বিজ্ঞাপন

রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা, অর্থনীতিবিদদের চোখে ‘স্বাভাবিক’

March 2, 2021 | 11:08 pm

গোলাম সামদানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ টানা ঊর্ধ্বমুখী ছিল প্রায় সাত মাস। সেই প্রবাহে ছেদ পড়েছে। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে এই রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবে কমছে। সবশেষ ফেব্রুয়ারি মাসেও রেমিট্যান্স এসেছে এর আগের জানুয়ারি মাসের তুলনায় কম।

বিজ্ঞাপন

মাস থেকে মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমলেও সবশেষ ফেব্রুয়ারিতে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণও ছিল করোনা পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তাছাড়া রেমিট্যান্সের এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে স্বাভাবিক বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, আগামীতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও কমে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনা সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা দেশে ফেরত আসতে শুরু করেন। দেশে আসার আগে তারা তাদের হাতে থাকা সঞ্চয় নিয়ে আসেন। অনেককে ওই সময় প্রবাসের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে পুঁজি দেশে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। অনেকেই আবার চাকরি হারিয়ে নিজেদের জমা সব সঞ্চয় কিংবা বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে নিয়ে এসেছেন ওই সময়। এসব কারণে গত বছরের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। পরবর্তী সময়ে প্রবাসীদের দেশে ফেরত আসার প্রবণতা যেমন কমেছে, আবার নতুন করে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যাও কমেছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে আসার পর আর নতুন করে বিদেশে যেতে পারছেন না। এসব কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে এবং আগামীতে তা আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, রেমিট্যান্স বাড়ার পেছনের কারণ হলো— অনেক প্রবাসী করোনার কারণে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এসব প্রবাসীরা দেশে আসার আগে তাদের সঞ্চিত সব টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে মে থেকে পরবর্তী কয়েক মাস রেমিট্যান্স বেড়েছে। এই সিচুয়েশন টেকসই হবে না। বরং রেমিট্যান্সের পরিমাণ বিবেচনায় নিলে বলা যায়, সামনে দুর্দিন অপেক্ষা করছে।

সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, আগামীতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ার সম্ভবনা খুবই কম। কারণ অনেক প্রবাসী দেশে চলে এসেছেন। নতুন করে বিদেশগামীর সংখ্যাও কমে গেছে। এসব কারণে রেমিট্যান্স ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত কিছুদিন ধরে বাড়লেও এই ধারা বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সারাবাংলাকে বলেন, গত মে থেকে পরবর্তী কয়েক মাস রেমিট্যান্স বাড়ার প্রধান কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশ থেকে লাখ লাখ প্রবাসীর দেশে চলে আসা কিংবা তাদের সঞ্চয়গুলো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া। এতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।

আহসান এইচ মনসুরও মনে করেন, এই প্রবণতা স্থায়ী নয়। তিনি বলেন, প্রবাসীদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরে আসার পর আর ফেরত যেতে পারেননি। নতুন করেও অনেকে বিদেশে যেতে পারছেন না। ফলে নতুন করে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম।

বিজ্ঞাপন

রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা, অর্থনীতিবিদদের চোখে ‘স্বাভাবিক’

রেমিট্যান্স বেড়েছে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

বিজ্ঞাপন

গত বছর করোনাভাইরা সংক্রমণকালীন মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বলতে গেলে ধারাবাহিকভাবেই রেমিট্যান্স বেড়েছে। এর মধ্যে কেবল একমাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল আগের মাসের তুলনায় কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের এপ্রিল মাসে দেশে রেমিট্যান্স আসে ১০৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। এরপর মে মাসে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড হয়। ওই মাসে দেশে ১৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সেই রেকর্ড ভেঙে যায় জুনেই। সে মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮৩ কোটি ১০ লাখ ডলার।

এরপর জুলাই মাসে দেশে রেমিট্যান্স আসে ২৬০ কোটি ডলার। ওই মাসেই প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্স ছাড়ায় দুইশ কোটির ঘর। শুধু তাই নয়, এখন পর্যন্ত কোনো এক মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণে সেটিই রেকর্ড। পরে আগস্টে রেমিট্যান্স আসে ১৯৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এটি জুলাইয়ের রেকর্ডের তুলনায় কম হলেও তা আগের রেকর্ড জুনের চেয়ে বেশি। সেপ্টেম্বরে আবারও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। সে মাসে ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে উন্নীত হয় রেমিট্যান্সের পরিমাণ।

রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা, অর্থনীতিবিদদের চোখে ‘স্বাভাবিক’

অক্টোবর থেকে কমছে রেমিট্যান্স

সেপ্টেম্বরের পর থেকে কমতে শুরু করেছে রেমিট্যান্সের পরিমাণ। অক্টোবরে রেমিট্যান্স আসে ২১১ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার কম। এরপর নভেম্বরে আরও প্রায় তিন কোটি ডলার কমে রেমিট্যান্স আসে ২০৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ডিসেম্বরে আরেকটু কমে রেমিট্যান্স। ওই মাসে ২০৫ কোটি ৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশে।

নতুন বছরেও রেমিট্যান্স কমতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৮ কোটি ৮০ ডলার কমে জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স আসে ১৯৬ কোটি ২৬ লাখ ডলার। সবশেষ ফেব্রুয়ারিতে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১৭৮ কোটি ৫ লাখ  মার্কিন ডলারে, জানুয়ারির চেয়ে যা প্রায় ১৮ কোটি ডলার কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটিরও বেশি প্রবাসী রয়েছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জিডিপিতে অবদান রেখেছে ১২ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোয় শীর্ষ ১০টি দেশ হলো— সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, কাতার, সিঙ্গাপুর ও ইতালি।

সারাবাংলা/জিএস/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন