বিজ্ঞাপন

কয়েনের তেলেসমাতি, কোটি টাকা খোয়ালেন শিল্পপতি

January 29, 2021 | 4:31 am

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: একটি কয়েন। সাধারণ কয়েনের চেয়ে আকারে একটু বড়। দেখতে অনেকটা পিতলের কয়েনের মতো। বেশ আকর্ষণীয়। শুধু তাই নয়, বিশেষ এ কয়েনটি পানিতেও ডোবে না, দিব্বি ভেসে থাকে। এ কারণে বিশেষ এই কয়েনটি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’য় ব্যবহৃত হয়!

বিজ্ঞাপন

এমনটিই বোঝানো হয়েছিল একজন শিল্পপতিকে। তাকে বলা হয়েছিল, বিরল এই কয়েনটির সন্ধান নাসা পেলে তা ন্যূনতম ২৪ কোটি টাকায় কিনে নেবে। তবে কয়েনের সন্ধানদাতারা তো আর নাসায় যোগাযোগ করতে পারবেন না, সে কারণে তারা ওই শিল্পপতির কাছে এটি বিক্রি করতে চান। তার জন্য দিতে হবে ১২ কোটি টাকা।

এমন সুযোগ কে ছাড়ে! তাই কয়েনটি কিনতে সম্মত হন ওই শিল্পপতি। তবে দরদাম করে ১০ কোটি টাকা দাম ঠিক করেন কয়েনটির। দেড় কোটি টাকা নগদ দিয়েও দেন। ধাপে ধাপে বাকি টাকা পরিশোধের কথা বলেন। এরপর যাদের কাছ থেকে কয়েন কিনেছেন, তাদের আর নাগাল পান না। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারেন, প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি। এ-ও জানতে পারেন, বিশেষ সেই কয়েনটি কেবলই কাঠের একটি কয়েন। বিভিন্ন কেমিকেল ব্যবহার করে রঙচঙ মাখিয়ে একে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছিল!

বিজ্ঞাপন

এমনই এক প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগশন (পিবিআই)। বৃহস্পতিবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ‘কয়েন তেলেসমাতি’র আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

কয়েনের তেলেসমাতি, কোটি টাকা খোয়ালেন শিল্পপতি

বিজ্ঞাপন

পিবিআইয়ের তদন্তের পর গ্রেফতার পাঁচ জন হলেন— আক্তারুজ্জামান, সালাম, মনিরুজ্জামান কামরুল ওরফে জামান, আবু তাহের জবা ও শফিকুল ইসলাম স্বপন। তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত দু’টি কাঠের কয়েন, নগদ ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ও বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করা হয়। তবে হাতিয়ে নেওয়া দেড় কোটি টাকা এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, প্রতারক চক্রটি এই বলে প্রলোভন দেখাতে যে, এটি একটি বিশেষ কয়েন। গবেষণার কাজে কয়েনটি নাসায় ব্যবহৃত হয়। এটি কিনে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা যাবে, যার ক্রয়মূল্য ১২ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েনটির ব্যাপক চাহিদা। এই কয়েন কেনার জন্য তারা হন্যে হয়ে খুঁজছেন।

বিজ্ঞাপন

পিবিআই প্রধান বলেন, প্রতারকদের এমন প্রলোভনে পড়ে মিলিয়ন ডলার লাভের আশায় প্রতারকদের কথামতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি আনন্দ গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. বারী (৭০)। এ কয়েনটি কিনতে তিনি প্রতারকদেরকে দেড় কোটি টাকাও দিয়েছেন।

ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরে বনজ কুমার বলেন, ব্যবসায়িক সূত্রে বছরখানেক আগে আনন্দ গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. বারীর সঙ্গে পরিচয় হয় আবু তাহের জবা নামের এক ব্যক্তির। সেই তাহের বিশ্বাস অর্জন করে ড. বারীকে জানান, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় সালাম নামের একজনের কাছে একটি মহামূল্যবান কয়েন আছে। সেই কয়েন নাসায় গবেষণার কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর জামান নামের একজন আমেরিকান ক্রেতাও আছেন, যিনি সে কয়েনটি কেনার জন্য খুঁজছেন। কিন্তু আনন্দ গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কয়েন কিনে যদি সরকারকে ৩৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়া হয়, তাহলে এই কয়েন বৈধ হয়ে যাবে এবং এর দাম বহুগুণ বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, তাহেরের এমন প্রস্তাবের প্রলোভন এড়াতে পারেননি ড. বারী। তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েনটির কেনার জন্য একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। এক পর্যায়ে গত ৯ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঝিনাইদহের উদয়পুর গ্রামের বিসিক এলাকায় জামান নামে আমেরিকান ক্রেতা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তার। তিনি কয়েনটি পরীক্ষা করে জানান, এটি আসল কয়েন। পরে আনন্দ গ্রুপের চেয়ারম্যান কয়েনটি ১০ কোটি টাকায় কিনতে রাজি হন।

কয়েনের তেলেসমাতি, কোটি টাকা খোয়ালেন শিল্পপতি

পরে আনন্দ গ্রুপের পক্ষে মহাব্যবস্থাপক এ এইচ এম মাহবুব আলাম সরকার নগদ দেড় কোটি টাকা দেন এবং ক্রেতা জামান সাড়ে ৮ কোটি টাকার চেক দেন বিক্রেতা সালামকে। তারা বলেন, ড. বারী যেহেতু আপাতত দেড় কোটি টাকা দিচ্ছেন, জামান তাই সাড়ে ৮ কোটি টাকা তাকে ধার দিচ্ছেন। টাকা লেনদেনের পর কয়েনটি নিয়ে ঢাকা চলে আসেন আনন্দ গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক। কিন্তু বাকি টাকা পরিশোধের বিষয়ে ক্রেতা জামানের সঙ্গে ড. বারী যোগাযোগ করলে, জামান জানান তিনি সিলেটে আছেন। ঢাকায় এসে এ বিষয়ে আলাপ করবেন। তিন দিন পর জামান ফোন করেন ড. বারীকে। জানান, আগের কয়েনটি নকল। আসল কয়েনটি তার কাছে। যদি সেটি কিনতে চান, তাহলে ১০ কোটি টাকা দিতে হবে।

‘এ পরিস্থিতিতে ড. বারী বুঝতে পারেন যে তিনি প্রতারণার শিকার। জামান, তাহের— তারা সবাই পূর্বপরিচিত। তারা কথিত আমেরিকার নাগরিক। ততক্ষণে তাদের সবার ফোন বন্ধ। পরে এ ঘটনায় গত ৬ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি মামলা করেন ড. বারী। পরে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে এলে মূল ঘটনা জানা যায়,’— বলেন পিবিআই প্রধান।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় প্রথমে মো. আক্তারুজ্জামানকে গ্রেফতার করলে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সালামকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর একে একে বাকিদেরও গ্রেফতার করা হয়।

ড. বারীর মতো লোকেরা কেন প্রতারণার শিকার হন— এমন প্রশ্নের জবাবে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘সর্বস্বান্ত হতে মানুষ প্রতারণার শিকার হয়। তা না হলে এই কয়েনের কী এমন তেলেসমাতি যে এর জন্য মানুষ টাকা দিতে পাগল হয়ে যাচ্ছে! সবকিছু খোয়ানোর আগ পর্যন্ত কেউ প্রতারণার বিষয়টি বুঝতেই পারছে না। আর প্রতারণার শিকার হচ্ছে জেনেও মানুষ সর্বস্বান্ত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের কাছে আসে না। এটা তাদের বড় সমস্যা। যদি তা না হয়— কয়েনটি নিয়ে যারা প্রতারণা করেছিল, তারা কেউ এসএসসিও পাস করেনি। অথচ শিক্ষিত লোকেরা তাদের কাছে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।’

প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে মানুষের কী অবস্থা হয়, তার আরেক উদাহরণ টেনে পিবিআই প্রধান বলেন, আজ সকালে বিমানবন্দর থেকে এক ব্যক্তিকে আমাদের গাড়িতে করেই অফিসে নিয়ে এসেছি। তিনিও অন্য একটি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। এরই মধ্যে ২ কোটি টাকা দিয়েও দিয়েছেন। আরও টাকা দেবেন বুঝতে পেরে তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আটকে রাখেন তার জামাতা। তার জামাতাও চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ী। কোনোভাবে তার শ্বশুরকে আরও টাকা দিতে আটকাতে না পেরে আমাদেরকে জানান। পরে আমরা বিমানবন্দর থেকে আমাদের গাড়িতে করে ওই ব্যবসায়ীকে অফিসে নিয়ে আসি। তিনি প্রতারকদের টাকা দিতে এমন পাগল হয়ে গিয়েছিলেন যে বাসায় যেতে পারলে আবার টাকা দেবেন।

তিনি আরও বলেন, শুধু এই ব্যক্তি নন, একজন সিনিয়র সচিব তার জীবনের সব সম্পদ প্রতারক চক্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। রিটায়ামেন্টের ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা তিন মাস পর দ্বিগুণ হবে— এ আশায় তিনি সব টাকা তুলে দিয়েছেন প্রতারকদের। মানুষ কেন এসব টাকা দিয়ে দিচ্ছে? তারা কেন বুঝতে চায় না কোনটা আসল কোনটা নকল? এতই লোভ মানুষের!

প্রতারকদের খপ্পরে চলে যাওয়া টাকা উদ্ধার প্রক্রিয়া জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টাকা উদ্ধার করে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ টাকাই উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল।

সারাবাংলা/এসএইচ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন