বিজ্ঞাপন

বীর বিপ্লবী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

January 23, 2021 | 2:45 pm

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় আজাদি আন্দোলনের সূর্যসৈনিক, প্রখ্যাত বিপ্লবী রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্র বসু যার পরিচিতি ‘নেতাজী’ নামে। ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী ধারার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই নেতা বিখ্যাত রাজনৈতিক দল ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন চোখে, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অংশ নিয়েছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবে। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতীয় ইতিহাসে এক আবেগের নাম। সবাইকে নিয়ে চলার মন্ত্র তিনি আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন বলেই আজও কোটি কোটি মানুষের প্রেরণা তিনি। ২৩ জানুয়ারি, ২০২১ তার ১২৪তম জন্মবার্ষিকী।

বিজ্ঞাপন

সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বাবা জানকীনাথ বসুর কর্মস্থল কটকে। বাবা ছিলেন আইনজীবী জানকীনাথ বসু ও মা প্রভাবতী দেবী। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও ইংরেজদের অধীনে সেই চাকরিতে যোগ দেননি। তার মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল একইসাথে জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চেতনায়। রাজনৈতিক জীবনে নেতাজীর প্রেরণা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রী অরবিন্দের চিন্তাধারায়ও প্রভাবিত ছিলেন তিনি। ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্পাদক এবং ১৯৩০ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন আপসহীন। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে সমর্থন ছিল না তার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অক্ষশক্তির সাহায্যে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন সুভাষ।

১৯৪৩ সালে তার নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ সরকার গঠিত হয় এবং এই ফৌজ নিয়েই তিনি সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। আজাদ হিন্দ ফৌজের সদর দফতর ছিল তদানীন্তন রেঙ্গুনে। দুঃসাহসী, নির্ভীক, মহান এই দেশপ্রেমিকের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রিটিশদের পরাজিত করে ইম্ফল ও কোহিমায় দু’টি বিমান ঘাঁটি দখল করে নেয়। দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে আজীবন সংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসু একাধিকবার জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। তবু তিনি তার আদর্শ থেকে সরে আসেননি। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট ফরমোজার তাইহুকু বিমানবন্দরে এক বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র বসু নিহত হন বলে প্রচারিত। ‘অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম’ নামে একখানা আত্মজীবনী লিখছিলেন তিনি। সেটি অসমাপ্ত থেকে যায়। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তরুণের স্বপ্ন’।

বিজ্ঞাপন

নেতাজিকে যিনি পূর্ণ স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন তিনি হচ্ছেন মৌলানা ওবায়দুল্লা সিন্ধি, ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় যাকে ‘ওবেদুল্লা’ বলেছেন। তিনি সুভাষ চন্দ্র বসুকে ভারতের বাইরে নানা নামে পাঠিয়েছিলেন। তিনিই সুভাষ বসুর নাম দিয়েছিলেন মাওলানা জিয়াউদ্দিন। ওই বিখ্যাত বিপ্লবী মাওলানাকে (নেতাজি সুভাষকে) যখন ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তখন সেই বিপজ্জনক সময়ের মধ্যে তিনি জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, কাবুল প্রভৃতি স্থানে এমন কায়দায় সংগঠন করে এসেছিলেন যাতে পরবর্তীকালে প্রতিনিধি হিসেবে অন্যের যাওয়া সহজ হয়‌। তাছাড়া প্রত‍্যেকটি জায়গায় শিষ্য ও বন্ধু সৃষ্টি করে ভারতের স্বাধীনতার সাহায্য-সোপান সৃষ্টি করে এসেছিলেন। সেখানে যাদের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন এবং যাদের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন তারা বেশিরভাগই ছিলেন রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক কর্মী। সুভাষ বসু ওরফে মাওলানা জিয়াউদ্দীন নামক বাঙালিকে ইতিহাসে যদিও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে স্থান দেওয়ানো হয়েছে কিন্তু সুভাষের নেতা অর্থাত্‍ নেতাজির নেতা মাওলানা ওবায়দুল্লাকে আমাদের বর্তমান ও ভাবী সন্তানরা যে কী করে চিনবে তার কোনো উপায় রাখা হয়নি।

নেতাজির মৃত্যু আজও রহস্যাবৃত। তবে কর্নেলের মতো কয়েকজনের স্মৃতিতে অমলিন ছিলেন তিনি। সদা জাগ্রত ছিল নেতাজির আদর্শ। যা তিনি বরাবর ছড়িয়ে দিয়েছেন তার উত্তরসূরিদের মধ্যেও।

বিজ্ঞাপন

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নামের মধ্যেই জড়িয়ে রয়েছে এক বুক চাপা আবেগ। সাহসী বীর এই বাঙালি-সন্তানকে ঘিরে যে সমস্ত অধ্যায় লেখা হয়েছে তার একাংশে যেমন যুদ্ধের দামামার শব্দ রয়েছে, তেমনই তার অন্য অংশে রয়েছে রহস্যের মেঘ। এই দুইয়ের মিলিত স্রোতের নেতাজি বাঙালির কাছে এক যুগ পুরুষের নাম হয়ে উঠেছেন। যার জীবনের বিভিন্ন দিক চলার পথের প্রত্যেকটি দিনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। যুব সমাজ যখন বিভ্রান্ত হয়ে ওঠে সৎ-অসৎ পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে, তখন নেতাজির একটি বাণী অত্যন্ত উপযোগী।

নেতাজি বলেন, ‘নিজের প্রতি সত্য হলে বিশ্বমানবের প্রতি কেউ অসত্য হতে পারে না’। জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকা আর শুধুমাত্র টিকে থাকার মধ্যে বেশ খানিকটা পার্থক্য আছে। আর সেই পার্থক্য আরও স্পষ্ট করে দেয় সুভাষ চন্দ্রের এই বাণী, ‘মানুষ যতদিন বেপরোয়া, ততদিন সে প্রাণবন্ত’। ভাবাদর্শ সম্পর্কে নেতাজির বক্তব্য কোনো রাস্তাকে একজন বেছে নেবে জীবনের বড় পদক্ষেপে নেওয়ার ক্ষেত্রে? উত্তর মিলছে, নেতাজির এই বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘জগতের সব কিছু ক্ষণভঙ্গুর। শুধু একটা জিনিস ভাঙে না, সে বস্তু—ভাব বা আদর্শ’।

বিজ্ঞাপন

শুধুমাত্র দেশের স্বাধীনতা নয়, স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার গুরুত্বও বারবার তুলে ধরেছেন নেতাজি। আর সেই মর্মেই সুভাষ বোস বলেন, ‘স্বাধীনতা দেওয়া হয় না, ছিনিয়ে নিতে হয়’। আর দেশের সংগ্রামের নিরিখে তার বার্তা ছিল, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’।

অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়, আগাগোড়া সততার রাস্তায় চলা, নির্ভীক জীবনযাপনে অভ্যস্ত নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু বহুবার বলেছেন, ‘মনে রাখতে হবে যে, সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো অন্যায়ের সঙ্গে আপস’। কোনপথে লড়াই করা যাবে? উত্তর এসেছে নেতাজির এই বাণী থেকে, ‘ভারত ডাকছে। রক্ত ডাক দিয়েছে রক্তকে। উঠে দাঁড়াও আমাদের নষ্ট করার মতো সময় নেই। অস্ত্র তোলো! যদি ভগবান চান, তাহলে আমরা শহিদের মৃত্যু বরণ করব’।

বিজ্ঞাপন

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অন্য ধারার প্রবক্তা সুভাষচন্দ্র বসু শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন না। কলকাতা পৌরসভার মেয়র থেকে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সব ক্ষেত্রেই তিনি কম বয়সে তার নিজস্ব চিন্তাধারার প্রমাণ রেখেছিলেন। তার ঐতিহাসিক আহ্বান, ‘আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’ বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার যে আদর্শ, যে ধ্যানধারণা তিনি ভবিষ্যতের জন্য রেখে গিয়েছিলেন, সেখানেও তাকে আমরা একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিন্তাবিদ বলে গ্রহণ করতে পারি।

সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যুকে ঘিরে আজও রয়ে গেছে একটি রহস্য। তার জীবনের শেষ দিনগুলো নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ হয়নি। তার ১২৪তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা

প্রিয় পাঠক, লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই ঠিকানায় -
sarabangla.muktomot@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব, এর সাথে সারাবাংলার সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্কিত নয়। সারাবাংলা ডটনেট সকল মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার দায় সারাবাংলার নয়।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন