বিজ্ঞাপন

নতুন আইনে বদলে যাবে শিক্ষার অনেক কিছুই

February 20, 2021 | 8:43 am

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশিয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও ‘স্বাভাবিক’ এমন অনেক বিষয় বাতিল করে সম্প্রতি ‘শিক্ষা আইন-২০২০’ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইন বাস্তবায়ন হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় রকমের রদবদল আসবে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা আইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে; সেটি হলো নোট গাইড নিষিদ্ধকরণ। এছাড়াও এই আইনে কওমী শিক্ষায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। একই আইনে শিক্ষকদের কোচিং-টিউশনিও বন্ধ করবে সরকার।

এই আইনের খসড়া চূড়ান্ত করতে গত মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সভায় সভাপতির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, আইনটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আরও একধাপ এগিয়ে নেবে।

বিজ্ঞাপন

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা আইন-২০২০ এর খসড়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন এটি মন্ত্রিপরিষদ সভা হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। সেখান থেকে এই আইন উত্থাপিত হবে জাতীয় সংসদে। পরে রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলে এটি আইন হিসেবে কার্যকর হবে।

দেশিয় শিক্ষায় বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এই আইনটির খসড়া লেখা হয়েছে। যে বিষয়গুলোকে শিক্ষার জন্য যথোপযুক্ত মনে হয়নি, সেগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন আইনে নোট গাইড নিষিদ্ধের পাশাপাশি শিক্ষকদের কোচিং না করানোর বিধানও রাখা হয়েছে। শিক্ষকরা যেমন কোচিং করাতে পারবে না, তেমনি শিক্ষার্থীরাও শ্রেণি কার্যক্রম চলার সময় কোনো কোচিংয়ে ভর্তি হতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

তবে কোচিং চালাতে পারবেন শিক্ষা পেশার বাইরের মানুষেরা। একইভাবে শিক্ষা সহায়ক বইও প্রকাশ করা যাবে। এই বিষয়গুলো খসড়া আইনের ১৬ ধারার ১, ২, ৩ ও ৪ উপধারা এবং ৩০ ধারার ১ উপধারায় আলোচনা করা হয়েছে।

এসব ধারায় বলা হয়ছে, নোট বই বা গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা হলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সহায়ক পুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

টিউশন সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদান করতে পারবেন না। পড়াতে হলে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে অভিভাবকদের লিখিত সম্মতিতে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা যাবে।

এই আইনটি নিয়ে ২০১১ সাল থেকে কাজ শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এদিকে এই আইনে সরকার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণে নেবে। সরকারের ক্ষমতা বাড়বে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও। আইনটি বাস্তবায়ন করা হলে এখন থেকে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতও করতে পারবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, কোচিং, গাইড এসব বিষয় থেকে শিশুরা তেমন উপকৃত হচ্ছে না। এটা বরং শিক্ষার সহজাত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে, শিশু-কিশোরদের কল্পনাশক্তিকে আটকে দিচ্ছে একটা গণ্ডির ভেতর। এই আইনটির ভালো দিক হলো এই বিষয়গুলো বতিল করা। শিক্ষকরা কোচিংয়ে পড়ানোর জন্য ক্লাসে ঠিক মতো পড়ান না। লাভের জন্য নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন। আইনটি শিক্ষার এই বেপরোয়া বাণিজ্যিকিকরণ আটকে দেবে।

তিনি আরও বলেন, অনৈতিক শিক্ষকদের শিক্ষকতা করার কোনো অধিকার থাকা উচিত নয়। এই আইনে এমন শিক্ষকরা সতর্ক হবেন। এটা সার্বিকভাবে শিক্ষার জন্যই ভালো। শিক্ষকরা যদি ক্লাসে মনোযোগ দেন শেখার পরিবেশটা সহজ হবে, প্রতিযোগিতা কমবে। দেশেও বেড়ে উঠবে একটি সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনমুখী প্রজন্ম।

ঢাবির সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিকী বলেন, নোট-গাইড বাতিল করার সিদ্ধান্তটি ভালো হয়েছে। এটি সময়ের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় আইন। আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সমানভাবে উপকৃত হবে।

এছাড়াও শিক্ষা আইনের এই খসড়াকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পালও। তিনি বলেছেন, অন্যান্য দেশে এমন নোট গাইড প্রকাশের মতো বিষয় নেই। সহায়ক শিক্ষা বই রয়েছে, আমরাও এসব বই-ই প্রকাশ করে থাকি। এই আইনের কারণে গাইড ব্যবসায়ি বেপরোয়া প্রকাশকরা কিছুটা সাবধান হবে।

প্রসঙ্গত, শিক্ষা আইনের নতুন খসড়ায় অর্ধশত ধারাসহ দুই শতাধিক উপধারা রাখা হয়েছে। খসড়ায় গুরুত্বপূর্ণ আরও যেসব বিষয় রয়েছে তার মধ্যে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি সরকার বা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির ওপর বিধিনিষেধ এবং শিক্ষক সুরক্ষার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।

পরীক্ষায় নকলে সহায়তা করা এবং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও এতে সংশিষ্টতার জন্য ২ বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা দণ্ড অথবা উভয়দণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আইনে কোন শিক্ষার্থী যদি ৬০ শতাংশের কম ক্লাসে উপস্থিত থাকে তাহলে সে উপযুক্ত কারণ প্রদর্শন ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। ৪০ শতাংশের কম ক্লাসে উপস্থিত থাকলে ওই শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।

সারাবাংলা/টিএস/এএম

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন