বিজ্ঞাপন

এভাবে নির্বিচারে হত্যা করবে ভাবিনি

March 25, 2018 | 9:14 pm

এএসএম শামসুর রহমান। বয়স ৭১ বছর। ১৯৭০ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ব্যানারে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদে ভিপি নির্বাচন করেন। ওই সময় তিনি বি.কম পড়তেন। একই সময় তিনি প্রয়াত বেবী মওদুদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘রানার’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক প্রয়াত বেনজির আহমেদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক থাকতেন। সেই পত্রিকার লেখা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন। বেনজির আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সেই সুবাদে শামসুর রহমান ২৫ মার্চ রাতে মহসীন হলে বেনজির আহমেদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি জানালেন সেদিন রাতের কথা। কেমন দেখেছেন, অনুভূতিগুলো কেমন ছিল সবকিছু। সেদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ছাত্রদের অবস্থা, শহরের অবস্থা নিয়ে সারাবাংলার স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট হাসান আজাদ-এর সঙ্গে কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ বেলা একটা দুইটার দিকে আমি নরসিংদী থেকে ঢাকায় ফিরি। গুলিস্তানে বেনজির ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমার সিনিয়র ছিলেন। আমরা একসঙ্গে সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রানার’ বের করতাম। ওই রানার পত্রিকার কাজে আমরা দুজন এক সঙ্গে হই কিছু লেখা সংগ্রহের জন্য। এর আগে দুজনে লাঞ্চ করি। এই পত্রিকার সঙ্গে শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, ফজল শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী মিরুসহ অনেকেই জড়িত ছিলেন।

২৫ মার্চ বিকাল থেকেই পুরো ঢাকা শহরের অবস্থা থমথমে। রাত নয়টা, সাড়ে নয়টার দিকে থমথমে অবস্থার বাড়তেছে। চারদিকে একটা কথা, আর্মি নামতাছে। সারা ঢাকাতে রইটা গেছে যে, আর্মি নামতেছে। তবে রাতে পাকিস্তান আর্মিরা যে এভাবে অ্যাটাক করবে এটা কেউ বুঝে নাই। মনে করছে আর্মি নামছে, রাস্তাঘাটে যাবে। আগে যেমন কার্ফ্যু দিছিলো, ওরকম করবে। এরকমভাবে বিডিআরের ওখানে মারবে, পুলিশের ওখানে মারবে, রাস্তা ঘাটে মানুষ মারবে এটা আমরা বুঝি নাই। কেউ বুঝে নাই। এটা যদি আগে থেকে বোঝা যেতো তাইলে তো সবাই চলেই যেত।

বিজ্ঞাপন

এভাবে নির্বিচারে হত্যা করবে ভাবিনি

তো আমি আর বেনজির ভাই গুলিস্তান থেকে আমরা স্টেডিয়ামে আসলাম। সেখানে তখন ইসলামিয়া নামে একটা হোটেল ছিল। ওই হোটেলে তন্দুর রুটি আর কাবাব খাই। পরে আস্তে আস্তে রওনা হই পুরান ঢাকার রণেশ দা (রণেশ দাশগ্রপ্ত) বাড়িতে, সত্যেন দা’র (সত্যেন সেন) বাড়িতে। তাদের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করি। এরকম বিভিন্ন জায়গা থেকে লেখা সংগ্রহ করে রাত ১১টা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মহসীন হলের গেটে পৌঁছাই। তখন আমরা কিছু খাবার কিনে ভেতরে যাওয়ার সময় দেখি মাঠে মন্টু ভাই (মোস্তফা মহসীন মন্টু), খসরু ভাই (ওরা এগার জন চলচ্চিত্রে অভিনয় করা খসরু), আরেকজন ছিলেন। তারা তিনটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে কিছু ছেলে-পেলেকে প্যারেড করাচ্ছেন। তার আগেই আমরা দেশের অবস্থা খারাপ শুনলাম। শহরের অবস্থা গরম, যে কোন সময় আর্মি ক্র্যাকডাউন করবে।

আমরা যখন রাত এগারটা সাড়ে এগারটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম, তখন ক্যাম্পাসে অনেক লোকজন। সবার মধ্যেই আতংক আর উৎকন্ঠা। তখন মহসীন হলের মাঠটি ঘেরাও ছিল। হলে ঢুকার সময় অনেক দোকান পাঠ ছিল। সেখানেই ছাত্ররা চা-সিগারেট খেত। পুরো ক্যাম্পাসে অনেক ছাত্র রাস্তায় ছিল। আমরা মনে করেছিলাম আর্মি যদি ক্র্যাকডাউন করে তাহলে তা রাস্তার উপর দিয়ে , যেভাবে হয় আগে যেভাবে কার্ফ্যু-টার্ফ্যু হত, সেভাবে হবে। রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ করবে। কিন্তু তা না। তারা নেমেই বিডিআর, পুলিশ আর ছাত্র কিলিং শুরু করছে।

এভাবে নির্বিচারে হত্যা করবে ভাবিনি

এসব শুনে আমরা হলে ঢুকলাম। ফাইভ এএইচটি (অ্যাসিস্ট্যান্ট হাউস টিউটর) রুমে আমরা যাই। সেখানে আমি আর বেনজির ভাই রানার পত্রিকার কাজ শুরু করি। আমিতো ছিলাম নরসিংদীতে। ট্রার্য়াড ছিলাম। বেনজির ভাইকে বলি আপনি কাজ শুরু করেন। আমি ঘুমাই। তখন পৌঁনে বারটা বাজে। আমার চোখ কেবল লেগে এসেছে। রুমের দরজা বন্ধ ছিল। এসময় বেনজির ভাই খুব জোরে দরজায় ধাক্কা দেয়া শুরু করেন। শামসু উঠেন..উঠেন...চিল্লান শুরু করে ধাক্কানো শুরু করলেন। ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে শুনি ডা...ডা...ডা... গুলির আওয়াজ। এক তরফা গুলির আওয়াজ। তখনতো উঠে আমি বেকুব হয়ে গেছি। থ হয়ে গেছি। বেনজির ভাই বললেন, এই ব্যাপার, আর্মি তো অ্যাটাক করছে। তখন আমি বললাম, চলেন বস্তিতে চলে যাই। এখন কাটাবন-নীলক্ষেতের পশুপাখির দোকান যেখানে, সেখানে ওই সময় বস্তি ছিল, রেল লাইন ছিল। বস্তিতে গিয়ে পালাই আমরা। যেভাবে হোক লাফ-টাফ দিয়া বের হয়ে যাই। তখন উনি বললেন, আমরা তাহলে মারা যাব। বস্তিতে আগুন দিতে পারে। বস্তিতে যাওয়া হল না। হলের মধ্যে আমরা এককবার পাঁচ তলায় যাই, একবার চারতলায় যাই। এভাবে ঘুরতে থাকি। এক সময় দেখি, নাকের সামনে দিয়ে গুলি গেল। গুলির গন্ধ পেলাম। দরজায় লাগলো না কোথায় লাগল আল্লাহ জানে। পুরো হলের সব ছাত্র এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে।

তারপরে আমরা এরকম করতে করতে রাত সাড়ে তিনটায় দেখি নীলক্ষেতের পেট্রোল পাম্পের দিক থেকে ট্যাংক আসলো, অনেকগুলো ট্যাংক। হট যাও...হট যাও বলে এগুতে থাকলো। আমি যখন রাত সাড়ে তিনটার সময় ট্যাংক দেখলাম, এটা আমি ঘড়ি দেখে রাখছি। আমরা তখন পাঁচ তলায়। জানালা দিয়ে দেখতেছি। ইকবাল হলে ঢুকে গেল। আক্রমণ চালালো। ওই সময় সব ছাত্র নেতারা ইকবাল হলে থাকতো। সেখানে পাল্টা আক্রমণ হয়েছে কিনা জানি না। আর পাল্টা আক্রমণের প্রশ্নই আসে না। কারণ পাকিস্তানি আর্মিদের কাছে ছিল ভারী অস্ত্রসস্ত্র।

এভাবে নির্বিচারে হত্যা করবে ভাবিনি

এর কিছুক্ষণ পরেই জগন্নাথ হলে টাশ করে একটি এক্সপ্লোশন ঘটলো। বিকট আওয়াজ কইরা। চারদিকে আলো ছড়ায়ে পড়লো। পাকিস্তানি আর্মিরা একটা কাজ করতো কি, উপরে একটা বোমার মত মারতো, সেটা আকাশে গিয়া বিস্ফোরণ হয়ে আলোকিত হয়ে যেত। যাই হোক আমাদের এদিকে তারা আসে নাই, মহসীন হলে ঢুকে নাই। ঢুকছে হইলো সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (তৎকালীন ইকবাল হল) আর জগন্নাথ হলে। এই করতে করতে সকাল হয়ে গেল। পুরো রাত আমরা কেউ ঘুমাই নাই।

ওই সময় মহসীন হলে হাউস টিউটর ছিলেন গিয়াস উদ্দিন স্যার। ইতিহাসের শিক্ষক। সকালে স্যার হলের সবাইকে খিচুড়ি খাওয়াইলো। এটা ২৬ তারিখের সকাল বেলায়। এই খিচুড়ি খাওয়ার সময় আমরা যখন নীচে আসছি, তখন হলের মাঠে দেখি বিডিআরের অনেকগুলো জুতো আর ড্রেস পড়ে আছে। বিডিআর ক্যাম্প থেকে পলাইছে তারা।

পলানোর সময় তারা তাদের ড্রেস-ট্রেস থুইয়া চলে গেছে। এই দেখে আমরা ভয়ে আর কোথাও নড়ি নাই। আবার হলে ফিরে গেলাম। ফিরে খাওয়ার পর গিয়াস উদ্দিন স্যার বললেন, তোমরা হলের মধ্যেই থাকো। নড়াচড়া কইরো না। তারপর আমরা ভিতরে চলে গেলাম। ভিতরে চুপচাপ ছিলাম। রাত্র হওয়ার পর আবার গোলাগুলির আওয়াজ, আবার আতংক। এই অবস্থায় আমরা খাটের তলে, চকির তলে গিয়ে অবস্থান নেই। সেখানে শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাইতাম। চুপচাপ থাকতাম, যাতে টের না পায়। যদি আমাদের হলে ঢুকে! কারো সাথে কেউ কথা বলতাম না। যাতে ঢুকার পর দরজার কাছে এসে আওয়াজ না শুনে। আমার মনে হয়, ওই সময় আমার সাথে যারা ছিল সবার একই অবস্থা ছিল।

এভাবে নির্বিচারে হত্যা করবে ভাবিনি

হাউস টিউটর গিয়াস উদ্দিন স্যারকে পরে তাকে মেরে ফেলে। যিনি অনেক সহযোগিতা করেছেন। তখন মহসীন হলে কিন্তু ইসলামী ছাত্র সংঘের অনেক ছাত্র থাকতো। আমরা ধরে নিয়েছি, তারাই পরে গিয়াস উদ্দিন স্যারকে মারছে। ডিসেম্বরের ১১ তারিখে স্যারকে মেরে ফেলা হয়। ২৫ মার্চের পর আমরা কোন নেতৃস্থানীয় নেতাকে হলে দেখিনি।

আমরা হল থেকে বেরুলাম ২৭ মার্চ সকাল ১০টার পরে। কার্ফ্যু তুলে নেয়া হল। ২৬ মার্চ পুরো দিন-রাত আমাদের মনে হয়েছে, এখন হলে যদি তারা ঢুকে আমরা মরে যাব। সবার একটা মাত্রই চিন্তা ছিল হলে ঢুকবে কিনা, আমরা বাঁচবো কিনা? দিন আর রাত নেই সব সময় খাটের তলায় থাকতাম। দুপুরে খিচুড়ি খাওয়ার পর আবার সবাই যে যার রুমে বা লুকানোর মত জায়গায় অবস্থান নেয়।

২৭ মার্চ বেরুনোর পর আমি প্রথম যাই নীলক্ষেত পেট্রোল পাম্পের কাছে। আমার সঙ্গে বেনজিরভাইও ছিলেন। যাওয়ার পর দেখি অনেকগুলো পোড়া লাশ। ১৫/২০ টা পোড়া লাশ। বেনজির ভাই আর দেখতে দিলেন না। বললেন, চলেন যাই, তাড়াতাড়ি যাই। নীলক্ষেত থেকে রেসকোর্স পার হয়ে বেইলি রোড দিয়ে সিদ্ধেশ^রী যাই। তখন আমি সিদ্ধেশ^রী থাকি। এছাড়া আর কোথাও আমি যেতে পারি নাই। বেনজির ভাই দেন নাই।

এর আগে ২৩ মার্চ আমি সিদ্ধেশরীর বাসা থেকে ইলিশ মাছ রান্না করে বেনজির ভাই ও সাইদুর নামে আরেক জন ছিল তাদের জন্য খাবার নিয়ে রমনা থানার সামনে দিয়ে আসার সময় দেখি থানার উপরে বাংলাদেশের পতাকা লাগানো এবং পতাকা উড়ছে। ওইদিন কিন্তু পাকিস্তানের রিপাবলিক ডে।
২৫ মার্চ আমার জীবনের একটা স্মরণীয় দিন। ওই দিনটির কথা বলে বোঝানো সম্ভব না। যারা দেখছে তারাই কেবল উপলব্ধি করতে পারবে ওই দিনটা কি ছিল।

সারাবাংলা/এইচএ/এসআই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন