বিজ্ঞাপন

‘ভাষা আন্দোলন শুরু করার কারণেই বঙ্গবন্ধু জেলে গিয়েছিলেন’

February 21, 2021 | 11:09 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান রয়েছে, এ কথাটা আমাদের অনেক জ্ঞানী-গুণি বুদ্ধিজীবীও মানতে রাজি হতেন না। তাদের কথা হলো, শেখ মুজিব তো জেলে ছিলেন। তিনি আবার ভাষা আন্দোলন করলেন কীভাবে? কিন্তু জেলে তিনি গিয়েছিলেন কেন? তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এই ভাষা আন্দোলন যখন তিনি শুরু করলেন এবং ব্যাপকভাবে প্রচার করলেন- সেকারণেই তাকে বারবার গ্রেফতার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

রোববার (২১ ফেব্রুয়ারি) মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২১’র উদ্বোধন এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০২১ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি রাজধানীর সেগুনবাগিচার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রান্তে যুক্ত ছিলেন।

এদিন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক তুলে দেন। জাতীয় অধ্যাপক বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী, নজরুল গবেষক, লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ তিন ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে এই প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক দেওয়া হলো।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় ক্যাটাগরিতে অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ খাগড়াছড়ির জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা পুরস্কারে ভূষিত হন। আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে উজবেকিস্তানের নাগরিক ইসমাইলভ গুলম মিরজায়েভিচ ও বলিভিয়ার অনলাইনভিত্তিক সংগঠন অ্যাক্টিভিজমো ল্যাঙগুয়াজ পুরস্কারে ভূষিত হন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, ‘যেকোনো জাতির জন্য ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের ভাষায় শিক্ষা নিতে ও কথা বলতে গেলে সহজে আমরা শিখতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ধীরে ধীরে অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। তারপরও বিশ্বব্যাপী ভাষার যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশ একান্তভাবে প্রয়োজন।’

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আমরা আমাদের ভাষা দিবস হিসেবে ব্যবহার করছি, শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে যাচ্ছি এবং ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি; তার সঙ্গে সঙ্গে সারাবিশ্বের সকল ভাষাপ্রেমীদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাই।’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের পিছনে নেপথ্যে যারা কাজ করেছিলেন তাদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন যে তিনি (শেখ মুজিব) যে শুরু করেছিলেন এবং সেখানে তার যে অবদান রয়েছে, একথাটা আমাদের অনেক জ্ঞানী-গুণি বুদ্ধিজীবীও মানতে রাজি হতেন না। তাদের কথা হলো, শেখ মুজিব তো জেলে ছিলেন। তিনি আবার ভাষা আন্দোলন করলেন কীভাবে? জেলে তিনি গিয়েছিলেন কেন? তাকে তো গ্রেফতার করা হয়েছিল। এই ভাষা আন্দোলন যখন তিনি শুরু করলেন এবং ব্যাপকভাবে প্রচার করলেন- সেকারণেই তাকে বারবার গ্রেফতার করা হয়।’ পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্ট সংগ্রহ করে তার তথ্যের ভিত্তিতে ‘সিক্রেটস ডকুমেনটস অব শেখ মুজিব’ খণ্ডগুলো দীর্ঘ ২০ বছর পরিশ্রম করে বই আকারে প্রকাশ করার কথা তুলে ধরেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে কতগুলো তথ্য নিয়ে আমি ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি বক্তব্য দিয়েছিলাম। এতে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলাম। অনেকে আমার সমালোচনা করে আর্টিকেলও লিখেছিলেন। সেটাও আমার মনে আছে। কিন্তু সত্যকে কি কেউ মুছে ফেলতে পারে? পারে না। সেইখান থেকেই কিন্তু আমাদের ইতিহাসের অনেক সত্য বেরিয়ে এসেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই ইতিহাসগুলো আমি আমার অনেক বক্তৃতায় বলেছি। আমি এগুলো বেশি করে বলেছি তখনই যখন সবাই অস্বীকার করত। এখন মনে হয় আমার আর বলার প্রয়োজন নেই। এখন সবাই জানতেই পারবেন। ওই আইবি রিপোর্ট থেকে আরও বেশি জানতে পারবেন।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘ভাষা একটা মানুষের পরিচয়। এবং সেই পরিচয়টাই আমাদের সম্মাান দেয়। জাতির পিতা তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, মাতৃভাষা আন্দোলনে পৃথিবীতে প্রথম বাঙালিরাই রক্ত দিল। দুনিয়ার কোথাও ভাষা আন্দোলনের জন্য গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়নি। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। বাঙালিরাই প্রথম রক্ত দিয়েছে। যে রক্ত দিয়ে রক্তের অক্ষরে ভাষার কথা বলে গেছে।’

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ভাষার উপর আঘাত এমনভাবে এসেছে, প্রথমে আসল আরবি হরফে বাংলা লিখতে হবে। যখন আন্দোলন শুরু করল যে, আমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে চাই, তখন আমাদের অক্ষর-ই বদলে দিতে হবে। তখন আরবি ভাষায় বাংলা লেখার একটা ষড়যন্ত্র করা হলো। সেটাও আন্দোলন করে ঠেকানো হলো। এরপরে আসল ল্যাটিন শব্দে বাংলা লিখতে হবে এবং তখনও আমরা কিন্তু আন্দোলন করেছি। আমাদের বাংলা শব্দে কি সমস্যা ছিল, সেটা জানি না। ভাষার আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। সংগ্রামের পথ বেয়েই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য ভাষা শিখতে হবে। তবে সেইসঙ্গে মাতৃভাষাও শিখতে হবে। পাশাপাশি আমাদের যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তাদের ভাষাগুলো সংরক্ষণ করতে হবে, যেন তাদের বাচ্চারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তার জন্য আমরা বিনামূল্যে বই দিই। তাদের বইগুলোও বিনা পয়সায় ছাপিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। যেন তারাও তাদের ভাষা শিখতে পারে এবং নিজের ভাষায় কথা বলতে পারে।’

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পটভূমি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষার অধিকার রক্ষা করা, ভাষাকে সম্মান দেওয়া এবং পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংরক্ষণ করার জন্যই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয় বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এখানে ভাষা জাদুঘর করা হয়েছে। সারাবিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ও চলমান ভাষাগুলোর নমুনা এখানে রাখা হয়েছে। গবেষণা, ভাষার ইতিহাস সংগ্রহ এবং এ ব্যাপারে যারা শিক্ষা নেবেন, গবেষণা করবেন তারা যেন একটা সুযোগ পায় সেজন্য ভাষা জাদুঘর। আমরা রক্ত দিয়ে ভাষার কথা লিখে গেছি। এজন্য আমি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট তৈরি করি। অন্য ভাষাগুলোও আমরা এখানে সংরক্ষণ করব।’

প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে চার দিনব্যাপী কর্মসূচির সফলতা কামনা করে বলেন, জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশকে নিয়ে সেই স্বপ্ন যেন আমরা পূরণ করতে পারি। বাংলাদেশ হবে বিশ্বের উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। আমরা ধাপে ধাপে এগুচ্ছি। করোনাভাইরাস কিছুটা আমাদের বাধাগ্রস্ত করেছে। তারপরও আমরা এই বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারব। দেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব- এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিট্রিচ কালদুল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রান্তে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের সচিব মো.মাহবুব হোসেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জিনাত ইমতিয়াজ আলী উপস্থিত ছিলেন।

সারাবাংলা/এনআর/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন