বিজ্ঞাপন

গ্রীষ্মের দাবদাহে গাছের যত্ন

April 30, 2021 | 10:00 am

আহসান রনি

গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড দাবদাহে আমাদের প্রাণ যখন প্রায় ওষ্ঠাগত তখন অনেক গাছেই ঝুলছে ফল, দুলছে ফুল। টানা কাঠফাঁটা রোদে ধুলোমাখা রুক্ষ শুষ্ক পাতা। আবার গাছেদের দু’দণ্ড বৃষ্টির হাহাকারে নির্বিকার প্রকৃতি যেন হঠাৎ সাড়া দেয় আরো বৈরী রুপে। আচমকা কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড করে দেয় গাছেদের সব বুড়ো ডালপালা। এ যেন প্রতি বছরই নিয়ম করে প্রকৃতির সাথে গাছেদের এক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। যে খেলার শেষটায় হার মেনে প্রকৃতি ঝড়ায় প্রশান্তির বৃষ্টি আর আর গাছেরা মেতে ওঠে নব উদ্যমে।

বিজ্ঞাপন

এই ঋতুতেই গাছকে সবচেয়ে বেশি প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করতে হয়। সবেমাত্র শীত কাটিয়ে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠা ডালপালাগুলো এই ঋতুতেই ফুল ফল বিলাতে শুরু করে। যার ফলে অন্যান্য ঋতু থেকে গ্রীষ্মের সময়ে গাছের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হতে হয়। বিশেষ করে এ সময়ে গাছে পর্যাপ্ত পানি, সার, বালাইদমনসহ প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন পরিচর্যাগুলো পেলেও কেবলমাত্র সঠিক নিয়ম না মানার কারণে হিতে হতে পারে বিপরীত। বিশেষ করে দাবদাহের এই সময়টাতে ছাদের গাছে পানি দেওয়ার উপযুক্ত সময় সূর্য উঠার আগে অথবা সূর্য ডোবার পরে।

হঠাৎ কোনদিন ভোরে পানি সেচ দিতে না পারলে সকাল আটটার মধ্যেই দিয়ে ফেলা চাই। তবে এ সময় গাছে পানি দিলে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন পাতায় পানি না পড়ে। পাতায় পানি জমে থাকলে রোদে পাতা জ্বলে যেতে পারে। এমনকি মরেও যেতে পারে। কারণ পানির ফোঁটা রোদে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মতো কাজ করে যা কচি পাতাকে পুড়িয়ে পর্যন্ত ফেলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিকেলে পানি দেওয়ার সময় প্রতিদিন গাছকে ধুয়ে দিন। কারণ এসময় পাতায় প্রচুর ধুলাবালি আটকে থাকে যা একদিকে রোগ ছড়ায় অন্যদিকে প্রস্বেদন ও সালোকসংশ্লেষণেও বিঘ্ন ঘটায়। অন্যদিকে এসময় গাছে বেশি পানি দিলে শিকড় পচে যেতে পারে, আর কম দিলে ডাইব্যাক বা ক্ষতরোগসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। অনেকসময় গাছের গোড়ার মাটি শুকনো দেখালেও টবের নিচের মাটি ভিজা ও নরম থেকে যেতে পারে। সে সময়েও পানি দেওয়া যাবে না। এখন কি করে বুঝবেন নিচের মাটি ভেজা কি না?

মাটির ভেতর দেড়/দু ইঞ্চি আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেখে নিন মাটি ভেজা ভেজা কি না। যদি ভেজা না থাকে তবেই পানি দিন। পানি দেওয়ার সময় অবশ্যই টব ভরে পানি দিন। যেন নিচ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এ সময়ে হঠাৎ টানা ভারি বৃষ্টি হলে দ্রুত ও নিয়মিত অতিরিক্ত পানি অপসারণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
আবার গ্রীষ্মের অনেক বেশি তাপমাত্রার কারণে এ সময় হঠাৎ গাছ ঝিমিয়ে পড়তে পারে। তাই তাড়াহুড়ো করে গাছে পানি দিবেন না। বরং গাছটিকে ছায়ায় আনুন। কিছুক্ষণ ছায়ায় রেখে মাটি শীতল করুন। তারপর পানি দিন।

বিজ্ঞাপন

তীব্র রোদে গাছের গোড়ায় পানি দিলে পাতা শুকিয়ে যেতে পারে। সম্ভব হলে গরমের সময়জুড়ে গাছের গোড়ায় মালচিং করলে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে। শুকনো পাতা, নারকেলের ছোবরা, কাঠের টুকরা, কোকোপিট দিয়ে মালচিং করা যেতে পারে। পানি দেওয়ার আগে মালচিং সরিয়ে দেখে নিতে হবে মাটি শুকনো কি না!

আবার কিছু গাছ আছে যে গাছগুলোর কান্ড নরম। সেগুলোতে বারবার একটু একটু করে পানি দিতে পারলে উত্তম। এর ফলে পানির অভাবে গাছের পাতা ঢলে যাবার কোনো আশঙ্কা থাকবে না। সম্ভব হলে এ সময় ছাদের গাছগুলো কাছাকাছি দুরত্বে রাখলে তারা পরস্পরকে বাষ্পমোচনে সহযোগিতা করবে যা নিজেদের পানিশূন্যতা থেকে বাঁচতে সহয়তা করতে পারবে এবং এর দ্বারা ঠাণ্ডা অনুভূতি দিবে।

বিজ্ঞাপন

এ সময় অতিরিক্ত গরমে ও রোদে ছাদের গাছের যত্নে শেড নেটের ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি সূর্যের তাপকে ৫০ শতাংশ থেকে প্রয়োজনে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে গাছে তাপ যেমন কম লাগে, তেমনি অতিবেগুণী রশ্মি থেকে গাছকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে গরমকালেও গাছ সবুজ ও সতেজ থাকে।

আর যদি শেড নেট না থাকে তবে রোদের মধ্যে কিছুদিন ছোট গাছগুলোকে বড় গাছগুলোর নিচে রেখেও সুফল পাওয়া যায়। আবার কিছু ক্ষরা সহিষ্ণু বা ড্রাউট লাভিং গাছ আছে যেগুলো রোদ খুবই পছন্দ করে। যেমন- বাগানবিলাস, বেলি, জুঁই, কামিনী ইত্যাদি। এসব গাছ অবশ্যই রোদেই রাখবেন। কারণ এরা রোদে চমৎকার ফুল দেয়। শেডের নিচে রাখলে ফুলের কালার নষ্ট হয়ে যাবে। সংখ্যায়ও কম হবে, এমনকি সাইজেও ছোট হবে। তাই এই গাছগুলোকে এমন জায়গায় রাখা চাই যেখানে সারাদিন রোদ থাকে। গরমকালে সরাসরি পাকা মেঝে বা ছাদে গাছ না রাখা উত্তম । এক্ষেত্রে লোহার পায়াযুক্ত ফ্রেম করে রাখলে ভালো হয়। না হলে, প্লাস্টিকের ট্রে, ইট, কাঠ, কর্কশিট এসবে টব রাখুন। অন্যথা টবের গরম ও ছাদ বা মেঝের গরমে শিকড় পচে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এসময় বাগানের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে হিউমিডিটি বাড়ানোটাও জরুরি। হিউমিডিটি কম থাকলে আমাদের ঘাম হয় না, আমরা ভালো থাকি। কিন্তু গাছের নানা রকম সমস্যা হয়। পাতা পুড়ে যাওয়া, হলুদ হয়ে যাওয়া, কুঁকড়ে যাওয়া এসব। এ পরিস্থিতিতে গাছকে বাঁচাতে আমরা কৃত্রিম ব্যবস্থা নিতে পারি। প্রয়োজনে কিছুদিন ছাদে দৈনিক কয়েক ঘন্টা করে বড় স্ট্যান্ড ফ্যান চালাতে পারি অথবা অটোমেটিক ফগারের সাহায্যে সকাল বিকেল পানি স্প্রে করতে পারি। এতে করে ঠাণ্ডা পানির বাষ্পের মাধ্যমে বাগানে হিউমিডিটি বাড়ে। গাছের গোড়া ছোট নুড়ি পাথর দিয়েও ভরিয়ে দিতে পারেন এসময়।

আবার এরিকা পাম, চাইনিজ পাম, মানিপ্লান্ট, স্ন্যাকপ্লান্টের মতো ছায়াপ্রিয় গাছকে সারাবছর শেড বা সেমিইনডোরের মতো স্থানে রাখা গেলেও এখন পুরো শেডে রাখতে হবে। বারান্দায় বা জানালায় গাছ রাখলেও এমন ভাবে রাখুন যেন রোদ আসলে পর্দা টেনে দেওয়া যায়। এসময় এসব গাছকে ঘর থেকে বের করে রোদে দিবেন না। একান্ত রোদ দিতে হলে সকালে দু/এক ঘন্টা রোদে দিতে পারেন। দুপুরের চড়া রোদে রাখলে পাতা পুড়ে যেতে পারে। চন্দ্রমল্লিকা, জারবেরা পরবর্তী বছরের জন্য রাখতে হলে শেডে রাখুন অথবা বড় গাছের নিচে রাখুন। না হলে এ গ্রীষ্মের রোদে মরে যেতে পারে। এ সময় গোলাপ গাছকে সেমিশেডে রাখুন। নাহলে পাতা পুড়ে যাওয়া, কলি শুকিয়ে যাওয়া বা ডাইব্যাকের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।

ছাদে এসির আউটডোর ইউনিটের পাশে অবশ্যই গাছ রাখবেন না। এসি থেকে বের হওয়া গরম হওয়া গাছদের খুব ক্ষতি করে। গ্রীষ্মে রিপটিং করা যাবেনা। কারন শিকড় কাটছাট করলে এসময় গাছ হিটশক সইতে পারবে না। আর গাছ ছাঁটলে কাটা অংশ থেকে ডাল দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। তবে শুকনো ডালপালা ছেঁটে দেওয়ার পাশাপাশি গোড়ার আগাছা পরিস্কার করে দিতে হবে।

গরমে জবা ফুল গাছে নানা সমস্যা দেখা দেয়, ফুল ঝরে পড়া, পাতা শুকিয়ে যাওয়া, কলি ছোট হওয়া এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। গরমে এসব স্বাভাবিক। তবে শুধু সকালে রোদ আসে এমন স্থানে গাছটি রাখুন।

এ সময় হ্যাঙিং টবে থাকা গাছেও যেন পানির অভাব না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এসব গাছ একবার শুকিয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফেরানো কঠিন। এসময় ছাদে সবজি চাষ করলে সিডবেড বা সিড-ট্রেগুলো সরাসরি রোদে রাখা যাবে না। কারণ সূর্যালোকে মাটির ক্ষতির পাশাপাশি গাছও মরে যেতে পারে। বিশেষত শাক চাষে মাটি কম ব্যবহৃত হয়। তখন মাটি শুকিয়ে গাছ মরে যাবে। গরমকালে গাছে ইউরিয়া, ডিএপি, পটাশের মতো রাসায়নিক সার বেশি ব্যাবহার করা যাবে না। এগুলোর পরিবর্তে গোবর, ভার্মিকম্পোস্টের মতো জৈব সার দিতে হবে। খৈল পচানো পানি, সবজি পচানো পানি খুব পাতলা করে সপ্তাহে একবার দেওয়া যাবে।

এ কয়েক সপ্তাহ বাগানের সব গাছের দিকে নজর রাখতে হবে। কোন গাছের কি সমস্যা হচ্ছে তাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সমস্যা যত দ্রুত সনাক্ত করা যাবে সমাধানও বের করা সম্ভব হবে ততো তাড়াতাড়ি। বাগানের অসুস্থ গাছগুলোকে সরিয়ে একপাশে রেখে পরিচর্যা করতে হবে নতুবা সুস্থ গাছেও রোগ ছড়িয়ে পরতে পারে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, গ্রিন সেভার্স

সারাবাংলা/এসএসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন