বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আসলে কে জিতল, হারল কে? [পর্ব-১]

May 4, 2021 | 11:38 pm

রফিকউল্লাহ রোমেল

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন অবশেষে ভারতের রাজনীতির শ্রুত ও অনুসৃত নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে বিজেপির অবস্থানকে খর্ব করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস টানা তৃতীয়বারের মতো রাজ্যে সরকার গঠন করেছে। নিজ আসন নন্দীগ্রামে পরাজয়ের পরেও মমতা ব্যানার্জি টানা তৃতীয়বারের মতো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ভোটের আগের অধিকাংশ জরিপ ভুল প্রমাণিত করে এবং ভোটের সময় বুথ ফেরত জরিপ ছাড়িয়ে তৃণমূল ২১৩টি আসনে জয় পেয়েছে। বিজেপি জিতেছে ৭৭টি আসনে। এবার পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করেও একশ আসন ছুঁতে পারেনি বিজেপি। কিন্তু তাদের আসন বেড়েছে, ঠিক যেমন দিল্লিতেও তাদের আসন সংখ্যা বেড়েছিল।

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ও একই ভাষাভাষী হওয়ার কারণে এই নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশেও অনেক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে শুধু তিস্তাকেন্দ্রিক পর্যবেক্ষণ ছাড়াও এই নির্বাচনে আমাদের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত— যেগুলো ভারত আর পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক বিনির্মাণে চিন্তার খোরাক হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আসলে কে জিতল, হারল কে? [পর্ব-১]
যদিও ভোটে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি বিজেপি, তবে এবার পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া শিবিরের সমর্থন বেড়েছে 

পশ্চিম বাংলার নির্বাচন নিয়ে আমাদের বাড়তি উৎসাহ খুব অস্বাভাবিক বলে একেবারেই মনে হয় না। তুরস্কের এরদোগান, ইরানের খোমেনি আর সৌদি বাদশাহদের কেচ্ছা-কীর্তি নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকার চেয়ে প্রতিবেশীর রাজনীতি বুঝতে পারা জরুরি। কারণ এতে সরাসরি আমাদের স্বার্থ জড়িত। এতে মাথা ঘামানো লজ্জার কিছু নয়।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আসলে কে জিতল, হারল কে? [পর্ব-১]
ভুমিধস বিজয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি

অনেকেই বলছেন, ‘দিদি তো জিতলে এবার, তো তিস্তার পানি ছাড়ো...।’

বিজ্ঞাপন

তিস্তার পানি ছাড়ার ব্যাপারে ভারত ও রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ জড়িত। আন্তর্জাতিক নদীতে কোনো একটি দেশের ‘ন্যায্য হিস্যা’ প্রতিষ্ঠা করা বহু বহু বছর ধরে বহু দেশের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমরা নদীর পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে যে ঝামেলা মোকাবিলা করছি, এত পরাক্রমশালী দেশ হয়েও ভারত তাদের অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে ভাটির দেশ হিসেবে উজানের দেশ নেপালের সঙ্গে একই সমস্যায় আছে। সেই ভারত আবার উজানের দেশ হিসেবে আমাদের সঙ্গে ‘মাস্তানি’ করে। আবার উজানের দেশ হিসেবে চীন ভাটির দেশ ভারতকে ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তিস্থলে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে নির্যাতন করছে।

সে হিসাবে মমতা ব্যানার্জি তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে মোটেও ভালো কিছু করেননি। কিন্তু তার নিজের রাজ্যে বা নিজের দেশে এজন্য তিনি অপরাধী নন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু অপরাধ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। বাংলাদেশ আর ভারত দুই দেশেই তিনি অপরাধ করেছেন। দীর্ঘদিন ভারতীয় পরিচয়ের ভারতীয় নাগরিক এবং তাদের ভারতে জন্ম নেওয়া সন্তানদের বিতর্কিত এনআরসি আইনে তিনি জোর করে ভারত থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। হুমকিটি দিয়েছেন মূলত তার কমান্ডার ইন চিফ অমিত শাহ। বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদি সেটা অনুমোদন করেছেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাস্তব তথ্য উপেক্ষা করে বিজেপি ধর্মকে ব্যবহার করেছে। যেভাবে তারা আগরতলা থেকে বিহার হয়ে উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, হুবহু একই কায়দায়। অমিত শাহের বিজেপি যে কায়দায় এই খেলা খেলেছে, একই মুনশিয়ানা ভারতের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দেখাতে পারেনি।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আসলে কে জিতল, হারল কে? [পর্ব-১]
এনআরসি'র প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ভারত

সারাজীবন সংখ্যালঘু তোষণ রাজনীতিকেই বদলে দিয়েছেন অমিত শাহ। সংখ্যালঘু মানেই মুসলিমদের ম্যানেজ করতে গিয়ে যে শক্তিক্ষয় কংগ্রেস, সিপিআই বা বাজপেয়ীর বিজেপি করেছিল, সেখান থেকে একেবারে বেরিয়ে মোদি-অমিতের বিজেপি পুরো উল্টো চাল দেয়। তারা সমস্ত সংখ্যাগুরু অর্থাৎ হিন্দু ভোটকে একাট্টা করে ফেলে। যদি আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর নির্বাচনে বিজেপির কৌশল লক্ষ্য করেন, তবে দেখবেন— বাংলাদেশ নামের একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের জুজু দেখিয়ে সেভেন সিস্টার্সে বিজেপি আজ কোথায়! ত্রিপুরায় বিপ্লব কুমারের বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, যাদের আগে কোনো অবস্থানই ছিল না ওই রাজ্যে। মাত্রই আসামে যে নির্বাচন শেষ হয়েছে, সেখানেও সর্বানন্দ সনোয়ালের বিজেপিই এসেছে ক্ষমতায়। সেখানেও কায়দা একই। মেঘালয়ে কংগ্রেস পতন প্রায় সম্পন্ন। পি এ সাংমার এনপিপি’র মাঝে বিজেপি ঢুকেছে। এখন জোটে তাদের আসন দু’টি। কিন্তু চালকের আসনে বসে এবং ধর্মীয় কার্ড খেলে মেজরিটিকে এক ছাতার নিচে এনে বিজেপি কী করতে পারে, সেটা ত্রিপুরায় দেখা গেছে। মেঘালয়ে আঞ্চলিক দলগুলো হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্ত ওই রাজ্যের সাধারণ মানুষ আস্তে আস্তে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে— হিন্দুস্তান হিন্দুরাই ভালো দেখে রাখবে। নইলে ঝামেলা। মুসলিম বাংলাদেশ ঝামেলা করতেই পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ওই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেছে।

প্রতিশ্রুত রাম রাজ্যের বাস্তবায়ন আমরা চোখের সামনে দেখি। গো-মাংস নিয়ে সহিংসতা দেখি। কিন্ত যেটা দেখি না সেটা হলো— জাতপাতের ভুক্তভোগী দরিদ্র নিম্নবর্ণের হিন্দুরা, দলিতরা— যাদের কেউ ছিল না— বিজেপি এদেরকেও বৃহত্তর হিন্দু ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে।

উত্তর আর পশ্চিম ভারতে বিজেপি কী করেছে, সেটা সবাই দেখেছে। প্রতিশ্রুত রাম রাজ্যের বাস্তবায়ন আমরা চোখের সামনে দেখি। গো-মাংস নিয়ে সহিংসতা দেখি। কিন্ত যেটা দেখি না সেটা হলো— জাতপাতের ভুক্তভোগী দরিদ্র নিম্নবর্ণের হিন্দুরা, দলিতরা— যাদের কেউ ছিল না— বিজেপি এদেরকেও বৃহত্তর হিন্দু ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে। এদের চাকরির বিধি পরিবর্তন করে নতুন কোটা তৈরি করা হয়েছে। তাদের নিজস্ব সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের সরাসরি আনুকূল্য পাচ্ছে। বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন হচ্ছে এসব সামাজিক অনুষ্ঠানে।

দলিত ও নিম্নবর্ণের রাজনৈতিক দলগুলোকে মুছে দিতে শুরু করেছে বিজেপি। শিলা দীক্ষিত দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার দল এখন কোথায়? উত্তর প্রদেশের মায়াবতী বা তার দল বহুজন সমাজ পার্টি বা মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি আজ কোথায়?

ভারতের রাজনৈতিক সার্কেলের উত্তর হলো— ‘সবাই-ই আছে। কিন্ত অমিত শাহের ল্যাপটপের ভেতরে...’।

বিজেপি এই কৌশল নিয়েই এগুচ্ছে। দিল্লিতে হেরে গেলেও ব্যাপক শক্তি সংগ্রহ করেছে তারা। বাংলাতে জিতেই যেত, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাংলার মানুষ তাদের সমীকরণটা বুঝে ভোট দিয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে যা করার ঠিক তাই করেছে বিজেপি। তবুও এই ৭৭টি আসন মানে বিজিপি পশ্চিমবঙ্গের ভেতরেও শক্ত ঘাঁটি করে ফেলেছে। এখন তারা এ রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল। এক সময়ের প্রতাপশালী বাম ও কংগ্রেস রাজ্যের রাজনীতিতে আণুবীক্ষণিক দলে পরিণত হয়েছে। সর্বভারতীয় পর্যায়ে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেস ছিল এ রাজ্যে গতবার প্রধান বিরোধী দল। আজ বিজেপি তাদের হটিয়ে সে আসন কবজা করেছে।

ভারতীয় সেক্যুলারিজম বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দুর্বলতায় ভারতকে টিকিয়ে রাখে হিন্দি ভাষা, ক্রিকেট আর বলিউড। কিন্ত এগুলো দিয়ে নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় না।

ক্ষমতায় যাওয়ার মতো যথেষ্ট গুছিয়ে উঠতে পারেনি বিজেপি। তবে কৌশল ঠিকই ছিল। এবার তাদের তৃণমূল থেকে লোক ভাগাতে হয়েছে। মিঠুনের মতো অকেজো মুখকেও দলে ভিড়িয়েছে। ফুরফুরা শরিফের পীর আব্বাসের সেক্যুলার পার্টির পিছেও সময় ও অর্থ ব্যয় করেছে। তবে বিজেপি এবার যে শক্ত ভিত তৈরি করেছে তাতে আগামীবার আর এসব কিছুই লাগবে না। যদি পশ্চিমবঙ্গের  মানুষের ভাগ্যের উন্নতি না ঘটে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য না আসে, তাহলে সহজেই বিজেপি বিদ্যা গেঁথে যাবে মানুষের মাথায়। তখন আর লোক ভাগিয়ে এনে নির্বাচন করতে হবে না। মার্কায় ভোট পড়বে, যেমন এই দেশে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী পাবনায় প্রচুর ব্যবধানে নির্বাচনে জিতেছিলেন।

গোটা ভারতে জাত, ভাষা, বর্ণ, অর্থনীতি, নিজস্ব সামাজিক সমস্যা ইত্যাদি এক রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থাকে অন্য রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে। ভারতীয় সেক্যুলারিজম বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দুর্বলতায় ভারতকে টিকিয়ে রাখে হিন্দি ভাষা, ক্রিকেট আর বলিউড। কিন্ত এগুলো দিয়ে নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় না। অমিত শাহ আর মোদির বিজেপি এই শূন্যতায় অব্যর্থ মারণাস্ত্র তৈরি করেছেন। তাদের এই অস্ত্রের নাম ধর্মভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা— যা বিহারে, আসামে, বাংলায়, কোচিতে, রাজস্থানে সব জায়গায় ‘কিলার ব্লো’ হিসেবে কাজ করবে।

এরই মধ্যে কাজ করছে, এবং করবেও।

আজ করোনাভাইরাসের কারণে আইপিএল স্থগিত হতে বাধ্য হলো। কিন্ত এই ভয়ংকর ভয়ংকর দ্বিতীয় ঢেউ খুব স্পষ্টভাবেই পূর্বাভাসিত ছিল। তারপরেও ভারতের পুরো উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলজুড়ে মহা কুম্ভমেলা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ পূণ্যার্থী স্নানে অংশ নিয়েছেন। আর মহাস্নানের চার দিন গড়ে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছেন। কেমন স্বাস্থ্যবিধি, কেমন সামাজিক দূরত্ব সেখানে মানা হয়েছে সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে তা সবাই জেনেছে। স্নানরত পূণ্যার্থীদের অনেকে করোনা ঠেকাতে অতি জরুরি মাস্ক কোথায় ছিল, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য ট্রোল হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আসলে কে জিতল, হারল কে? [পর্ব-১]
কুম্ভমেলায় অংশ নেওয়া পূণ্যার্থীরা

লাখো মানুষের এমন সমাগম, শূন্য স্বাস্থ্যবিধি দেখেও কি করোনা বিস্তারের আশঙ্কা করেননি নরেন্দ্র মোদি? তিনি কি এর ফল জানতেন না? একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি। রাজনীতিতে তার মেধা নিয়ে প্রশ্ন তোলার লোক কমই আছে। তিনি জানতেন না, আশঙ্কা করেননি— এমনটা অন্তত আমি মানতে রাজি নই। জেনেও মহাসমারোহে তিনি কেন এই উৎসব হতে দিলেন?

কেন!

পশ্চিম বাংলার নির্বাচনে দিদি জিতেছেন বলে বাংলাদেশের ভাগ্য বদলে যাবে তা নয়। তবে দিদির রাজনীতি আর পশ্চিম বাংলার মানুষের রেজিলিয়েন্স বা প্রতিরোধ মানসিকতা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সে বিশ্লেষণ আরেক দিন।

আপাতত এটা ভাবতে ভাবতে এই লেখা পড়া শেষ করুন— বিজেপির এই ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ কার্ডটি যদি বাংলাদেশে কেউ খেলে বসে বা খেলতে শুরু করে, তাহলে কী অবস্থা হতে পারে আমাদের?

(চলবে...)

লেখক: ম্যানেজিং এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন