বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ কমাতে মানুষের আচরণ ও প্রশাসনে শুদ্ধতার চর্চা জরুরি

January 15, 2021 | 5:17 pm

শাহীনূর সরকার

ঢাকা: ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হলেও এটি কমানোর জন্য অন্যান্য জায়গাগুলোতে যে শুদ্ধতার চর্চা প্রয়োজন, তা নিয়ে কেউ ভাবছে না বলে মন্তব্য করেছেন জিটিভি’র প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে মানুষের আচরণ থেকে শুরু করে আইনি প্রক্রিয়ায় ও পুলিশ প্রশাসনে শুদ্ধতা চর্চার কথা ভাবছি না।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১১ জানুয়ারি) সারাবাংলা ডটনেটের বিশেষ আয়োজন ‘সারাবাংলা ফোকাস’ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল যুক্ত হয়ে এ কথা বলেন তিনি। সারাবাংলার সাংবাদিক রাজনীন ফারজানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও যুক্ত ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের ডেপুটি কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। অনুষ্ঠানের এ পর্বের বিষয় ছিল ‘ধর্ষণ, কনসেন্ট এবং ভিক্টিম ব্লেমিং’।

সম্প্রতি কলাবাগানে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনের ঘটনাটি উঠে আসে আলোচনায়। ঘটনার পর থেকে আনুশকাকে ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি তার বয়স নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনায় নারীদের প্রতি সমাজের এমন প্রতিক্রিয়া সত্যিই দুঃখজনক বলে মত দেন আলোচকরা।

বিজ্ঞাপন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ধর্ষণের মতো ঘটনায় সবসময় মেয়েদের দোষারোপ করা হয়। শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা, সমাজ ব্যবস্থায় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এমনটি হয় বলে মন্তব্য তার। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে মেয়েদের সাবধান করা হয়, কিন্তু ছেলেদের ভালো হতে বলা হয় না। তেমনি আনুশকার ঘটনায় ছেলের অপরাধের সঙ্গে তার পরিবারের দুর্নীতির সম্পর্কের বিষয়টি আলোচনায় আসছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইশতিয়াক রেজা বলেন, ছেলেমেয়েদের মানসিকতা নেতিবাচক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আর্থিক দুর্নীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনন্দ বিনোদনের জায়গা না থাকা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও কিশোর গ্যাং তৈরির যোগসূত্র আছে।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকের মুখে আনুশকাকে যৌন নির্যাতনের বর্ণনা নিয়েও সমালোচনা করেন ইশতিয়াক রেজা। তিনি বলেন, ‘আমাদের শাসনপ্রণালীর ভেতরে যে দুর্বিনীত আচরণ ও দুর্নীতির মহোৎসব, তা থেকেই এক শ্রেণির মধ্যে ধারণা জন্মায় অপরাধ করলেও তাদের কিছু হয় না। টাকা বা প্রভাব দিয়ে সবকিছু ঠিক করা যায়। সেখান থেকে সন্তানদের মধ্যে এসব আচরণ চলে আসছে।’

এসব ধারণা থেকেই সমাজের ভেতর ভিক্টিম ব্লেমিং, মৌলবাদী তৎপরতা ও শ্রেণিঘৃণা সংযোজিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্ষণ হলো বৃহত্তর অন্যায়ের একটি প্রকাশ মাত্র। এ সমাজে বড় বড় যে অন্যায়গুলো ঘটছে ও পুরুষদের দ্বারা সংগঠিত হচ্ছে, তার একটা নিদর্শন হলো ধর্ষণ।’

বিজ্ঞাপন

সামাজিকভাবে নারীকে সবসময় হেয় করে দেখা হয় এবং যেকোনো ঘটনায় তাদের টার্গেট করা হয় বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সমাধান করার প্রক্রিয়া খুবই জটিল। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার জায়গাটা এখনো তৈরি হয়নি। নারীকে হেনস্থা করার জন্য আইনিভাবে পদে পদে ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। এছাড়া আইনি অস্পষ্টতার কারণেই বৈবাহিক ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা এখনো কঠিন।

সমাজে নারীদের নিরাপিত্তার বিষয়টি সংস্কৃতি সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, সামাজিক মনোজগতের যে পরিবর্তন, তা একদিনে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ফসল। আইনের সাহায্য না পাওয়ার বিষয়টিও এখানে কাজ করছে। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখলে, তাকে সম্মান দিলেই সমাজে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

বিজ্ঞাপন

আনুশকার ঘটনায় অভিযুক্ত ইফতেখার দিহানকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হয়নি বলে আলোচনায় উল্লেখ করেন রমনা জোনের ডেপুটি কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান। এ ঘটনায় আনুশকার বয়স নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছেসে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, পুলিশ মোটেও মেয়েটির বয়স নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেনি। যেকোনা ঘটনায় অভিযুক্ত বা অপরাধের শিকার ব্যক্তির নাম-পরিচয়-বয়স লিখতে হয়। এ ঘটনাতেও মেয়েটির বয়স উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। সেক্ষেত্রে হাসপাতালে তার বয়স লেখা হয়েছে একরকম, অন্য জায়গায় অন্য বয়স এসেছে। এ কারণে ফরেনসিকের কাছে মেয়েটির বয়স জানতে চেয়েছে পুলিশ এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, নারীরা নির্যাতনের শিকার হলেও পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে চান না। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে নারীদের নানাভাবে হয়রানির শিকারও হতে হয়। এ কারণেই  নারীদের জন্য প্রতিটি থানায় ‘নারী ও শিশু ডেস্ক’ নামে নারীবান্ধব সেল তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ডিসি সাজ্জাদুর রহমান জানান, নারীরা থানায় না গিয়েও ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে তাদের অভিযোগ জানাতে পারবেন। সম্প্রতি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হটলাইনের সঙ্গে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের চুক্তি সই হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হটলাইনে কেউ অভিযোগ জানালেও সেটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করে দেওয়া হবে।

সারাবাংলা/এসএসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন