বিজ্ঞাপন

ফিল্ড হাসপাতাল ও হাসপাতাল উধাও সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা

April 13, 2021 | 11:29 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হঠাৎ আলোচনা— ‘হাসপাতাল উধাও’। অনেকেরই স্ট্যাটাস এ নিয়ে। ভাবলাম এটা কিভাবে সম্ভব? দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরুর পর থেকে প্রায় সব বিষয় নিয়েই ফলোআপে ছিলাম।  জেকেজি হেলথকেয়ার, রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ইআরপিপি প্রকল্পের দুর্নীতি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর নিয়েও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছি। কিন্তু আস্ত একটা হাসপাতাল উধাও হয়ে গেছে— এমন তো শুনিনি!

বিজ্ঞাপন

কয়েকজনের সঙ্গে ‘ইনবক্সে’ কথা বলে যতটুকু জানলাম, আলোচনা মূলত গত বছর করোনা সংক্রমণের সময় জরুরিভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা দিতে স্থাপন করা বসুন্ধরা হাসপাতাল নিয়ে। বলা হচ্ছে, ৩১ কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা সেই দুই হাজার বেডের হাসপাতাল গায়েব হয়ে গেছে। একইসঙ্গে মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) যে মার্কেট ছিল, সেখানে স্থাপিত আইসোলেশন সেন্টার নিয়েও কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সেখানে ১৩৯০ বেডের হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে নাকি এখন ধুলার স্তূপ পড়ে আছে। আর সেই ১৩৯০ বেডের হাসপাতাল রেখে সরকার পঞ্চম তলায় নতুন হাসপাতাল তৈরির কাজ করছে। যতটুকু বুঝলাম— এই হলো হাসপাতাল উধাওয়ের বৃত্তান্ত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যগুলো দেখতে লাগলাম। ওই সময় নিজের কাছে যেসব তথ্য ছিল, সেগুলোর সঙ্গে কোথাও গণ্ডগোল হচ্ছে কি না— বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পুরনো তথ্যগুলো একটু ঘেঁটে দেখার চেষ্টা করলাম।

বিজ্ঞাপন

২০২০ সালে বাংলাদেশের কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে ‘ফিল্ড হাসপাতাল’ নির্মাণ করে সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। এর নাম দেওয়া হয় বসুন্ধরা কোভিড আইসোলেশন সেন্টার। ১২ এপ্রিল থেকে এই ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের কাজ শুরু হয়। এখানে মোট আইসোলেশন বেড ছিল ২ হাজার ১৩টি। ছয়টি ক্লাস্টারে ১ হাজার ৪৮৮টি বেড বসানো হয়। এছাড়া তিনটি কনভেনশন হলে আরও ৫২৫টি বেড বসানোর ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও ছিল সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা। একই বছরের ১৭ মে এই ফিল্ড হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয়। ২৯ মে এই ফিল্ড হাসপাতালের চিফ অপারেটিং অফিসার এম এম জসিম উদ্দিন জানিয়েছিলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪৫০ সদস্যকে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে যারা বাসায় আইসোলেশনে থাকতে পারবেন না, আবার আইসিইউতে নেওয়ার মতো গুরুতর অসুস্থ নন— এমন রোগীদের এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ওই সময় এই অস্থায়ী কোভিড-১৯ আইশোলেশন সেন্টার পরিচালনার জন্য ৪১ কোটি ৫৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আইসোলেশন সেন্টারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অক্সিজেনের সরবরাহ, পানি, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ ২৫টি খাতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে বলে জানানো হয়। একইসঙ্গে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কোডে এই অর্থ সমন্বয় করতে বলা হয়। বরাদ্দ দেওয়া অর্থ পুরোপুরি ব্যয় না হয়ে থাকলে অব্যয়িত অর্থ যথাসময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনা অনুযায়ী এই হাসপাতালে দুই হাজার ১৭টি শয্যা স্থাপন করা হয়। ৭১টি আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে ৫০টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। এখানকার চিকিৎসাসেবা পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় ১২০ জন চিকিৎসক, ১৯৬ জন নার্সসহ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরও ৩২ জন। এখানে ল্যাব সংক্রান্ত কাজের জন্য ১৭ জন ও অন্যান্য ৩০০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয় অস্থায়ীভাবে।

এই কোভিড আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করতে প্রাথমিকভাবে মোট খরচ করা হয় ৪১ কোটি টাকা।  এখানে পানি, গ্যাস, ওষুধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মোট খরচ হয় চার কোটি টাকা। এমএসআর (মেডিসিন সার্জিক্যাল ও রি-এজেন্ট) বাবদ খরচ হয় ৪০ কোটি। এছাড়াও এই হাসপাতালে বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৩৫ লাখ টাকা ও পানি বিল বাবদ খরচ হয় ১৫ লাখ টাকা। ভাড়া বাবদও কিছু খরচ হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে একটা সময় দেখা যায়, এই ফিল্ড হাসপাতালে কার্যত রোগীর সংখ্যা শূন্য। ২২ সেপ্টেম্বরের হিসাব বলছে, হাসপাতালের ২০১৩ বেডে রোগী ছিলেন মাত্র সাত জন। আর তাদের দায়িত্বে ছিলেন প্রায় ১২০ জন চিকিৎসক। তখন পুরা ঢাকা শহরেও সাড়ে তিন হাজারের বেশি কোভিড শয্যা ফাঁকা ছিল। ওই সময়ে রোগী না থাকলেও বসুন্ধরার ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসকদের বেতন-ভাতা, যন্ত্রপাতির খরচ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল মিলিয়ে মাসে দিতে হচ্ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে কোভিড চিকিৎসায় যুক্ত হাসপাতালগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে শুরু করে সরকার। ৮ সেপ্টেম্বর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, লালকুঠি হাসপাতাল ও বসুন্ধরা কোভিড-১৯ হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ করতে বলা হয়। এক সপ্তাহ পর ২৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বসুন্ধরার আইসোলেশন সেন্টার তথা ফিল্ড হাসপাতালটি বন্ধ করতে বলা হয়। ওই কাছাকাছি সময়েই বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠনের সহায়তায়  ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়ার উদ্যোগে নির্মিত চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বসুন্ধরার হাসপাতালটি বন্ধের পর সেখানে ব্যবহৃত ৫০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা বিতরণ করা হয় দেশের বিভিন্ন জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানকার লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট খুলনা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। ১০০০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনটি স্থানান্তর করা হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বড় জেনারেটরটি স্থানান্তর করা হয় মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরে।

ওই সময় চট্টগ্রামের ফিল্ড হাসপাতালের পরিচালক ডা. বিদ্যুৎ বড়ূয়া জানান, সরকার প্রয়োজন মনে করলে হাসপাতালটি আবার চালু করা যেতে পারে। যেহেতু অস্থায়ী হাসপাতাল, তাই সেখানে ব্যবহার করা সবকিছুর হিসেব চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে আছে। সেগুলো দিয়ে প্রয়োজন মনে হলে অবশ্যই চালু করা যেতে পারে।

এই যখন পরিস্থিতি, তাহলে হাসপাতাল গায়েব বা উধাও হয় কিভাবে? ফিল্ড হাসপাতাল ধারণাটিই জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করা স্থাপনার, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সেটি আবার ভেঙে ফেলাটাই স্বাভাবিক চর্চা। এরকম হাসপাতাল কোনো স্থায়ী স্থাপনা নয়। সেই ধারণা করে থাকলে ভুল বরং সেটিই। আইসোলেশন সেন্টার, অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল ও হাসপাতালের মধ্যে পার্থক্যটা আসলে অনেক বড়ই— এসব স্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গেলে সেই ধারণাটি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রায় পরিত্যক্ত শপিং কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয়টিও প্রায় একই রকম। ওই মার্কেটকে যখন হাসপাতাল হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছিল, গণমাধ্যমকর্মী হিসেবেই সেখানকার কার্যক্রম দেখতে যাওয়া হয়েছিল বেশ কয়েকবার। ‍ঘুরেছিলাম প্রতিটি ফ্লোরে। এত বড় একটি প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি কোথাও না কোথায় থাকবেই— বলা যায়, এমন কিছুর সন্ধানের ‘আশা’তেই সেখানে যাওয়া। হাসপাতালের ম্যাপটাও জোগাড় করি সেসময়।

সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি করা এই স্থাপনাকে হাসপাতালে রূপ দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ নতুন করে পরিকল্পনা সাজানো হয়। কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ সেখানে ছিল না, সেগুলোর কাজ শুরু করা হয়। সেখানে গিয়ে দেখেছিলাম, মার্কেটের দোকানগুলোকে কেবিন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল।

ওই সশয় চিকিৎসকদের আইসোলেশন নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছিল। পরে বলা হয়, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিল্ডিংয়ের ওপরের তলায় আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হবে। ওইখানে চিকিৎসার জন্য ২০০ বেড স্থাপনের পাশাপাশি আইসিইউ বেড বসানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। ওই আইসিইউ বেডগুলো যাচাই করতে গিয়েই অবশ্য কিছু অনিয়ম-দুর্নীতির হদিস পাই। জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জরুরিভিত্তিতে অনুমোদিত ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় দরযাচাই ছাড়াই বাজারমূল্যের পাঁচ গুণ বেশি দামে ২২০টি হাসপাতাল বেড কেনা হয়েছিল এই হাসপাতালের জন্য। এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় সারাবাংলায়। ইআরপিপি প্রকল্পের আরও কিছু দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়েও প্রকাশ হয় বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

ওই সময় ডিএনসিসির এই মার্কেটের অন্য ফ্লোরগুলোতেও বেড স্থাপনের কাজ চলছিল। একসময় থমকে যায় এই আইসোলেশন সেন্টারের কাজও। ওই সময় আবার বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা নমুনা পরীক্ষার চাপ বাড়তে থাকে। তাদের নমুনা পরীক্ষার জন্য এই জায়গাটির ব্যবহার শুরু হয়। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এই এলাকাটিতে বড় কোনো সরকারি জেনারেল হাসপাতাল না থাকায় স্থাপনাটিকে স্থায়ী হাসপাতালে রূপ দেওয়া যায় কি না, সে পরিকল্পনার কথাও বলেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। কিন্তু এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়নি।

এদিকে, গত মার্চ থেকে ফের দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করলে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিতে শুরু করে। বিশেষ করে আইসিইউ পরিণত হয় সোনার হরিণে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ফের ডিএনসিসি’র এই আইসোলেশন সেন্টারকে হাসপাতালে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেয়। একই ভবনে, একই সেটআপেই এই হাসপাতাল চালু করতে এখন কাজ চলছে। কেবল আগের সেটআপের সঙ্গে যুক্ত হবে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন ও প্রতি ফ্লোরে আইসিইউ ব্যবস্থা। এর আগে ওই ভবনের যে ম্যাপ ছিল, সেই ম্যাপ অনুযায়ীই চলছে কাজ, কিছুটা পরিবর্তন কেবল এসেছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন এবং আইসিইউ ও এইচডিইউ স্থাপনের পরিকল্পনার কারণে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এরই মধ্যে পরিদর্শনও করে গেছেন কার্যক্রম।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, দুইশ থেকে আড়াইশ বেড নিয়ে হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু হবে ‘শিগগিরই’। এ মাসের শেষ নাগাদ হাসপাতালটিকে ৫০০ বেডে উন্নীত করার আশাবাদ কর্তৃপক্ষের। ধাপে ধাপে এই সংখ্যা ১২শ’তে উন্নীত করতে চান তারা। সে লক্ষ্যেই চলছে তিন শিফটে কাজ, যার তত্ত্বাবধানে রয়েছে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন। এবং সেখানে প্রতিটি ফ্লোরেই চলছে কার্যক্রম, চালু হবে সবগুলো ফ্লোরই।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যখন আগের বছরের মাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, যখন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে একটি বেড কিংবা আইসিইউয়ের জন্য মানুষকে হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে, হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে যখন অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যু ঘটছে— এমন একটি সময়ে একমাসের মধ্যে ৫০০ নতুন শয্যার একটি হাসপাতাল নিঃসন্দেহে একটি বড় আশার খবর। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঘোষণা অনুযায়ী এপ্রিলের মধ্যেই এই হাসপাতালে ৫০০ শয্যা রোগী ভর্তির উপযোগী হলে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে এর চেয়ে বড় সুসংবাদ হয়তো আমরা আর শুনিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনার সূত্র ধরেই ইনবক্সে যার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তার সঙ্গে এসব তথ্য শেয়ার করলাম। বললাম, ‘চিলে কান নিয়েছে’ শুনে দৌড়ানোর আগে হাত দিয়ে কান আছে কি না, সেটি দেখা দরকার। শুনে তিনি নিজেই বিস্মিত। বর্তমানে এই হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে যিনি দায়িত্বে আছেন, তার সঙ্গে কথোপকথনের সূত্র ধরে তাকে আরও বললাম, পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজেই হাসপাতালটিতে চলমান কার্যক্রম দেখার সুযোগ করে দেবেন। এমন অবস্থায় এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা নিয়ে ভুল তথ্য প্রচার করা হলে সেটি কার কাজে লাগবে— সে প্রশ্ন করলেন ইনবক্সের ওই ব্যক্তিটিই।

তবে হ্যাঁ, এই হাসপাতাল নিয়ে যে প্রশ্নই নেই, তা কিন্তু নয়। গত বছর কাজ শুরু করেও কেন এই আইসোলেশন সেন্টার চালু করা গেল না— সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সরকার বারবারেই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইন করানোর উদ্যোগ নিয়ে জটিলতায় পড়েছে। এই স্থাপনাটিকে অন্তত প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনের কাজে ব্যবহার করার উপযোগী করা গেলেও সেটি বড় একটি কাজ হতো, তা নিয়ে সন্দেহ নেই কারওই। ফলে এই সেন্টারটিতে গত বছর কোনো কাজে না লাগাতে পারাটা কিন্তু বড় একটি ব্যর্থতা। এক্ষেত্রে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবের কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে দায়ী করা যেতে পারে। তবে মার্চ থেকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির সময়ে ফের একে দ্রুততম সময়ে চালুর উদ্যোগকেও স্বাগত জানানো উচিত সবার।

তবে বসুন্ধরার সেই আইসোলেশন সেন্টার, যেটি মূলত ফিল্ড হাসপাতালের আদলে গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটির গায়েব বা উধাও হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গটি আসলেই অবান্তর। কেননা ফিল্ড হাসপাতাল কোনোভাবেই স্থায়ী কোনো স্থাপনা নয়। ফিল্ড হাসপাতালটি আরও কিছুদিন রাখা যেত কি না, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য সেটি রেখে দেওয়া যেত কি না— এ প্রশ্নগুলো আসতেই পারে, তা নিয়ে আলোচনাও হতে পারে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ফিল্ড হাসপাতাল ভেঙে দিলে তাকে উধাও বা গায়েব অভিহিত করাটা বোধহয় বাড়াবাড়িই।

এই যে এতকিছু লিখছি, এর মাধ্যমে কি সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ নেওয়ার চেষ্টা করছি? সে অভিযোগ কেউ তুললে তাকে আটকানোর সুযোগ নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি বলতে পারি, গণমাধ্যমের কাজ সংবাদ পরিবেশন, তা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে। কোথাও কোনো কাজে দুর্নীতি-অনিয়ম হলে গণমাধ্যমকে সেটি প্রকাশ করতে হবে, এটি গণমাধ্যমের দায়িত্ব। তেমনি যা হয়নি বা যা ঘটেনি, ‘টুইস্ট’ করে তেমন তথ্য প্রকাশ করাটা গণমাধ্যমের কাজ নয়। এরকম তথ্য কোথাও প্রকাশ পেলে তা জনস্বার্থবিরোধী হলে সে বিষয়ে সঠিক তথ্যটি প্রকাশ করাটাও গণমাধ্যমের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন দেশের মানুষ আতঙ্কিত, অনেকেই মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল, এরকম একটি সময়ে প্রয়োজন সবার পাশে সবার দাঁড়ানোর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্যের প্রচার মানুষকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুললে তা কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। সন্দেহ নেই, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। গত বছরের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এ বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর গুছিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করতে পারছে— সেটি দাবি করার পরিস্থিতি নেই। এর মধ্যে ‘হাসপাতাল গায়েব বা উধাও’য়ের মতো প্রচারণা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করবে। এমন প্রচারণা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের মধ্যে আরও বেশি অনাস্থা, অবিশ্বাস তৈরি করবে যেটি কারও কোনো কাজে আসবে না।

মহামারির এই সংকটকালে আমরা যদি একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে একজন অন্যের শক্তি হতে পারি, তবেই কেবল মহামারি মোকাবিলা সম্ভব হবে। বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে সেটি কখনো সম্ভব হবে না, বরং বিভক্তির পথে ঠেলে দেবে সবাইকে। তাই আসুন, সবাই একসঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করি, মাস্ক পরি, মহামারি মোকাবিলায় একে অন্যের শক্তি হই। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন মহলের দুর্বলতা-ব্যর্থতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমালোচনা হাজির করি; সরকার ভালো উদ্যোগ নিলে সেটিকেও সাধুবাদ জানাই, সেই উদ্যোগের সুফল যেন সবাই পায়, তার জন্য সেই উদ্যোগের কথাও মানুষকেও জানাই।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন