বিজ্ঞাপন

পাঠ্যবইয়ে ভুল উৎসব

January 17, 2021 | 2:08 pm

মোস্তফা কামাল

মহামারিতেও ধরার বুকে দাপটেই ধাবমান ২০২১। বিশের বিষের মতো একুশে কেবল টিকেই থাকছে না, আরও তেজি করোনা মহামারি। এর মাঝেও বছরের প্রথম দিনেই পাঠ্যবই উৎসবে সক্ষমতা দেখিয়েছে সরকার। ভার্চুয়ালে হলেও শিক্ষার্থীদের নতুন বই বিতরণ উদ্বোধন করতে পেরেছে। কোমলমতিরা বইয়ের ভারে নুয়ে পড়লেই কী? আদালতের নির্দেশনা ছিল—বইয়ের ওজন কমানোর। তা যেন কোনক্রমেই শিশুর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি না হয়। বইয়ের ওজন না কমলেও করোনা পরীক্ষার ওজন কমিয়ে দিয়েছে। সেইসঙ্গে সরকারের দেওয়া পাঠ্যবইয়ে ভুল থাকাকে নিয়মের পর্যায়ে এনে ঠেকিয়েছে। ভুল এবং উদ্ভট তথ্য পরিবেশনে ক্ষেত্রবিশেষে গেল কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবির বিভিন্ন বইয়ে এবারের গোলমাল আচ্ছা রকমের । যার কোনো কোনোটি অবিশ্বাস্য। ভাবনাতীত। দেশের সংবিধান, ভোটাভুটির ফল আর উৎসবকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা তা যথারীতি পড়তেও শুরু করেছে। শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবকসহ যাদের চোখে এগুলো পড়েছে বিব্রত হওয়া ছাড়া তাদের যেন আর করারও কিছু নেই। নবম-দশম শ্রেণীর পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইয়ের ‘গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন’ অধ্যায়ে ৭৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে—‘একটি দল নির্বাচিত হয়ে সঠিকভাবে জনগণের জন্য কাজ না করলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ সাধারণত সেই দলকে আর নির্বাচিত করে না। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের এটি যেমন সত্যি তেমনিভাবে অনুন্নত দেশের ক্ষেত্রেও সত্যি। তেমনি, বাংলাদেশে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপিকে এবং ২০০৮ সালে বিএনপির পরিবর্তে আওয়ামী লীগকে এ দেশের জনগণ ক্ষমতায় বসায়’।

এর মাধ্যমে কী বার্তা পেল দেশের শিক্ষার্থীরা? আওয়ামী লীগের শাসনামল কি উজ্জ্বল হবে? না বিতর্কিত হবে? সরকারের পরিচয়-ভাবমর্যাদাই বা কী দাঁড়াবে? মোটামুটি বুঝবান মানুষ মাত্রই জানে, বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু, সংবিধান অধ্যায়ে বলা হয়েছে ‘১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে এ পর্যন্ত সংবিধান মোট ১৬ বার সংশোধন করা হয়েছে( পৃষ্ঠা- ৫১)।

বিজ্ঞাপন

সপ্তদশ সংশোধনী সংসদে পাস হয়েছে ২০১৮ সালের এপ্রিলে। প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও এটি সংশোধন করেনি এনসিটিবি। বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা অধ্যায়ে বলা হয়েছে—‘দেশের প্রকৃত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের হাতে ন্যস্ত। মন্ত্রিপরিষদই প্রকৃত শাসন ক্ষমতার অধিকারী’ ( পৃষ্ঠা-৫৬)। অথচ সংবিধানের ৫৫ (২) অনুযায়ী—‘প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।’ পরের পৃষ্ঠায় রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে—‘কোন ব্যক্তি পর পর দুই মেয়াদ অর্থাৎ একটানা ১০ বছরের বেশি রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারেন না’। অথচ সংবিধানের ৫০ (২) অনুযায়ী— ‘একাদিক্রমে হউক বা না হউক—দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোন ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকিবেন না।’ বইটির এ অধ্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও রাষ্ট্রপতি নিয়েও ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।

দেশে মোট ১১টি সংসদ নির্বাচন হলেও বইটিতে বলা হয়েছে, দেশে ১০ বার সংসদ নির্বাচন হয়েছে ( পৃষ্ঠা-৭৫)। ৮৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে— ‘জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলার জনগণ দ্বারা সরাসরি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়। অথচ জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ অনুযায়ী- ‘প্রত্যেক জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশন যদি থাকে তাহলে মেয়র ও কাউন্সিলরগণ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সমন্বয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হবে।’ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন অধ্যায়ে ১৩৭ নং পৃষ্ঠায় জাতিসংঘ সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘শুরুতে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০’। অথচ প্রতিষ্ঠাকালীনই জাতিসংঘের সদস্য ছিল ৫১টি দেশ। বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কিন্তু নবম-দশম শ্রেণীর বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বইয়ের ১৮৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ‘সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন’।

বিজ্ঞাপন

ডা. শামসুল আলম খান মিলন এরশাদ সরকারের আমলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হলেও বইয়ের ২১৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন’। নবম-দশম শ্রেণীর ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ বইয়ে বাংলাদেশের উৎসবের বিবরণে ২১ ফেব্রুয়ারি ও মহররমকে উৎসব হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং মহররমের ১০ তারিখে আশুরা, যা শোক হিসেবে পালন হয়। অষ্টম শ্রেণীর সাহিত্য কণিকা বইয়ের ২৭ পৃষ্ঠায় ‘বিব্রত’ শব্দের শব্দার্থ হিসেবে লেখা হয়েছে ব্যাকুল, ব্যতিব্যস্ত। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে ‘রহমানের মা’ অধ্যায়ে লেখকের পরিচয়ে বলা হয়েছে—‘রণেশ দাশগুপ্ত ঢাকার লৌহজংয়ের গাউপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন’। অথচ এ লেখকের জন্ম ভারতের আসামে। বইটির ‘পোস্টার’ অধ্যায়ে লেখকের পরিচয়ে বলা হয়েছে—‘আবুল হোসেন খুলনা জেলার ফকিরহাট থানায় জন্মগ্রহণ করেন’। অথচ ফকিরহাট বাগেরহাট জেলায়। দুই ক্লাসের দু’টি বইয়ে একই লেখকের পরিচিতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণীর আমার বাংলা বইয়ে ‘অবাক জলপান’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে ‘সুকুমার রায় ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন’। অথচ নবম-দশম শ্রেণীর ‘ছায়াবাজি’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘তার মৃত্যু হয় ১৯২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর’।

এখানেই শেষ নয়। গোলমালের তালিকা দীর্ঘ। শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করলেও পাঠ্যবইয়ে কোচিংকে উল্লেখ করা হয়েছে শিক্ষার বাড়তি ‘সুযোগ’ হিসেবে। ১১১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘মীনার বড় ভাই বিভিন্ন ক্লাসে শিক্ষকদের কাছে কোচিং করলেও তাকে কখনো এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়নি’। পাঠ্যবইয়ে এমন পাঠ সংযোজন কি শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী করার চেষ্টা বা অপচেষ্টা নয়? বানান ভুলের ছড়াছড়িও ব্যাপক।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ২০১৭ সালে ছাগল এবং ওড়না কাণ্ডের পর ২০১৮ সালে বিনামূল্যে বিতরণ করা প্রথম শ্রেণীর ‘আমার বাংলা বই’-এ পল্লীকবি জসীম উদ্দীন রচিত মামার বাড়ি কবিতায় ‘পাকা জামের মধুর রসে’র জায়গায় লেখা আছে ‘পাকা জামের শাখায় উঠে’। এছাড়া, জাতীয় পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রম বোর্ডের বিভিন্ন শ্রেণীর বইয়ে একেকভাবে ছাপা হয়েছে কবি জসীম উদ্দীনের নামের বানান। কোথাও লেখা ‘জসিমউদদিন’, তো কোথাও আবার ‘জসমীউদ্দীন’। শুধু জসীম উদ্দীন নন, তার পাশাপাশি নাম বিকৃত হয়েছে মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল গাফফার চৌধুরী এবং সিকান্দার আবু জাফরেরও। পল্লীকবির নামের প্রকৃত বানান দুই শব্দে। জসীম উদ্দীন। যদিও এ বিষয়টি ২০১৭ সালে তুলে ধরা হয়। কিন্তু তারপরও ২০১৮ সালে একই ভুল। প্রথম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে ‘মামার বাড়ি’ কবিতায় কবি জসীম উদ্দীনের নাম লেখা হয়েছিল এক শব্দে ‘জসীমউদদীন’। ষষ্ঠ শ্রেণীর বাংলা বইয়ের ‘আসমানী’ এবং অষ্টম শ্রেণীর বইয়ের ‘রূপাই’তে পল্লীকবির নাম এক শব্দে লেখা হয়েছে। আবার সপ্তম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে কবির নাম লেখা হয় ‘জসীম উদদীন’।

বানান ভুল, দুর্বল বাক্য গঠন, ত্রুটিপূর্ণ সম্পাদনার পাশাপাশি ভুল তথ্যে লেখা, লেখক, সম্পাদক নির্বাচন ও কর্ম সমন্বয়ে দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট। এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে? শিক্ষার্থীরা কী পড়বে-বুঝবে? শিক্ষকরাই বা কী পড়াবেন-বোঝাবেন?

বিজ্ঞাপন

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন