বিজ্ঞাপন

‘চারুলতা’ ও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তার হাতের দূরবিন

February 10, 2021 | 9:51 pm

এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক

মঞ্চে অভিনয় তাকে আকর্ষণ করত ছোটবেলা থেকেই। তবে প্রথম দিকে ছিল তা নিতান্তই শখ। তখনও জানতেন না তিনিই বাংলা ছবির ভবিষ্যতের ‘চারুলতা’। তিনি মাধবী মুখোপাধ্যায়— বাংলা চলচ্চিত্রে নারীকেন্দ্রিক ছবির অন্যতম মুখ। ছিলেন প্রথম সারির সব পরিচালকের পছন্দের অভিনেত্রী।

বিজ্ঞাপন

আজ (১০ ফেব্রুয়ারি) বাংলা চলচ্চিত্রের ‘চারুলতা’ খ্যাত এই কিংবদন্তীর জন্মদিন। ১৯৪২ সালের এইদিনে কলকাতায় জন্ম হয় এই অভিনেত্রীর। চলচ্চিত্রে আসার আগে তার আসল নাম ছিল মাধুরী। জানা যায়, ১৯৬০ সালে মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে ছবির প্রযোজক বিজয় চট্টোপাধ্যায় তার নতুন নামকরণ করেন মাধবী। তারপর এই নামেই তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রকে।

‘চারুলতা’ ও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তার হাতের দূরবিন

বিজ্ঞাপন

শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু লাহিড়ী এবং ছবি বিশ্বাসের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে মঞ্চে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ শৈশবেই। ১৯৫৩ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে তিনি অভিনয় করেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র পরিচালিত ‘দুই বিয়ে’ ছবিতে। তখন অবশ্য তিনি মাধুরী। এই নামেই তিনি অভিনয় করেন তপন সিন্‌হার ‘টনসিল’ ছবিতেও।

‘বাইশে শ্রাবণ’ এবং ‘আজ কাল পরশু’ ছবিতে তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। তিনি মাধবীকে সুযোগ দেন ‘মহানগর’ ছবিতে। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘অবতরণিকা’ ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে ‘আরতি’-র ভূমিকায় মাধবীর দৃপ্ত অভিনয় শুধু বাংলা ছবির নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সম্পদ।

বিজ্ঞাপন

‘চারুলতা’ ও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তার হাতের দূরবিন

১৯৬৩ সালে ‘মহানগর’-এর পরের বছরই মুক্তি পায় ‘চারুলতা’। সত্যজিৎ রায়ের এই আইকনিক ছবিতে বাঙালির মনের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয় চারুলতা এবং তার হাতের দূরবীন। একাধিক সাক্ষাৎকারে মাধবী বার বার জানিয়েছেন, ‘চারুলতা’-ই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবি। চারুর মতো জটিল চরিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পেরে তার ভাল লেগেছিল। অভিনয়জীবনের শুরুতেই ‘মহানগর’ এবং ‘চারুলতা’-র মতো নারীকেন্দ্রিক ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ তার কাজের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল বলে মনে করেন মাধবী।

বিজ্ঞাপন

‘চারুলতা’ ও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তার হাতের দূরবিন

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি এখনও অমলিন মাধবীর মনে। সত্যজিতের ইউনিট থেকে দু’জন এসে তার সঙ্গে কথা বলেন। জানান, পরিচালক তার সঙ্গ‌ে দেখা করতে চেয়েছেন। সে সময় মাধবী উত্তর কলকাতার বাসিন্দা। সত্যজিৎ থাকতেন দক্ষিণ কলকাতায়। অত দূর ট্যাক্সিভাড়া দিয়ে যেতে আপত্তি ছিল মাধবীর। কারণ, তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তাকে খারিজ করে দেবেন পরিচালক। কিন্তু মাধবীর মা অনড়। তিনি মেয়েকে পাঠাবেনই। শেষ অবধি মায়ের কথাতেই মাধবী গিয়েছিলেন। দু’তিন বার সাক্ষাতের পরে তার হাতেই চিত্রনাট্য তুলে দেন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক। পরে তিনি বলেছিলেন, মাধবীর মধ্যে অভিনয়ের সহজাত গুণ আছে। তাকে বেশি শেখাতে হয় না। সহজেই তিনি সেরাটা উজাড় করে দেন পর্দায়।

বিজ্ঞাপন

সত্যজিৎ-মাধবীর সম্পর্কের গুঞ্জনও বাংলা ছবির অন্যতম অংশ। তারা দু’জনে কোনও দিন এই গুঞ্জন নিয়ে কিছু বলতে চাননি। তবে এই টানাপড়েন লুকিয়ে থাকেনি বিজয়া রায়ের কলমে। তিনি তার আত্মজীবনী ‘আমাদের কথা’-য় লিখেছেন এই গুঞ্জন তাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে সেখানেও অভিনেত্রীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় সত্যজিতের পরিচালনায় মাধবীর তৃতীয় তথা শেষ ছবি ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’। এর পর দু’জনকে আর একসঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়নি।

‘চারুলতা’ ও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তার হাতের দূরবিন

শুধু সত্যজিৎ রায়ই নন। মাধবী তার অভিনয় প্রতিভার ছাপ রেখেছেন মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনাতেও। ঋত্বিক ঘটকের ছবি ‘সুবর্ণরেখা’-য় মাধবীর কালজয়ী অভিনয় আজও উজ্জ্বল দর্শকস্মৃতিতে।

সমান্তরাল ছবির পাশাপাশি মাধবী সুরভিত করেছেন মূলধারার বাণিজ্যিক বাংলা ছবিকেও। উত্তমকুমারের বিপরীতে ‘অগ্নীশ্বর’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘শঙ্খবেলা’ ছবিতে মাধবী নিজেকে মেলে ধরেছিলেন ছক ভাঙা সাবলীল অভিনয়ে। তার কেরিয়ারে উল্লেখযোগ্য বাকি ছবি হল ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘সমান্তরাল’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘গণদেবতা’, ‘সাহেব’, ‘কলকাতা ৭১’, ‘চোখ’, ‘উৎসব’ এবং ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’।

বড় পর্দার পাশাপাশি মাধবী সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন টেলিভিশনেও। ‘ইষ্টিকুটুম’, ‘হিয়ার মাঝে’, ‘কুসুমদোলা’, ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে মাধবী দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কুশীলবদের সঙ্গে।

‘চারুলতা’ ও বাঙালির মনের মণিকোঠায় তার হাতের দূরবিন

ব্যক্তিগত জীবনে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন অভিনেতা নির্মলকুমারের সঙ্গে। কিন্তু সেই দাম্পত্য ভেঙে গিয়েছে। বিবাহিত সম্পর্ক থাকলেও দু’জনে আলাদা থাকেন। তবে দু’জনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধুত্ব আছে এখনও। কিছু দিন আগেই নির্মলকুমারের জন্মদিনে মাধবীর উপস্থিতির ছবি উজ্জ্বল হয়ে আছে নেটাগরিকদের মনে।

নিতান্তই নায়িকা হতে কোনও দিন চাননি মাধবী। তাই বলে জনপ্রিয়তায় ভাটাও পড়েনি। দেখিয়ে দিয়েছেন একইসঙ্গে বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা এবং সমান্তরাল ছবির সফল অভিনেত্রী হওয়া যায়। বাঙালির মনের মণিকোঠায় এখনো চিরস্থায়ী জায়গা করে আছে তার হাতের দূরবিন।

তথ্য ও ছবি: ইন্টারনেট

সারাবাংলা/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন