বিজ্ঞাপন

মৃত্যুশয্যায় বিশ্বায়ন যুগ: কোন পথে নতুন বিশ্ব?

January 23, 2021 | 9:59 pm

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নব্বইয়ের দশকে বিশ্বায়ন যুগের প্রভাবে বিশ্ব যেভাবে উড়ছিল, ঠিক তেমনি অব্যবস্থাপনা, কর্তৃত্ববাদী শাসন আর ভুল নীতি বাস্তবায়নের দায়ে বিশ্ব এখন কঠিন সংকট মোকাবিলা করছে। বিশ্বায়ন যুগ বা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এখন বলতে গেলে মৃত্যুশয্যায় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

এমন একটি পরিস্থিতিতে সামনের দিনে শাসন ব্যবস্থার কোন মডেল বিশ্ব অনুসরণ করবে, তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচুর মতবাদ আছে। কেউ বলছেন সামনের দিনে কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্রের মিশেলে নতুন মডেল অনুসরণ করবে বিশ্ব। কেউ বলছেন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম শাসন ব্যবস্থার মডেল দাঁড়িয়ে যাবে। আবার কেউ বলছেন, নিজেদের স্বার্থে ছোট ছোট দেশের মধ্যে সম্প্রীতিমূলক সহযোগিতার মডেল বা ‘ভ্যালুজ’কে প্রাধান্য দিয়ে শাসন ব্যবস্থায় নতুন মডেল দাঁড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট কোস্ট স্টেটের ভয়েজ অব আমেরিকার ব্যুরো চিফ মাইক ও’সুলিভানের লেখা ‘বিশ্বায়ন যুগ শেষে কী আসছে?’ (হোয়াট নেক্সট আফটার গ্লোবালাইজেশন?) শীর্ষক বইটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে প্রকাশ পেয়েছে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। বইটিতে তিনি বর্তমান বিশ্বের শাসন ব্যবস্থা, অর্থনীতিসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞাপন

‘বিশ্বায়ন যুগ শেষে কী আসছে?’ বইটিতে মাইক ও’সুলিভান লিখেছেন, চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্বায়ন যুগ এখন মৃত্যুর পথে। বিশ্বয়ান যুগের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ (সেকেন্ড ওয়েভ) শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। তখন বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ছিল। এর ধাক্কাতেই গত ২০ বছরে বাংলাদেশ, ভিয়েতনামসহ একাধিক অনুন্নত রাষ্ট্র অর্থনীতিসহ সার্বিকখাতে কমপক্ষে ছয় গুণ উন্নতি করেছে। এই সময়ে একাধিক দেশে গণতন্ত্রের ফুল ফুটেছে। চিলি, মালয়েশিয়া, এস্তোনিয়াসহ অনেক দেশেই অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে।

তিনি আরও লিখেছেন, এই সময়ে স্পেনের মতো একাধিক দেশে যেমন নারীকর্মীর মজুরিতে সমতা ফিরেছে, ঠিক তেমনি সৌদি আরবের মতো অনেক দেশেই নারীরা শিক্ষার আলো পেয়েছে। এই সময়ে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ সংযোগ (সাপ্লাই চেইন) বেড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। বিশ্বায়ন যুগ মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। দেশে দেশ মানুষে মানুষে যোগাযোগ, মানেুষের বিনোদন-ভ্রমণ-কাজের খবরসহ জীবন ধারনের সার্বিক বিষয় সহজ করেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বায়ন যুগের এত সাফল্যের পরও এখন তা মৃত্যুশয্যায় বলে মনে করেন মাইক ও’সুলিভান। বিশ্বায়নের ইতিবাচক ধারাকে ভুল পথে চালিত করা এবং অব্যবস্থাপনাকেই এর মূল কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। বইয়ে লিখেছেন, এ কারণেই বিশ্বব্যাপী এখন অর্থনৈতিক সংকট বিরাজ করছে। কমবেশি সব বৈশ্বিক নাগরিকের মাথায় রয়েছে ঋণের বোঝা। বিশ্বায়নের সমস্যা সমাধানের জন্য জনপ্রতিনিধিরা খুব বেশি কিছু করতে পারেননি বলেই বিশ্বায়ন যুগ এখন মৃত্যুর পথে।

তিনি আরও বলছেন, এই সময়ে আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মতো ধনী দেশগুলো আয় বৈষম্য কমাতে কর বাড়ানো এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক প্রকল্প বায়স্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বাকি দেশগুলোও প্রকট আয় বৈষম্য মোকাবিলা করছে। এর ফলে রোমান আমলের শাসন ব্যবস্থা থেকেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অনেক মানুষই এখন বিশ্বাস করে যে বিশ্বায়ন যুগের ফসলের ভাগ তারা পায়নি। তারা মনে করে যে বিশ্বায়ন যুগের নীতি তাদের জন্য নয়।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে তেমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বৈশ্বিক উদ্যোগ দেখা যায়নি— এমন অভিযোগ তুলে মাইক ও’সুলিভান লিখেছেন, ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং করোনা বিশ্বায়ন যুগের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এর আগে, করোনার মতো বৈশ্বিক সংকটে দেখা গেছে যে বিশ্বনেতারা একসঙ্গে বসে সংকট উত্তরণের জন্য শপথ নিয়েছেন এবং একসঙ্গে কাজ করেছেন। করোনা অতিমারিতে বৈশ্বিক এমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং এই দুর্যোগের সময়েও বিশ্বে অর্থনৈতিক যুদ্ধ লক্ষ্য করা গেছে। যেমন— আমেরিকা করোনা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সরঞ্জাম সংগ্রহে দরপত্রে অতি মূল্য হেঁকেছে। আর ভ্যাকসিন সমস্যা তো রয়েই গেছে।

তিনি বলছেন, তাই বিশ্বায়ন যুগ এখন সমাপ্তির পথে, যেমনটি ঘটেছিল সমাজতন্ত্র যুগের ক্ষেত্রে। সমাজতন্ত্র বিদায় নেওয়ার পর বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য, অর্থনীতি, মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি বিনিময়ের যে প্রবাহ বেড়েছিল, তা এখন সমাপ্তির পথে; যেমনটি ঘটছে হংকংয়ে। দেশটিতে এখন গণতন্ত্র মৃত্যুশয্যায়।

বিজ্ঞাপন

আগামী দিনের বিশ্ব নিয়ে মাইক ও’সুলিভান লিখেছেন, বিশ্বায়ন যুগের পর বিশ্ব অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য একত্রিত হবে, পারস্পরিক সংযোগ ঘটাবে এবং এই সংযোগে আঞ্চলিকতা প্রাধান্য পাবে। এ পরিস্থিতিতে প্রচুর প্রতিযোগিতা, স্বাতন্ত্র্য বৈশ্বিষ্ট্য এবং ভিন্ন মাত্রার কাজ উপলব্ধি কাজ করবে। বিশ্বের নতুন শাসনব্যবস্থায় ভ্যালুজ সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।

তিনি বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিশ্বের ছোট ছোট দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে একত্রিত হবে এবং বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিতে ছোট দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়বে। ছোট দেশগুলো একত্রে মিলে কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিনিয়োগ করবে। দিন শেষে এই ছোট দেশগুলো ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের মাইক্রপাওয়ার এবং তারা আরও ফল পেতে নিজেদের মধ্যে আরও ঐক্য গড়বে।

সুলিভান আরও বলছেন, প্রশ্ন উঠেছে যে বিশ্বায়ন যুগের পরিসমাপ্তিতে ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, মেক্সিকো ও ব্রাজিলের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলো কোন ধরনের শাসনব্যবস্থার দিকে যাবে? একটা সময় ছিল যে উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দেশগুলো কী করবে, তার জন্য আইএমএফসহ বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ নিত। কিন্তু এই দেশগুলো এখন অনেক পরিণত, সক্ষম এবং তারা নিজেদের পছন্দ নিজেরাই বাছাই করতে জানে। এই দেশগুলো এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দরকষাকষি করতেও শিখেছে। তাই এই দেশগুলো অদূর ভবিষ্যতে নিজেরাই নিজেদের শাসনব্যবস্থার নতুন মডেল খুঁজে নেবে।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো আনু আনোয়ার সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্বায়ন যুগের শেষে বিশ্ব কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থা অনুসরণ করবে বা কোন আদর্শ বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশি প্রাধান্য পাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র এখন হুমকির মুখে। অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন রকম শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করতে পারে। তবে এই শাসনব্যবস্থার মূলে রয়েছে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র যেমন হুমকির মুখে, ঠিক তেমনি গণতন্ত্রের সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী জনমতও ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। যেমন— গণতন্ত্র রক্ষায় ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী ২৯ শতাংশ মানুষ প্রতিবাদ করেছিল, ২০১৯ সালে এমন প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪৪ শতাংশ। তাই সামনের দিনে হয়তো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন দেখতে হতে পারে।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সারাবাংলাকে বলেন, ‘শাসনব্যবস্থায় যে মডেলই অনুসরণ করা হোক না কেন, তা জনগণের সম্মতিতেই করতে হয়। কোন মডেলকে সামনে রেখে আগামী দিনের বিশ্ব চলবে, তা জনগণই ঠিক করে দেবে।’

সারাবাংলা/জেআইএল/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন