বিজ্ঞাপন

নির্যাতনের বিরুদ্ধে অনলাইনে সরব কুয়েতের নারীরা

February 9, 2021 | 10:03 pm

রোকেয়া সরণি ডেস্ক

কুয়েতের ফ্যাশন ব্লগার আসিয়া আল ফারাজ একটি ক্যাম্পেইন শুরু করেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার ২৫ লাখেরও বেশি সংখ্যক অনুসরণকারী রয়েছে। প্লাটফর্মটি ব্যবহার করে সেখানকার নারীরা তাদের বিরুদ্ধে হওয়া হয়রানির বিষয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। প্লাটফর্মটি ব্যবহার করে কুয়েতের মেয়েরা দেশটিতে প্রচলিত দীর্ঘদিনের রক্ষণশীলতা ও ‘লজ্জার’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ইনস্টাগ্রামে আরবি ‘ল্যান আসকেত’ যার অর্থ ‘আমি চুপ থাকবো না’ নামে এক একাউন্টে অসংখ্য নারী তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নানারকম নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরছেন। নারীরা তাদের সঙ্গে হওয়া স্টকিং (পিছু নেওয়া), হয়রানি ও অপমানের কথা লিখছেন। কুয়েতের নাগরিকদের পাশাপাশি অসংখ্য প্রবাসী নারীও তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন।

কুয়েতি ফ্যাশন ব্লগার আসিয়া আল ফারাজ গত সপ্তাহে এক বিস্ফোরক ভিডিওবার্তা দেন, যা সারাদেশে আলোড়ন তোলে। তিনি নিজের দেশে একটি ‘সমস্যা’ রয়েছে বলে সেখানে মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

আবেগাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি ওই ভিডিওবার্তায় বলেছেন, ‘প্রতিবার বাইরে গেলে আমি নিজে হয়রানির শিকার হই অথবা অন্য কোনো নারীকে হতে দেখি।’

ভিডিওটিতে দেখা যায়, কথা বলার আগে তিনি তার গাড়ির কাছে হেঁটে যাওয়ার সময় অন্য একটি গাড়ি দ্রুতবেগে এসে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে।

বিজ্ঞাপন

‘তোমাদের কী কোনো লজ্জা নেই? আমাদের দেশে হয়রানি করার সমস্যা আছে এবং আমি যথেষ্ট সহ্য করেছি। আর করবো না’— বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফারাজের এই ভিডিওটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, আলোড়ন তোলে সারাদেশেও। এর আগে ২০১৭ সালে আমেরিকায় হ্যাশ ট্যাগ #মিটু আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে গেলেও কুয়েতে এর বিন্দুমাত্র প্রভাবও পড়েনি। তবে এবার নড়েচড়ে উঠেছে পুরো কুয়েত।

বিজ্ঞাপন

রেডিও এবং টেলিভিশনে এই বিষয়ে মন্তব্য দেওয়ার জন্য অ্যাক্টিভিস্ট, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদদের ডাকা হয়। এই আন্দোলন কুয়েতের আমেরিকান দূতাবাসেরও সমর্থনও পেয়েছে।

দূতাবাস থেকে গত সপ্তাহে এক টুইট বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এমন আন্দোলন অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। আমরা নারীর প্রতি হয়রানি রোধে আরও অনেক কাজ করতে পারি তা আমেরিকা হোক কি কুয়েত।’

বিজ্ঞাপন

আরও একটি টুইটে ইলাস্ট্রেটেড গ্রাফিকসের মাধ্যমে তারা এই ক্যাম্পেইন তুলে ধরেন। এই গ্রাফিকসে তিন জন নারীকে দেখা গেছে যাদের প্রত্যেকের হাতে ধরা কার্ডে লেখা, ‘আমাকে হয়রানি করবেন না’। এই তিন নারীর একজনের মুখমণ্ডল ঢাকা, একজন শুধু মাথায় স্কার্ফ পরা ও অন্য একজন পর্দা ছাড়া।

য়রানির চিত্র

বিদেশ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে গত বছর দেশে ফেরা ২৭ বছরের শায়মা শ্যামো ফারাজের ভিডিও দেখার পর ‘ল্যান আসকেত’ বা ‘আমি চুপ থাকবো না’ নামে ক্যাম্পেইন শুরু করেন।

এ বিষয়ে শ্যামো সংবাদমাধ্যম এএফপিকে বলেন, ‘একাউন্ট খোলার সঙ্গে সঙ্গেই একের পর এক মেসেজ আসতে থাকে... মৌখিক (বাজে কথা) ও শারীরিক উভয় ধরনের নির্যাতনের শিকার বিভিন্ন বয়সী নারীরা তাদের ওপর ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো সেখানে লিখতে থাকেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আর চুপ করে থাকবো না। আমাদের অবশ্যই আওয়াজ তুলতে হবে, সংগঠিত হতে হবে ও একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ, যা হচ্ছে (নারী নির্যাতন) তা অসহনীয়।’

এদিকে ফারাজ অন্য আরেকটি ভিডিওতে বলেন, তিনি কুয়েতে কর্মরত ভারতীয়, পাকিস্তানী ও ফিলিপিনো নারীদের কাছ থেকেই ‘ভয়ানক ঘটনা’ শুনেছেন।

‘প্রবাসী নারীরা এদেশে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। তাদের সঙ্গে এমন সব ঘটনা ঘটে যা কুয়েতি নারীরা চিন্তাও করতে পারবেন না’—বলেন ফারাজ।

একদিকে অনলাইনে এই ক্যাম্পেইন যেমন প্রচুর সমর্থন পেয়েছে, অন্যদিকে কুয়েতের রক্ষণশীল সমাজের থেকে বিরোধিতাও কম পায়নি। তাদের মতে নারীরা ঢেকেঘিরে চললেই আর তাদের সঙ্গে হয়রানির ঘটনা ঘটবে না।

এ বিষয়ে ফারাজ বলেন, ‘এই ক্যাম্পেইন নিয়ে আপনার ভালো কিছু বলার না থাকলে বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু যোগ করার না থাকলে... কিছুই বলার দরকার নাই।’

‘আমরা এমন কিছু নিয়ে কাজ করছি যার সুফল ভোগ করবে সবাই। সমাজের সবাই, এমনকি পুরুষরাও যৌন নির্যাতনে বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে ও অভিযোগ জানাতে পারবে’—যোগ করেন তিনি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জেষ্ঠ্য গবেষক রথনা বেগম এএফপিকে বলেন, ‘ধ্যপ্রাচ্যের এমন একটি দেশের (কুয়েতের) নারীরা মুখ খুলছেন যেসব দেশে (মধ্যপ্রাচ্যের) পুলিশ সাধারণত এসব অভিযোগে গুরুত্বই দেয় না। আবার পারিবারিকভাবে সামাজিক পরিসরে লজ্জার শিকার হওয়ার ভয়েও অনেকে মুখ খোলেন না। কুয়েতের মতো পরিবেশে এসব হ্যারাসমেন্টের ভয়াবহতার গুরুত্ব বোঝাতে এই অ্যাকাউন্টগুলোর প্রয়োজন ছিল।’

লজ্জার সংস্কৃতি থেকে মুক্তির লড়াই

লজ্জা শব্দটি আরবি ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই নানা ধরনের ব্যবহার রয়েছে। শ্যামো জানান, ‘কুয়েতি সমাজে অভিযোগ করতে থানায় যাওয়াও ‘লজ্জাজনক ঘটনা’ আবার নিজের ওপর ঘটে যাওয়া হয়রানির ঘটনা জানানোও লজ্জার।’

‘যখনই কোনো নারী তার ওপর হওয়ার হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ করেন সঙ্গে সঙ্গেই পরিবার থেকে প্রশ্ন আসতে থাকে- তোমার পরনে কি ছিল? কার সঙ্গে ছিলে? কয়টার সময় বাইরে ছিলে?’— বলেন তিনি।

তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে খোলামেলা বলে খ্যাত কুয়েতের নারীরা সমাজের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠাতে শুরু করেছেন। যেখানে নারী নির্যাতন শুধু বইয়েই লেখা থাকে এবং এসব নিয়ে কথা বলাও অন্যায়।

লুলু আল-আসলাওই নামক একজন কুয়েতি মিডিয়া ব্যক্তিত্বের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে রঙচঙা ফ্যাশন ফটোশুটের ছবিতে ভরা। অনলাইনে তাকে প্রায়ই পোশাকের জন্য হয়রানির শিকার হতে হয়। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সমাজ অপবাদ দেবে এই ভয়ে এখানকার (কুয়েতের) মেয়েরা সাধারণত মুখ খোলে না। কিন্তু আমরা সমাজের এই ‘ক্যানসার’ দূর না করা পর্যন্ত থামোবো না।’

সারাবাংলা/আরএফ/এমআই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন