বিজ্ঞাপন

কেমনে পশিল প্রাণের পর

February 4, 2021 | 4:32 pm

কাজী এম আরিফ

আমাদের বাংলার শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সকল শিক্ষকের মতো তিনিও সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট আর টাই পরে ক্লাসে আসেন। প্যান্টের রঙ মাঝে মধ্যে বদলায় কিন্তু শার্টের কোন পরিবর্তন নাই। গম্ভীরভাবে ক্লাসে ঢোকেন। মোটামুটি পুরোটা সময় গম্ভীর থাকেন। ক্লাস সেভেনে, সেই ১৯৭৬ সালে, দুরু দুরু বুকে ক্যাডেট কলেজের কঠিন নিয়ম মেনে চলি দিনমান। ছকে বাঁধা জীবনে শিক্ষকরা হাসবেন না, এটা মানতে কষ্ট হয়না। কিছুদিনের মধ্যে বেশ বুঝতে শুরু করি, এই শিক্ষক বেশ খানিকটা ভিন্ন। পাঠ্য বইয়ের ভিতরের বিষয়ের চাইতে বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে বেশি কথা বলেন। প্রথম টার্মের শেষেই তিনি ফরমায়েস দিলেন ছুটি থেকে ফিরে আসবার সময়ে সবাইকে একখানা ‘চলন্তিকা’ অভিধান আর ‘গল্পগুচ্ছ’ আনতে হবে। দ্বিতীয় টার্মের শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের জগতে আমাদের যাতায়াত শুরু হয়ে যায়। শিক্ষকের আদেশমাফিক পড়তে লাগি। কতটা বুঝতে পারি সেটা জরুরি মনে হয় না। এর পরের বছর আমাদের পাঠ্য তালিকায় যুক্ত হয় বুদ্ধদেব বসুর ‘আমার ছেলেবেলা’। সরকার প্রদত্ত সিলেবাসের সাথে কোন সম্পর্ক নাই, তবু আমরা পাতার পর পাতা বুদ্ধদেব বসু পড়ি। মনে বা মননে ধারণ করি কিনা বুঝতে পারি না।

বিজ্ঞাপন

অল্প কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ চলে এলো তালিকায়। এবারের আদেশ, দীর্ঘ কবিতাটি সবাইকে মুখস্ত করতে হবে এবং দুদিন পরে আবৃত্তি করতে হবে। মুখস্ত করতে আমরা কমবেশি সবাই অভ্যস্ত, বুঝি আর না বুঝি। কিন্তু আবৃত্তি বিষয়টা একেবারে নতুন, অন্তত আমার কাছে। অতশত না ভেবে গড় গড় করে পড়তে থাকি। পরের ক্লাসে একে একে সবাই কবিতাটি উগড়ে দেয় আবৃত্তি’র ঢঙে। ‘বাবুদের তাল-পুকুরে’ আর ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ পড়ে আসা কিশোরের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ পড়ছে। গম্ভীর রফিকুল ইসলামের তা একেবারেই মনঃপুত হলো না। ‘না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ’ লাইনটাতে ‘জানি’ শব্দটা অনেকেই সঠিক উচ্চারন করছে না। ‘থরথর করি কাঁপিছে ভূধর’ লাইনে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার উপেক্ষিত, অথবা ‘ছ’ এর উচ্চারন ‘স’ এর মত হয়ে যাচ্ছে অনেকের । আমরা বেশ বুঝতে পারি, তিনি হতাশ আর বিরক্ত হচ্ছেন। এরকম ঘটনা আরও কয়েকবার ঘটেছে ক্যাডেট কলেজে, বাকি কয়েকটা বছরে।

ক্লাস টেনে একটি কবিতা লিখে ফেললাম। বছরখানেক বাদে সেটা সাইক্লোস্টাইল করে ছাপা ‘ডাহুক’ পত্রিকায় জায়গাও করে নিলো ক্যাডেট-কবিদের মাঝে। আরও মনে পড়ে, ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর, সম্ভবত ১৯৮১ সালে, ভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম প্রতিযোগিতার জন্য। প্রায় চল্লিশ বছর পর, সেদিন পুরস্কার পাওয়া বইটা খুঁজে পেয়েছি। সম্প্রতি ‘ডাহুক’-এর মলিন আধা-ছেঁড়া সংখ্যার ‘ডিজিটাইজ’ কপি পেলাম সিডনি প্রবাসী বন্ধু রফিক-এর কাছ থেকে। জীবনের প্রথম কবিতা রচনা। ছাপার অক্ষরে প্রকাশ। প্রথম আবৃত্তি আর লেখালেখির স্বীকৃতি। সে কি শিহরণ!

বিজ্ঞাপন

আমাদের বয়স বাড়ে। ফি বছরে পরের ক্লাসে উঠে যাই। কিশোর ক্যাডেটরা তরুণ হতে থাকে। বাংলার ক্লাসে ‘হৈমন্তী’ আসে, নির্ধারিত সিলেবাসের সাথে। ‘আমি পাইলাম, ইহাকে পাইলাম’- উক্তির বিশ্লেষণ করেন শিক্ষক। ‘কি পাইলাম’ তা নিয়ে কি ঘোর কাটে ?

হৈমন্তীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে ততদিনে কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছি। বিশ্লেষণ আরও ব্যাপৃত হয় জোহরা-র পেক্ষাপটে, যখন ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ শুরু হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ট্র্যাজেডির সাথে গ্রীক ট্র্যাজেডির তুলনামূলক আলোচনা চলে। শেকস্পিয়ার আসে। জুলিয়াস সীজার, ম্যাকবেথ, ওথেলো এই নামগুলোর সাথে পরিচয় হয়। পরিচয় হয় ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ আর ‘অপুর সংসার’ নামগুলোর সাথে। সত্যজিৎ রায়কে চেনা শুরু করি। ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ পুরোটা বুঝতে পারিনা। খুব একটা যে আগ্রহ পাই তাও নিশ্চিত করতে পারিনা। ‘নষ্ট নীড়’-এর চারু কিংবা ‘ঘরে বাইরে’-র বিমলা বোধহয় দাগ কাটে মনে। বিপ্লবী সন্দীপের রাজনীতি আর ব্যক্তিগত জীবনের দ্বন্দ অল্প অল্প করে জায়গা করে নেয় আমাদের মনে। এসব কিছু পাঠ্য তালিকায় থাকে না, রেফারেন্স হিসেবে শিক্ষকের আলোচনায় আসে অহরহ। আমরা বিহ্বল হয়ে শুনতে থাকি । যৌবনের দ্বারপ্রান্তে এসে প্রেম-বিরহের অনুভূতিগুলো নাড়া দিতে শুরু করে। এমনি এক সময়ে কমল কুমার মজুমদারকে চিনতে শুরু করি। প্রথম পরিচয়ে অত্যন্ত দুর্বোধ্য মনে হয়। এতদিন যাদের কথা শুনেছি, তাদের কারো সাথে মেলাতে পারিনা। ২৫০ পৃষ্ঠার ‘সুহাসিনীর পমেটম’ উপন্যাসে কোন যতিচিহ্ন, দাড়ি-কমা নাই, অন্য সব কিছুর চেয়ে সেটিই আকর্ষণ করে আমাদের।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির বিষয়সমূহ আলোচনা আর জ্ঞান আহরণ একসময় শেষ হয়। নিয়মমাফিক ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে যাই। সেটা ১৯৮২।

শিক্ষক রফিকুল ইসলামের সাথে দেখা হয় না দীর্ঘদিন। জীবনের বিস্তৃত পরিসরে যে যার মত ছড়িয়ে যাই আমরা। ভিন্ন ভিন্ন পেশায়, জীবন-জীবিকার স্রোতে ভাসি। সুদূর কিশোরবেলায় আর যৌবনের শুরুতে বাংলার ক্লাসে পাওয়া ধারণাগুলো অনেকাংশেই হয়তো সাথে রয়ে যায়। এক ধরনের জীবনবোধ তৈরি করতে কাজ করে যায় ভেতরে ভেতরে। নিজের অজান্তে শুদ্ধ সংগীত, শিল্পকলা, সাহিত্য আর কৃষ্টির প্রতি আগ্রহ জন্ম নিতে থাকে। হয়তো কিছু লিখতে গিয়েছি, হোক সেটা ব্যর্থ কাব্যচর্চা, অথবা কখনো হলভর্তি দর্শকের সামনে উচ্চারণ করছি নাজিম হিকমত, ‘যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর তা আজও আমারা দেখিনি...’- এ সবইতো শৈশবে মনে গেঁথে যাওয়া আধা-স্পষ্ট উপলব্ধির অকপট অনুরণন।

বিজ্ঞাপন

পরিণত বয়সে ফৈয়াজ খাঁ-র হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয়-সঙ্গীত, বেগম আখতারের রাগাশ্রয়ী কন্ঠ, নিধুবাবুর টপ্পা, আলাউদ্দিন খাঁ-র মোহময় সরোদ অথবা বৈজয়ন্তীমালার অনবদ্য ভরতনাট্যম আকর্ষণ করে, আচ্ছন্ন করে। বেশ বুঝতে পারি, এসবের প্রতি সংবেদনশীলতার বীজ বপন হয়েছিল ক্লাসের চার দেওয়ালের পরিসরে। এই নামগুলোর সাথে পরিচয় হয়েছিল সেখানেই। আরও স্মরণে আসে, ‘দেশ’ পত্রিকা, সাগরময় ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুধীনদত্ত আর এই বাংলার আহমদ ছফা, বেলাল চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ আর হুমায়ুন আহমেদকে জানবার শুরুটাও সেখানেই।

প্রায় দুই দশক পর আবারও দেখা পাই এই শিক্ষকের। তখন তিনি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ। সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মির্জাপুর এক্স ক্যাডেট্স্ এসোসিয়েশন (মেকা)- এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করবার প্রক্রিয়ায় সাক্ষাত হয় অনেকবার। ক্লাসের বাইরে তিনি আর তখন গম্ভীর থাকেন না। অনেক সহজ, হাস্যোজ্জ্বল, খোলামেলা। আমাদের আলাপচারিতার পরিসরও বিস্তৃত হয়। আজকের লেখায় সেগুলো ততো প্রাসঙ্গিক নয়।

বিজ্ঞাপন
কেমনে পশিল প্রাণের পর

একযুগ হয়ে এলো সম্পূর্ণ অবসরে আছেন তিনি। নিভৃতে, একান্তে লেখালেখি করে চলেছেন। সেখানে তিনি রফিক কায়সার। এই নাম পরিবর্তনের ইতিবৃত্ত আমাদের জানা নাই। সেইরকম অনেক কিছুই আমাদের জানা হয় নাই। কেমন ছিল তাঁর ছেলেবেলা, কৈশোর যৌবন? শিক্ষক রফিকুল ইসলাম আছেন মননের অনেকটা জুড়ে। ব্যক্তি রফিকুল ইসলাম বা রফিক কায়সার ততোধিক অপ্রকাশিত, অপ্রচারিতও। বড় সাধ হয়, তিনি যদি আত্মজীবনী রচনায় নিবৃত্ত হতেন জীবনের এই বেলায়। অগণিত ছাত্রকুল আর বিদগ্ধ পাঠকেরা তাতে আরও সমৃদ্ধ হতে পারবে, সন্দেহ নাই। কিশোরবেলায় পাওয়া চেতনা, আত্মজিজ্ঞাসার উপলব্ধি, শুদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি পক্ষপাত অনুপ্রেরণা হয়ে সাথে থেকেছে সদা-সর্বত্র।
এর জন্য তাঁকে কখনো কৃতজ্ঞতা জানানো হয় নাই।
‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার অর্থ বুঝতে হয়তো কেটে যাবে বাকি জীবন। কিন্তু ‘কেমনে পশিল প্রাণের পর’ চরণটির মাঝে সতত জাগ্রত থাকবেন মহোত্তম এই শিক্ষক।
আপনাকে বিনম্র অভিবাদন স্যার!

কাজী এম আরিফ
স্থপতি । সাবেক সাধারন সম্পাদক, মির্জাপুর এক্স ক্যাডেটস এসোসিয়েশান।

ঢাকা। ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২১।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন