বিজ্ঞাপন

ভ্যারিয়েন্টের কথা না ভেবে মাস্ক পরা ও ভ্যাকসিন নেওয়ার তাগিদ

May 4, 2021 | 1:39 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে ২০২১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ শনাক্তের হার বাড়তে শুরু করে। ৯ মার্চ থেকে সংক্রমণ শনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের ওপরে উঠতে থাকে। দেশে স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও কোভিড-১৯ এর ভ্যারিয়েন্টের কারণে সংক্রমণ বাড়ছে বলেই মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের শীর্ষ ব্যক্তিরা। ইতোমধ্যেই দেশে পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিলে সংক্রমণ ছড়ানো ভ্যারিয়েন্ট।

বিজ্ঞাপন

দেশে এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সংক্রমণ শনাক্তের হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে কমে এলেও সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচনায় আছে ভারতের পাওয়া যাওয়া নতুন ভ্যারিয়েন্ট। ভারতের মহারাষ্ট্রসহ কিছু অঞ্চলে ডাবল মিউটেন্ট (B.1.617), ট্রিপল মিউটেন্ট (B.1.617+ S:V382L) এবং B.1.618 (বেঙ্গল ভ্যারিয়েন্ট) নামে পরিচিত ভ্যারিয়েন্টগুলো নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশেও। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারাও এই ভ্যারিয়েন্টগুলো দেশে আসলে সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইতোমধ্যেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোদ ভারতেই এখনো তাদের নতুন পাওয়া ভ্যারিয়েন্টগুলো কতটুকু ক্ষতিকর তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা হয়নি। আর তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এখন পর্যন্ত এগুলোকে ভ্যারিয়েন্ট অফ ইন্টারেস্ট বলে পর্যবেক্ষণে রাখছে। যেহেতু আমাদের দেশে আগে থেকেই যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে তাই সংক্রমণ শনাক্তের হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ভ্যারিয়েন্ট যাতে সহজে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। কিন্তু একই ভাবে মহামারিকালে ভাইরাস নতুন নতুনভাবে রূপ বদলানোটাও স্বাভাবিক। আর তাই এ সময় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চাইতেও বেশি জরুরি মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। যাতে কোনোভাবেই মানুষ সহজে আক্রান্ত হতে না পারে। একই সঙ্গে মানুষকে ভ্যাকসিনও নিতে হবে। যাতে মানুষ কোভিড-১৯ সংক্রমিত হলেও তার মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে। একই সঙ্গে সংক্রমণের তীব্রতাও কমে আসে ভ্যাকসিন নেওয়ার কারণে।

অণুজীববিজ্ঞানী ও চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহা সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভারতের ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে খোদ সেই দেশেই এখন পর্যন্ত তেমন ঘোষণা দেওয়া হয় নাই। তাদের গবেষকরা এখন পর্যন্ত বলে নাই যে সেখানে এই ভ্যারিয়েন্ট খুব বেশি বিস্তার ঘটেছে। তারা বলছে এখনো বিষয়টি দেখছে। তাদের এখানে সিকোয়েন্স কতগুলি হয়েছে? সেগুলোকে আবার স্টেট হিসেবে ভাগ করলে কত শতাংশ হয়? সুতরাং এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চাইতে জরুরি মাস্ক পরা ও ভ্যাকসিন গ্রহণ করা।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট আসার পরে একটা ভয় দেখা গিয়েছিল অনেকের মাঝে। কারণ এখন পর্যন্ত আমাদের এখানে আমরা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হচ্ছে জাতীয়ভাবে। এই ভ্যাকসিনটা যুক্তরাজ্য ভ্যারিয়েন্টের বিপক্ষের সুরক্ষা দিতে পারলেও দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের বিষয়ে পুরোপুরি কার্যকর না বলেই গবেষণায় দেখা গেছে এখন পর্যন্ত। কিন্তু এতে তো হতাশ হওয়া যাবে না। কারণ বিষয়টা যদি এমন হয় যে এই ভ্যাকসিনের কারণে একটা মানুষকে স্বাভাবিকভাবে যতটা সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল অর্থাৎ ৮০ শতাংশ বা ৭০ শতাংশ সুরক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও তার চাইতে কম দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে যদি ভ্যাকসিনটা কোনো ভ্যারিয়েন্টের বিপক্ষে ৫০ শতাংশ সুরক্ষা দিয়ে থাকে বা আরও কনজারভেটিভ ওয়েতে চিন্তা করলেও যদি বলি যে ৪০ শতাংশ সুরক্ষা দেয় তবে সেটাও কিন্তু উপকার করবে মানুষের।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি আইসিইউ সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে যদি কোনো মানুষ ভ্যাকসিনের কারণে ৩০ শতাংশ সুরক্ষাও পেয়ে থাকে তবে একটা মানুষকে হয়তোবা আইসিইউতে আর যেতে হবে না। হয়তোবা খুব বেশি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি ৪০ শতাংশ সুরক্ষা পেয়ে থাকে তবে হয়তো বা তাকে আর হাসপাতালে যেতে হবে। কোনো উপসর্গ তার মাঝে দেখা যাবে না এমনটা বলা যাবে না। তবে তার উপসর্গ কম মাত্রায় হবে। কিন্তু তাকে হাসপাতালের বেডে নাও যেতে হতে পারে। আর যদি বেডে গিয়েও থাকে তবে আইসিইউতে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নাও হতে পারে। খুবই ব্যতিক্রম যদি হয়ে থাকে তবে অল্প সংখ্যক মানুষকে তখন হাসপাতালের বেডে বা আইসিইউতে ভর্তি হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক ড. সমীর সাহা বলেন, ‘ভ্যাকসিন নেওয়ার কারণে কিন্তু বলা যায় ওভারঅল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হবে। আমাদের এখানে আইসিইউ বেড নিয়ে যে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা সেগুলো কিন্তু থাকবে না। এটা আমাদের জন্য সবচাইতে বড় উপকার যা ওভারঅল স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পজিটিভ এফেক্ট ফেলে। শুধুমাত্র কোভিড-১৯ না, দেখা গেলো যারা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত তখন তাদেরও আইসিইউ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কারণ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী বেশি থাকায় আমাদের প্রায় সব বেডই কোভিড-১৯ সংক্রমিতদের দিয়ে দিতে হচ্ছে। সেখান থেকে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা। এটা খুবই জরুরি।’

ভ্যারিয়েন্টের কথা না ভেবে মাস্ক পরা ও ভ্যাকসিন নেওয়ার তাগিদ

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধির বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কারণ যে ভ্যারিয়েন্টই আসুক না কেনো তাতে কোনো চিন্তা তখন থাকবে না যদি সবাই মাস্ক পরে। কারণ মাস্ক কিন্তু সব ভ্যারিয়েন্টকেই আটকাবে। আর তাই বলি ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেন- আমাদের একটু সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার, যেন আমরা মানুষকে সঠিক বার্তা দিতে পারি। আমরা যত যাই বলি না কেন, যে মিউটেশন বা ভ্যারিয়েন্টই আসুক না কেন— আমাদের কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে। সবসময় মাস্ক পরে চলতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবেই। একই সঙ্গে ভ্যাকসিনও নিতে হবে যাতে সংক্রমণের ঝুঁকির মাত্রা কমে আসে।’

জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর’বি) গবেষক ড. মুস্তাফিজুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এটা নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের ভ্যারিয়েন্ট নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটা নিয়ে তথ্য যেনো কোনোভাবেই ভুল অর্থ প্রকাশের মতন করে মানুষের কাছে দেওয়া না হয় তা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিগতভাবেই ভাইরাসের মিউটেশন ঘটবে বা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যাবে। এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

তিনি বলেন, ‘সবার কাছে যেহেতু বিস্তারিত তথ্য থাকে না তাই হয়তো বা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়ে থাকে। তবে এটাকে তাদের দোষ হিসেবেও বলা যায় না। কারণ এতে যদি সতর্কতা বাড়ে ও সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানে তবে তার উপকার কিন্তু সবাই পাবে। ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেনো সবাইকে মাস্ক পরতেই হবে।’

ড. মুস্তাফিজ বলেন, ‘আমাদের দেশে একটা কমন মিসটেক হচ্ছে এটা ভেবে যে ভ্যাকসিন ১০০ ভাগ কাজ করবে। এমনটা কিন্তু ভ্যাকসিন যারা বানায় তারাও বলে না। মডার্না বা ফাইজার বলেছে ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ৫ শতাংশ কিন্তু দিচ্ছে না। এটা আবার ইনডিভিজুয়াল টু ইনডিভিজুয়াল নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রে। আমাদের ইমিউন সিস্টেমের উপরে নির্ভর করে। দেখা যায় অনেকের ইমিউন রেসপন্স হয় না। এসব মিলিয়ে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই।’

ভ্যাকসিন যে সংক্রমণকে প্রতিরোধ করবে তা কোনো ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বলে নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন কিন্তু জানে না যা কে ভ্যাকসিন নিয়েছে আর কে নেয় নাই। ভাইরাস কিন্তু দুইজনকেই সংক্রমিত করবে। তাহলে ভ্যাকসিন কী করবে? ভ্যাকসিন যেটা কাজ করবে তা হলো মানুষকে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হবে না। সংক্রমিত হলেও দেখা যাবে ভ্যাকসিনের যে সুরক্ষা তা যদি আংশিকও হয়ে থাকে সেটা কিন্তু মানুষ পাবে। এখন কথা হচ্ছে যুক্তরাজ্য বা দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট কাজ করবে কিনা? এগুলোর কিছু মিউটেশনের কারণে ভ্যাকসিনের যে সুরক্ষা পূর্ণভাবে দেওয়ার কথা তা হয়তোবা দিবে না কিন্তু আংশিক হলেও তো দিবে।’

‘মিউটেশনের কারণে স্পাইক প্রোটিনে যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে সেগুলো কিন্তু পুরোই চেঞ্জ হচ্ছে। বৈজ্ঞানিকভাবে বলতে গেলে আমরা বলে থাকি এখানে অনেকগুলো এপিটপ থাকে। সুতরাং অন্যান্য এপিটপ যতক্ষণ পর্যন্ত পুরা না থাকে যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন যদি কেউ দিয়ে থাকে তবে তাকে কিন্তু কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিপক্ষে সুরক্ষা দিবে না। কারণ সেটার স্পাইক, প্রোটিন সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকে যার বিপক্ষে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও কিন্তু কেউ যদি মিউটেশনের কারণে পূর্ণ সুরক্ষা না পায় তবে আংশিক হলেও তো পাবে। এই আংশিক সুরক্ষাটাই এমন একটা বিষয় যা মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। হয়তোবা মাইল্ড একটা সংক্রমণ দেখা দিবে এবং শরীরে ভ্যাকসিনের নেওয়ার কারণে যে অ্যান্টিবডি আছে সেটা ওই ভাইরাসকে নিউট্রালাইজ করবে। এক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা দিচ্ছে না এমন হবে না। আর যতটুকুই দিবে তাতে হয়তোবা কেউ সংক্রমিত হলেও সেটার ঝুঁকির মাত্রা কম হবে’, বলেন এই গবেষক।

ড. মুস্তাফিজ বলেন, ‘ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্টানগুলোও কিন্তু বলে যে তাদের ভ্যাকসিনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের সংক্রমণের মাত্রা কমানো যাতে ভ্যাকসিন গ্রহীতাকে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে না হয়। এতে করে হাসপাতালে যে প্রেশার পড়ার কথা তা কমে আসে। ১০০ ভাগ সুরক্ষা কোনো ভ্যাকসিনই দিতে পারে না। আগে যে ভ্যাকসিনগুলো আমরা দেখেছি যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন বা অন্যান্য ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই কথা বলা যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করছে। প্রকৃতপক্ষে বেশিরভাগ ভাইরাস, বিশেষ করে এম-আরএনএ ভাইরাস নিজেকে টিকিয়ে রাখতে অনেক বেশি মিউটেশন করে। এটা প্রাকৃতিকভাবেই হয়ে থাকে। আমরা হয়তো এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে কথা বলছি, পরে দেখা যাবে নতুন আরেক ভ্যারিয়েন্ট আসবে।’

ভ্যারিয়েন্টের কথা না ভেবে মাস্ক পরা ও ভ্যাকসিন নেওয়ার তাগিদ

ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে দুঃশ্চিন্তা না করে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের আহ্বান জানান ড. মুস্তাফিজ। তিনি বলেন, ‘নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কিভাবে বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই নতুন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বরং আমাদের সবাইকে বেশি বেশি ভাবতে হবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ নিয়ে। নতুন যে ভ্যারিয়েন্টই আসুক, তার বিরুদ্ধে বাঁচার উপায় একটাই— মাস্ক পরে থাকতে হবে, হাত ধোয়ার অভ্যাস চালু রাখতে হবে, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের সবাইকে ভ্যাকসিন নিতেই হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নতুন নতুন আসবেই আর এটা নিয়ে গবেষণা করতে হবে সবসময়েই। তবে ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেনো মাস্ক কিন্তু পরতেই হবে। এর তো কোনো বিকল্প নেই। মাস্ক পরলে মানুষকে ভাইরাস আক্রমণ করার সম্ভাবনা থাকবে না। আর তাই শুধুমাত্র ভ্যারিয়েন্টের বিপক্ষে না, বলা যায় পুরো ভাইরাসের বিপক্ষে লড়াই করতে মাস্ক পরতেই হবে। একই সঙ্গে ভ্যাকসিনও নিতে হবে। কারণ যদি কেউ সংক্রমিত হয়ে যায় তবে তার ঝুঁকির মাত্রা কমাবে ভ্যাকসিন।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশে ভ্যারিয়েন্ট যাই আসুক না কেনো সবাইকে মাস্ক পরতে হবে ভাইরাস থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে। একই সঙ্গে হাত ধোয়ার অভ্যাস চালু রাখতে হবে। মাস্ক না পরে যদি ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে কেউ দুঃশ্চিন্তা করে তবে লাভ কী? কেউ যদি ভাইরাসকে নিজের কাছে প্রবেশের সুযোগ না দেয় তবে ভাইরাস কী পারবে কাউকে আক্রান্ত করতে? সম্ভব না তো। আর তাই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে ও মাস্ক পরতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাকসিন নিতে হবে। ভ্যাকসিন একদিকে যেমন মানুষের মাঝে ঝুঁকির মাত্রা কমাবে ঠিক তেমনি এর কারণে সংক্রমিতদের হাসপাতালে যাওয়ার সংখ্যাও কমাবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান খসরু সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে কমেন্ট করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমানে সিকোয়েন্সিং ডাটা। যুক্তরাজ্যে যে পরিমাণ সিকোয়েন্স করেছে তা আমরা এখনো পারি নাই। ভাইরাস তো রূপ পাল্টাবেই। এরপরেও সে যতভাবেই তার রূপ পাল্টাক না কেনো সেখান থেকে সুরক্ষা দিবে কিন্তু মাস্ক। একই সঙ্গে ভ্যাকসিন যারা গ্রহণ করবে তারাও সুরক্ষা পাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে হয়তোবা কম বা বেশি মাত্রায় সুরক্ষা যেই পাক না কেনো ভ্যাকসিন গ্রহীতার ঝুঁকির মাত্রাও কিন্তু কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ভেবে যদি কেউ স্বাস্থ্যবিধি না মানে তবে যে কারো মাঝেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ হতে পারে। এমনকি ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও যদি কেউ মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়ায় তবে তার মাঝেও সংক্রমণ হতে পারে। কারণ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেওয়ার ২১ দিন পরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি হতে শুরু করে। আর তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময় পর্যন্ত সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এমনকি ভ্যাকসিনের দুই ডোজ নেওয়ার পরও সবাইকে অন্তত আগামী একবছর মাস্ক পরতেই হবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও দেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভ্যারিয়েন্ট যাই হোক না কেনো কোভিড-১৯ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পেতে আমাদের মাস্ক পরার উপরে জোর দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্য বিধি মানতে হবে। মাস্ক পরার অভ্যাস যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তবে তা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াবে। একইসঙ্গে ভ্যাকসিন নিতে হবে সবাইকে। এর কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে আবার নির্ভার হয়ে স্বাস্থ্যবিধি অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। মাস্ক তাও পরতে হবে এবং হাত ধোঁয়ার অভ্যাসটাও ধরে রাখতে হবে। আর এগুলো না করে যদি মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েই নিজেকে নিরাপদ ভাবে তবে বিপদ ডেকে আনা হবে।’ কোনো কিছু খাওয়ার আগে ন্যূনতম ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া, একইসঙ্গে মাস্ক ব্যবহার করলেই করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

সারাবাংলা/এসবি/এমও

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন