বিজ্ঞাপন

নোংরামিতে ভরা বইমেলার হে স্বাধীনতা বোর্ড

March 30, 2021 | 6:24 pm

সুশোভন সরকার অর্ক, নিউজরুম এডিটর

ঢাকা: বৈশ্বিক মহামারি (কোভিড-১৯) করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এবার প্রায় দেড় মাস পর শুরু হয়েছে বইমেলা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর থিম নিয়ে এই মেলা সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে বেশ জমেও উঠতে শুরু করেছে। এই বইমেলাতেই এবারে বিশেষ একটি আয়োজন হিসেবে বাংলা একাডেমি বইমেলা চত্বরে স্থাপন করেছে বিশেষ একটি বোর্ড। ‘হে স্বাধীনতা’ শিরোনামের বোর্ডটিতে লেখা রয়েছে ‘লিখুন আপনার কথা’। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দর্শনার্থীরা কী ভাবছেন, সেই মতামত তুলে আনতেই সাদা রঙের গোলাকার বোর্ডটি বসানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইতিবাচক মনোভাব থেকে এই বোর্ডটি বসানো হলেও এর সামনে গিয়েই ভুল ভাঙলো। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে বোর্ডজুড়ে দেশ, স্বাধীনতা, তারুণ্য, অধিকার নিয়ে নানা ধরনের কথা থাকলেও এর পাশেই স্থান পেয়েছে নোংরা অনেক কথাও। রয়েছে অপ্রাসঙ্গিক ও অশ্লীল বিভিন্ন বাক্য।

নোংরামিতে ভরা বইমেলার হে স্বাধীনতা বোর্ড

বিজ্ঞাপন

দেখা যায়, বোর্ডের একপাশে বড় হাতের অক্ষরে লেখা ‘মদ খা, মানুষ হ’; ‘আরেকপাশে লেখা ছিল ‘দিমু তোরে এমন গুতা, ছিঁড়ে যাইবো প্রেমের খেতা’। বোর্ডের ওপরে হে স্বাধীনতা লেখাটির নিচেই কেউ একজন নিজের প্রেম নিবেদনের কথা লিখে রেখেছেন। একজন লিখেছেন— ‘বইমেলায় আসলে DUতে চান্স পাওয় যাবে?’ একইসঙ্গে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহুল ব্যবহৃত ‘ট্রল’— ‘নোয়াখালী বিভাগ চাই’।

গোলাকার বোর্ডটি জুড়েই রয়েছে এমন আরও অপ্রাসঙ্গিক ও অশ্লীল কথা, যেগুলো এই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করার উপযোগীই নয়। এছাড়া বোর্ডটিতে অনেকেই অনেক কথা লিখেছেন, যেগুলোতে ভুল বানানের ছড়াছড়ি, নেই বাক্য কাঠামোর সঠিক প্রয়োগের নমুনা।

বিজ্ঞাপন

নোংরামিতে ভরা বইমেলার হে স্বাধীনতা বোর্ড

টিতেএমন সব অশ্লীলতার পাশাপাশি দেশ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে অনেক সুন্দর অভিমতও উঠে এসেছে এই বোর্ডে। একজন লিখেছেন— ‘কখনও হাল ছেড়ো না’; আরেকজনের মন্তব্য— ‘ধর্মান্ধতা নিপাত যাক’। একজন লিখেছেন— ‘সবুজ সোনালি ফিরোজা রুপালি/রূপের নেই তো শেষ/বাংলাদেশ’; আরেকজন লিখেছেন— ‘সুন্দর এক আগামীর অপেক্ষায় আমরা’।

বিজ্ঞাপন

এর বাইরেও দেশকে নিয়ে নানা ধরনের আশাবাদ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা, গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার কথাও লিখেছেন কেউ কেউ। তারপরও দর্শনার্থীদের অনেকেই যারা বোর্ডটির সামনে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে বিপরীতমুখী সেসব অপ্রাসঙ্গিক ও অশ্লীলতায় ভরপুর মন্তব্যগুলোই। এসব বক্তব্য কিভাবে এই বোর্ডে স্থান পাচ্ছে এবং কেন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেটিই প্রশ্ন তাদের।

নোংরামিতে ভরা বইমেলার হে স্বাধীনতা বোর্ড

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে বইমেলায় এসেছিলেন নুর মোহাম্মদ। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি বলেন, ‘এই বোর্ডটি বাংলা একাডেমির চমৎকার একটি উদ্যোগ। কিন্তু আমরা কে দেশকে নিয়ে কী ভাবছি, তারই প্রতিফলন যদি এই বোর্ড হয়, তাহলে বলতেই হবে— খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। কারা এসে এমন কথাবার্তা লিখে যাচ্ছে? সবচেয়ে আশ্চর্য হচ্ছি, কেউ কি এগুলো দেখার নেই?’

‘হে স্বাধীনতা’ বোর্ডটি কে বা কারা মনিটর করছেন, জানতে চাওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণের বইমেলা তথ্যকেন্দ্রে। সেখানকার কেউ এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারলেন না। নাম প্রকাশ না করে দায়িত্বরত একজন বাংলা একাডেমির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের তথ্যকেন্দ্রে গিয়েও এ সম্পর্কে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

নোংরামিতে ভরা বইমেলার হে স্বাধীনতা বোর্ড

পরে এ বিষয়ে কথা হয় অমর একুশে বইমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমদের সঙ্গে। ‘হে স্বাধীনতা’ বোর্ডে দর্শনার্থীদের এমন অশ্লীল বাক্য লেখার বিষয়ে তিনি সারাবাংলার কাছে আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আসলে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, শিক্ষিত তরুণ সমাজ পেয়েছি কিন্তু তাদেরকে মানুষ করতে পারিনি।’

বিষয়টি এখনো বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি বলে স্বীকার করে নিলেন ড. জালাল। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও স্বাধীনতা সম্পর্কে তরুণদের ভাবনা জানতেই আমাদের এই আয়োজন ছিল। সেখানে ভালো কথার পাশাপাশি কিছু অশ্লীল বাক্যও লেখা আছে। আমরা এ বিষয়ে নজর রাখব। আমাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ, ছবিসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট রয়েছে। আমরা সেগুলো বিশ্লেষণ করে প্রশাসনিকভাবে বা অন্যান্য কার্যকর পন্থায় ব্যবস্থা নেব।‘ একইসঙ্গে বিষয়টি নজরে আনার জন্য সারাবাংলার এই প্রতিবেদককেও ধন্যবাদ জানালেন তিনি।

নোংরামিতে ভরা বইমেলার হে স্বাধীনতা বোর্ড

ড. জালাল আরও বলেন, আসলে সমাজের তরুণদের চিন্তা-চেতনা কেমন, তারা কী ভাবছে বা কী ভাববে— এসব তো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। তবে আমরা চাইলে এই বাক্যগুলো সরিয়ে ফেলতে পারি বা বোর্ড বদলে দিতে পারি। এতে হয়তো মানসিকতার পরিবর্তন আসবে না, তারপরও আমরা চাই— ইতিবাচক ভাবনাগুলোই সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এ বিষয়ে সমাজের সব মানুষকে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আমরাও আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করব।

বইমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমদ বলেন, প্রতি বছর বইমেলা শেষে আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করি। পরে সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়ে থাকি। এবার অবশ্যই এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলাদা নজর থাকবে এবং এ বিষয়ে কী করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা করা হবে।

সারাবাংলা/এসএসএ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন