বিজ্ঞাপন

এখনো ঝুলে আছে তাদের পদত্যাগপত্র!

January 21, 2021 | 6:35 pm

আসাদ জামান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দল থেকে পদত্যাগ করা বিএনপির তিন প্রভাবশালী নেতার পদত্যাগপত্র এখনো ঝুলে আছে। পদত্যাগের পর কয়েক বছর কেটে গেলেও তাদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিএনপি। ফলে পদত্যাগ করা নেতারা এখন বিএনপিতে আছেন, নাকি নেই—  এ বিষয়টি নিয়ে শেষ কথাটি বলতে পারছেন না কেউ।

বিজ্ঞাপন

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে বিএনপি। সেখানে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নাম আসে জিয়া পরিবারের আস্থাভাজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোসাদ্দেক আলী ফালুর। তালিকা প্রকাশের ছয় ঘণ্টা পর থাইল্যান্ড থেকে ফোনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। পরবর্তী সময় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদত্যাগপত্রও জমা দেন ফালু।

২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দল থেকে পদত্যাগ করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোরশেদ খান। এর একদিন পর ৮ নভেম্বর পদত্যাগ করেন সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

দলীয় সূত্রমতে, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সাড়ে চার বছর কেটে গেলেও ফালুর ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিএনপি। গৃহীত হয়নি তার পদত্যাগপত্র। আবার ফেরতও পাঠানো হয়নি। মোরশেদ খান ও মাহবুবুর রহমানের পদত্যাগপত্রও ঝুলে রয়েছে।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান জিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত সহচর ও রাজনীতিক মোসাদ্দেক আলী ফালু এবং সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান প্রশাসন ক্যাডারে থাকা খালেদা জিয়ার পারিবারিক আত্মীয় সালাহউদ্দিন আহমেদ।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আমলে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব নির্বাচিত হন মোসাদ্দেক আলী ফালু। ২০০১ সালে  ফের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর সচিব পদমর্যাদায় ফালুকে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০৪ সালে মেজর (অব.) মান্নানের ছেড়ে দেওয়া (ঢাকা-১০, রমনা-তেজগাঁও) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফালু।

সূত্রমতে, ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট ঘোষিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিজের নাম দেখার পর ক্ষোভে ও অভিমানে পদত্যাগ করেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। খালেদা জিয়ার একান্ত আস্থাভাজন হওয়া সত্ত্বেও নিজের নাম স্থায়ী কমিটিতে না থাকায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন তিনি। শুধু তাই নয়, ১৯৯১ সালের রানিংমেট সালাহউদ্দিন আহমদের নাম স্থায়ী কমিটিতে থাকায় আরও চটে যান ফালু। সে কারণেই তড়িৎ গতিতে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু মোসাদ্দেক আলী ফালু বিএনপি ছাড়লেও বিএনপি তাকে ছাড়েনি। এখনো বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা ফালুকে বিএনপির লোক হিসেবেই জানেন। জিয়া পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক, বিপদে-আপদে পরিবারটির পাশে থাকার প্রবণতা-ই বিএনপিতে ফালুর আসন স্থায়ী হয়ে আছে— এমনটিই বক্তব্য বিএনপি নেতাদের।

এদিকে, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর দল থেকে পদত্যাগের করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোরশদে খান। পদত্যাগের সময় খালেদা জিয়ার উদ্দেশে তিনি লেখেন— ‘বিএনপি এবং আপনার যোগ্য নেতৃত্বের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তবে বর্তমানে দেশের রাজনীতি ও দলের অগ্রগতিতে নতুন কিছু সংযোজনের সঙ্গতি নেই। আমার উপলব্ধি এই যে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। বহু বিচার-বিশ্লেষণের পর বিএনপির রাজনীতি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রাথমিক সদস্য পদসহ ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করছি। অব্যহতি দিয়ে বাধিত করবেন।’

বিজ্ঞাপন

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়ার উদ্দেশে যা-ই লেখেন না কেন, মোরশেদ খানের পদত্যাগের পেছনে মূল কারণ হলো দলে পদায়নের ক্ষেত্রে তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার অভিযোগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাকে মনোনয়ন বঞ্চিত করা হয়েছে। দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে (চট্টগ্রামে) তার অনুসারীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। তার ওপর সেখানে আবু সুফিয়ানকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এসব কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।

কিন্তু তার পদত্যাগপত্রও এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। আবার পদত্যাগপত্র ফেরতও পাঠানো হয়নি। বিএনপি ও জিয়া পরিবারের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ডাকসাইটে ব্যবসায়ী মোরশেদ খানের জন্য এখনো দলের দরজা খোলা রয়েছে। করোনাভাইরাসের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে চার্টার্ড বিমান ভাড়া করে বিলেতে পাড়ি জমানো মোরশেদ খান এখন করোনা আক্রান্ত। করোন জয় করে দেশে ফিরে রাজনীতি করতে চাইলে বিএনপি তাকে স্বাগত জানাবে— এমনটিই বলছেন দলটির নেতারা। আর সে কারণেই গত চৌদ্দ মাস ধরে ঝুলে রয়েছে তার পদত্যাগপত্র।

সাবেক সেনাপ্রধান বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুব রহমান ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগের সময় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন— ‘আমি বয়স্ক মানুষ। সামনের ডিসেম্বরে ৮০ বছর পূর্ণ হবে। রাজনীতিতে কনট্রিবিউট করার মতো আমার আর কিছু নেই। একটা সময় তো অবসরে যেতে হয়। স্বাভাবিক নিয়মেই আমি রাজনীতিকে গুডবাই জানিয়েছি।’

অবশ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পদত্যাগের কারণ হিসেবে মাহবুবুর রহমান বয়সের কথা বললেও এর নেপথ্যে অন্য কারণ ছিল। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দল যেভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করতে তিনি। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কও মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। নিজে যা বুঝতেন, ‘সরল’ মনে সেটাই বলে ফেলতেন। দলীয় ফোরামের দেওয়া তার বক্তব্যে বিব্রত হতেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। মাঝে-মধ্যে জনসম্মুখে দেওয়া তার বক্তব্য দলের বিপক্ষে চলে যেত। এসব কারণে দলের সঙ্গে দিন দিন দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। অবশেষে বিএনপি থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু জিয়াউর রহমানের এই বিশ্বস্ত সহচরের পদত্যাগপত্র এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি বিএনপি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অভিমানের বশবর্তী হয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া এসব ‘পরীক্ষিত’ ও ‘বিশ্বস্ত’ নেতার ব্যাপারে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বিএনপি। পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলালে তাদেরকে দলে ফিরিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। দলে তাদের অবদান অস্বীকার না করে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে চায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে আমি পদত্যাগ করেছি। চৌদ্দ মাস আগে পাঠানো সে পদত্যাগ পত্রের কোনো রিপ্লাই পাইনি। এটা গ্রহণ হয়েছে কী প্রত্যাখান হয়েছে, সেটা বলতে পারব না।’

‘তবে রাজনীতি করার মতো শারীরিক এবং মানসিক সক্ষমতা এখন আমার নেই। অলরেডি ৮১ বছরে পড়েছি। যে ক’দিন বাঁচি ইবাদত-বন্দেগি করতে চাই। বিএনপির জন্য সব সময় শুভ কামনাই থাকবে‘— বলেন মাহবুবুর রহমান।

সারাবাংলা/এজেড/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন