএস বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো তথ্য নিয়ে এখানে আলোচনা হয়নি।

এ বিষয়ে এমআইএস শাখার সাবেক পরিচালক এবং বর্তমানে হোমিও ও দেশজ শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. মো. হাবিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএসেরও উত্তর দেননি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস শাখার সাবেক এই পরিচালক এর আগেও গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। দেশে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর ২ এপ্রিল তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন তিনি জানান, করোনা শনাক্তের পরীক্ষা বাড়াতে প্রতি উপজেলা থেকে দুই জনের নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে অধিদফতরের ওই সময়কার মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সারাবাংলাকে জানান, প্রধানমন্ত্রী এমন কোনো নির্দেশনা দেননি।

একই দিন ডা. হাবিবুর রহমান ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘করোনার অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করার জন্য বিদেশ ফেরত ব্যক্তি ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সবাইকে কোয়ারেনটাইন করার কোনো বিকল্প নেই।’ তার এই বক্তব্যও সমালোচনার জন্ম দেয়।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন