বিজ্ঞাপন

মন্তেনিকো

April 23, 2021 | 10:00 am

জাকির হোসেন

গভীর জঙ্গলের মধ্যে মেঘের ওপরে এক দেশ। মেঘের ওপর বললাম কারণ ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় সে দেশের বাচ্চারা যখন বুনো ফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ে বেড়ায়, তখন তাদের পায়ের অনেক নিচ দিয়ে ভেসে বেড়ায় সাদা সাদা মেঘ। আর গভীর জঙ্গলের কারণে বাইরে থেকে সে দেশে মানুষ বেড়াতে যায় খুব কম। দেশটার নাম মন্তেনিকো। উইকিপিডিয়ায় পড়লাম, এর ইতিহাসে আছে যে একবার একদল সন্নাসী জঙ্গলে পথ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এই দেশে হাজির হন। ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত সন্নাসীরা এখানে পৌঁছে সুস্বাদু কিছু ফলের সন্ধান পান। একইসঙ্গে একটি ছোট কিন্তু গভীর হ্রদ খুঁজে পান তারা। ফল ও খাবার পানি পেয়ে তাদের জীবন বেঁচে যায়।

বিজ্ঞাপন

এখানেই শেষ নয়। গভীর রাতে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তারা দেখেন, পশ্চিম আকাশে থালার মত নীলচে রঙের চাঁদ উঠেছে। হতভম্ব সন্নাসীরা দেশটির নাম দেন ‘মন্তেনিকো’। তাদের ভাষায় ‘মন্তেনিকো’ শব্দের অর্থ নীল চাঁদ। সেই থেকে দেশটার নাম ‘মন্তেনিকো’।

ট্রিপ অ্যাডভাইসরে পাহাড়ওয়ালা জায়গা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ করে আমি এই দেশের নাম জানতে পারি। এই দেশের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে যে কেউ ঢুঁ মারতে পারেন। অ্যাড্রেসটা হচ্ছে www.monteniko.com। বর্তমানে মন্তেনিকোতে পাঁচ বছর পর পর ভোট হয়। দেশ পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ। তবে রাজা-রানিও আছেন। দেশের মানুষ তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। মাত্র ২০ হাজার লোকের এই দেশে একটাই শহর, তার নামও ‘মন্তেনিকো’। দেশের নামে নাম। যেমন সিঙ্গাপুরের রাজধানী সিঙ্গাপুর সিটি, সেরকম আর কী। মন্তেনিকোর জাতীয় প্রতীক বাঁশি। এই বাঁশি কী করে তাদের জাতীয় প্রতীক হলো, এ নিয়ে একটা গল্প আছে। গল্পটা বলছি, আপনাদের ভালো লাগতে পারে ।

বিজ্ঞাপন

অনেক অনেক বছর আগে মন্তেনিকোয় এক রাজা ছিলেন। রাজা থাকলে রাণী থাকতে হয়। তবে সেই রাজার কোন রাণী ছিলনা। রাজা বড় ভাল মানুষ ছিলেন। যুদ্ধ টুদ্ধ বিশেষ জানতেন না। অবশ্য জঙ্গলের মধ্যে রাজ্য হবার কারণে অন্য দেশ তাদের সাথে লড়াই করতেও উৎসাহ পেতনা। রাজার ছিল গান বাজনার নেশা। সারাক্ষণ গান বাজনা নিয়েই থাকতেন। বছরে একবার তার দেশে গানের আসর বসত। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন এসে সেই গানের আসরে গান শুনিয়ে রাজাকে মুগ্ধ করত। তো রাজা একবার জঙ্গলে গেলেন শিকার করতে। শিকার ব্যাপারটা এমনিতে তিনি যে খুব পছন্দ করতেন তা না, তবে তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গ শিকারের ব্যাপারে খুব উৎসাহ দেখাত। তাদের উৎসাহেই তিনি বের হলেন। এবং অদ্ভুতভাবে জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেললেন। এই জঙ্গলের প্রতিটা গাছ তিনি জন্ম থেকে দেখে আসছেন, পথ হারাবার কোনই কারণই তার নেই। কিন্তু রাজা অবাক হয়ে দেখলেন জঙ্গলটা তার কাছে অপরিচিত ঠেকছে। আসলে রাজার দ্রুত হাঁটার অভ্যাস ছিল। দ্রুত হাঁটার কারণে তিনি কোন এক ফাঁকে দলের লোকজন থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। আবার রাজা যে আলাদা হয়ে গেছেন সেটা তার দলের লোকজনও বুঝে উঠতে পারেনি। রাজা বুঝলেন যে মাথা গরম করা চলবেনা। চীৎকার করলেও কেউ শুনবেনা কারণ জঙ্গল এতই ঘন যে আওয়াজ বেশিদূর যাবেও না। সুতরাং কি আর করা, তিনি হাঁটতে লাগলেন। তিনি জানেন যে হ্রদটার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলে তিনি ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে হ্রদটা যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে। কিছুতেই তিনি সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না।

অনেকক্ষণ হাঁটার পর একটা মৃদু সুরেলা শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। শব্দটা তার কাছে অচেনা। কিসের শব্দ এটা? অনেকটা পাখির গানের মত কিন্তু অত্যন্ত চমৎকার। চেনা একটা ঘুমপাড়ানি গানের সুর বেজে চলেছে সেই অচেনা আওয়াজে। শব্দটা লক্ষ্য করে রাজা এগিয়ে চললেন। এবং পৌঁছে গেলেন হ্রদের তীরে। পৌঁছে যা দেখলেন তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। অনেকগুলো পাহাড়ী হরিণ হ্রদের তীরে গোল হয়ে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। মাঝখানে এলো চুলে বসে আছে একটি মেয়ে। মেয়েটির হাতে ছোট্ট একটা কাঠের টুকরোর মত কিছু। মেয়েটা সেটা দিয়ে একটা প্রাচীন ঘুম পাড়ানি গানের সুর তুলছে। আর হরিণগুলো চুপ করে বসে সেই সুর শুনছে। রাজা তার জীবনে এইরকম অবিশ্বাস্য আর অসাধারণ দৃশ্য কখনো দেখেননি। বাঁশি জিনিসটা তিনি চিনতেন না। নিজে তিনি খুব ভালো ঢোল বাজাতে পারতেন। তার কাছে যারা গান শোনাতে আসত তারাও ঢোল কিংবা হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই বাজিয়ে গান করত। কিন্তু এই যন্ত্রের আওয়াজের কাছে যেন ঢোল কিছুইনা। যন্ত্রটার সুর রাজাকে মুগ্ধ করে ফেলল। তার থেকেও তিনি মুগ্ধ হলেন সেই মেয়েটাকে দেখে, বনের হরিণও যার কাছে এসে চুপ করে থাকে। তিনি সম্মানের সাথে মেয়েটার সঙ্গে পরিচিত হলেন। তার নাম জিজ্ঞেস করলেন। এবং জানলেন এই বাদ্যযন্ত্রটির উদ্ভাবক মেয়েটি নিজেই। রাজার বিস্ময় আরো বাড়ল। সাঙ্গপাঙ্গরা এদিকে রাজাকে না পেয়ে বন উজাড় করে ফেলেছে। যতক্ষণে তারা রাজাকে হ্রদের তীরে আবিষ্কার করল, ততক্ষনে রাজা মেয়েটার সাথে অনেক কথা বলে ফেলেছেন। এবং বুঝতে পেরেছেন তার একা থাকার দিন সম্ভবত শেষ হতে চলেছে। বাকী জীবন তিনি যদি এই মেয়েটার সাথে কাটাতে না পারেন তাহলে এ জীবনের কোন মানেই হয় না।

বিজ্ঞাপন

রাজা মেয়েটিকে নিজের রাণী করলেন। বাঁশিকে করলেন নিজের দেশের প্রতীক। গল্পে আছে রাজা গভীর রাতে রাণীকে নিয়ে মাঝেমাঝেই হ্রদের তীরে হাজির হতেন। সাথে থাকত ঢোল। রাজা নিজে রাণীকে ঢোল বাজিয়ে গান শোনাতেন। রাণীর চুল ছিল অনেক লম্বা। রাজা যখন গান গাইতেন তখন তিনি বসে একটা পাথরের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতেন আর রাজার গান শুনতেন। রাত আরো গভীর হলে সেই থালার মত নীল চাঁদটার উদয় হত। রাজা রাণী পাশাপাশি বসে চুপ করে সেই অস্বাভাবিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতেন। হ্রদের জলে টলমল করত তাদের ছায়া।

অত্যন্ত সুখী ছিলেন তারা। কিন্তু সুখেরও উত্থান পতন থাকে। একদিন হঠাৎ করেই তাদের খাবার জলের একমাত্র উৎস সেই হ্রদটা অজ্ঞাত কারণে শুকিয়ে যেতে শুরু করল। শুধু তাই না, ঝকঝকে হ্রদের জলটা হয়ে উঠতে লাগল কালো। স্বাদ হয়ে যেতে থাকল বিস্বাদ। যতই দিন যেতে থাকল ততই খাবার জলের সমস্যা প্রকট হতে লাগল। কেউ বুঝতে পারছিল না কেন এটা হচ্ছে। রাজ জ্যোতিষী তখন একটা অদ্ভুত কথা শোনালেন। জ্যোতিষী বললেন, দু হাজার বছর পরপর এই হ্রদে নাকি একটা বড় সরীসৃপ আস্তানা গাড়ে। সাপটা থাকে জলের ভেতর। এই সাপটা মারা না যাওয়া পর্যন্ত হ্রদের জল বাড়ার আর কোন সম্ভাবনা নেই। তবে সাপ যে কারো হাতে মারা পড়বেনা। একমাত্র রাজ্য প্রধানের হাতেই এ সাপের মৃত্যু হবে। প্রথমে জ্যোতিষীর কথা সবাই হেসেই উড়িয়ে দিল। তারপরেও মনের খচখচানি থেকে দেশের সাহসী বীর বলে যাদের খ্যাতি আছে এমন কয়েকজন হ্রদে নেমে হ্রদ তোলপাড় করে ফেলল। সাপ টাপ কিছুই পাওয়া গেলনা। জ্যোতিষী কেবল মুচকি মুচকি হাসতে থাকলেন। অবশেষে রাজার কাছে মনে হল আচ্ছা একটু চেষ্টা করে দেখাই যাকনা। চেষ্টা করতে তো দোষ নাই। জ্যোতিষীর কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, আর সেখানে যদি সত্যিই সাপ থেকে থাকে তবে তো তার নিজের কারণেই সেটা মারা পড়ছেনা। দেশের মানুষ খাবার জল না পেয়ে ছটফট করছে। এটাতো তিনি হতে দিতে পারেন না। তিনি ঘোষনা করলেন যে হ্রদে নেমে ব্যাপারটা তিনি দেখতে চান। রাজ্যশুদ্ধ সবাই নিষেধ করল। রাজা সবার নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করলেন। রাণী অনেক নিষেধ করলেন। কিন্তু তিনি কারো কথা শুনলেন না।

বিজ্ঞাপন

রাজপোশাক ছেড়ে তিনি সাধারণ একটা পোশাক পরলেন। হাতে নিলেন ছোট একটা ছুরি। তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে। রাণীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন রাজা একবার। জড়িয়ে ধরেই থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর ঝাঁপ দিলেন হ্রদের জলে। জল কমে গেলেও হ্রদ ছিল তখনো যথেষ্ট গভীর। ঝাঁপ দেবার পর রাজাকে আর দেখা গেল না। উৎকণ্ঠিত হৃদয়ে রাণীসহ সবাই হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে রইল। বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল, কিন্তু রাজা উঠে আসছেন না। আরো কিছুক্ষণ পর সবার কাছে মনে হল ডুবে যাওয়া সূর্যটা যেন হ্রদের মধ্যে আবার উদিত হচ্ছে। জলের রঙ যাচ্ছে পাল্টে। কালো থেকে জলের রঙ হয়ে যাচ্ছে টকটকে লাল! সবার মধ্যে হইচই পড়ে গেল। জলের ভেতর কিছু একটা যে হয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কোন তোলপাড় নেই। কোন আলোড়ন নেই। রাজারও কোন খবর নেই। সেই অবস্থায় বেশ কয়েকজন জলে ঝাঁপ দিল রাজাকে উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু অনেকক্ষণ পর তারা উঠে এল ভগ্ন মনোরথে। সারারাত দেশের লোকেরা হ্রদটাকে ঘিরে বসে রইল এই আশায় যে হয়ত রাজা উঠে আসবেন জল থেকে। কিন্তু রাজা আর ফিরে এলেন না। সকাল বেলায় দেখা গেল জলের রঙ আবার আগের মত হয়ে গেছে। হ্রদ আবার পূর্ণ হয়ে গেছে কানায় কানায়। জলের স্বাদও হয়ে গেছে ঠিক আগের মত। আর হ্রদের মাঝখানে ভেসে আছে রাণীর সেই ছোট্ট কাঠের বাঁশিটা। বাঁশিটা সবসময় রাণীর গলায় ঝোলানো থাকত। রাণী দেখলেন বাঁশিটা গলায় নেই। সম্ভবত জড়িয়ে ধরার সময় বাঁশিটা রাজা খুলে নিয়েছিলেন, রাণী তা টের পাননি।

রাণী সারাদিন কারো সাথে কথা বললেন না। নিজের ঘরে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন সারাদিন, সারারাত। গভীর রাতে দূর থেকে কতগুলো পাহাড়ী হরিণ মরাকান্নার মত আওয়াজ করতে লাগল। পরের দিন কেউ রাণীকে রাজ্যের কোথাও আর খুঁজে পেল না। সতেরো হাজার ফুট উপরের সেই মেঘের দেশ থেকে রাণী হারিয়ে গেলেন চিরতরে।

বিজ্ঞাপন

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

ছবিতে যে মূর্তিদুটো দেখা যাচ্ছে সেগুলো আমি দার্জিলিং থেকে কিনেছিলাম। পিতলের তৈরি মূর্তিগুলোর দিকে যতবার তাকাই, কেন জানি আমার মনে এরকম একটা গল্প ভেসে ওঠে। ভাবলাম গল্পটা লিখে ফেলা যায়। উপরে দেয়া মন্তেনিকোর লিংকটায় গেলে যে একপেজের ওয়েবসাইটা দেখবেন, সেটা আমারই বানানো। মন্তেনিকো বলে আসলে কোন দেশ পৃথিবীতে নেই। অন্তত এখন পর্যন্ত নেই।

সারাবাংলা/এসএসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন