বিজ্ঞাপন

উন্নয়নকর্মীর করোনা ভাবনা

May 8, 2021 | 8:50 pm

লীনা হাসিনা হক

অনেকদিন লিখি না, লেখা আসেও না। আর কিইবা এমন লেখক আমি। তাও ভাবছিলাম করোনাকালে আমার ভাবনা আর অনুভূতিগুলোকে লিখে রাখি।
কেমন করে যে করোনা মহামারির একটা বছর চলে গেল, সবাই ভেবেছিলাম বুঝি শান্তি মিললো। খেসারত তো দুনিয়াভর মানুষ কম দিলো না, বুঝা না বুঝার ফাঁকটাতেই ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেপালি, তার স্ত্রী আইসিইউতে। শুভকামনা ছাড়া আর আর কিই বা করতে পারি। উগান্ডান সহকর্মীর বোন, ফিলিপিন্সের সহকর্মীর বাবা চলে গেলেন করোনার আক্রমণে।

সুইডিশ সহকর্মীর মা, খালা, বোনসহ পরিবারের সাত জন এক মাসের ব্যবধানে পৃথিবীর মায়া ছেড়েছে। বন্ধুকে কল করে ফোন হাতে বসে থাকি, শব্দ খুঁজে পাই না বলার মতো।

বিজ্ঞাপন

ভারতীয় বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম আজ। তার পরিবারের সবাই করোনা আক্রান্ত। বন্ধু জানালো— দিল্লি ছেড়ে লোকজন পালিয়ে যাচ্ছে। টিভিতে দেখালো গণসৎকারের দৃশ্য। আতঙ্কে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।

নিজের পরিবারের মধ্যেও তো করোনার হামলা। মেয়ে আক্রান্ত হলো, প্রবাসী ভাইয়ের পরিবারের সবার হলো, চাচাতো ভাইয়ের পরিবারের হলো, ভাগ্য ভালো কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু যে পরিমাণ আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব বোধ ভিতরটাকে কুরে খেয়েছে তাতেই তো বুঝতে পারি যে পরিবার তাদের আপনজন হারিয়েছে কী পরিমাণ কষ্ট হয়েছে তাদের।

বিজ্ঞাপন

পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে দেখা এই পৃথিবীকে আমি চিনতে পারি না। এই মহামারি এত প্রবল শক্তিতে আক্রমণ করবে সেটা কেউই কি ধারণায় রাখেনি? আমাদের মতো দেশে প্রস্তুতিও ছিল না তেমন, প্রস্তুতিই বা কি? আমাদের পক্ষে কি কোটি কোটি মানুষকে বসিয়ে খাওয়ানোর ক্ষমতা আছে? যেটুকু আছে সেখানেও তো ধেড়ে ইঁদুরদের জ্বালায় গরীব মানুষের কাছে কুটোকাটা পৌঁছে। চাইলেও এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় না। লকডাউন চলছে, কিন্তু দোকান খোলা। হলো কিছু? পরক্ষণেই ভাবি, দোকানে যারা কাজ করে তাদের তো পেট চালাত হবে। মানুষের জীবন আর জীবিকার টানাপড়েনে জীবিকার চাহিদারই জয়। করোনাতে হয় মরা নয় বাঁচা, কিন্তু না খেয়ে তো কেবল মরা।

এদিকে একবার শুনি ভ্যাকসিন আছে পরক্ষণেই শুনি ভ্যাকসিন নেই! ক্ষমা করো দয়াল। বাংলাদেশেও তো মানুষ গ্রামের দিকে ছুটেছিল, গ্রামে খোলামেলা, করোনার আক্রমণ কম, এমনটাই ধারনা। অনেকে বলছেন, মরতেই যদি হয় পরিবারের সাথেই মরবো। কত যে মানুষ, কাছের মানুষ, দূরের মানুষ, গুণী মানুষ চলে গেলেন করোনার হামলায়। দুই সপ্তাহ আগে কবরী আপার চলে যাওয়ার ধাক্কাটা এখনও বুকের ভেতর চাপ ধরে আছে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কিছুর কোনো দিশা নেই। কক্সবাজারে এনজিওদের নিয়মিত কাজ প্রায় বন্ধ। শুধু খাদ্য বিতরণ, পানীয়, পয়ঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা সেবা ছাড়া তেমন কিছু করা যাচ্ছে না। আমরা হোম অফিস করছি, ওয়ার্ক ফ্রম হোম। এই পদ্ধতির সুবিধা অসুবিধা দুই-ই আছে। বাড়িতে থেকে অফিস করলে এক্সপোজ হওয়ার রিস্ক কম, অন্যকেও রিস্কে ফেলার তেমন সুযোগ নাই। কিন্তু হোম অফিস মডেলটিতে কোনো ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে তো চলছেই। এমনকি বাথরুমে গেলেও ফোন সাথে নিতে হয় বা খাবার সময়ও নিস্তার নেই। আর গুগোল মিট, জুম বা মাইক্রোসফট টিম— মিটিংয়ের শেষ নেই। দিনে পাঁচ থেকে সাতটা মিটিং যেনো কথা দিয়েই চিঁড়া ভিজিয়ে ফেলবো। কিন্তু তাতো আর হয় না, কাজ করেই কাজ শেষ করতে হয়, কথার ফেনা তুলে কেবল গলা শুকায় আর মাথা ধরে।

আমার সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেই এখনো নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। এ সংখ্যা হাজার ছড়িয়ে যাবে। এসব কর্মীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। গর্ব বোধ করি তাঁদের জন্য। মার্চ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন যখন লাগল, সেই সন্ধ্যা থেকে আমাদের মেডিকেল টিম, খাদ্য বিতরণকারী কর্মীদল, প্রটেকশন টিম এক নাগাড়ে কাজ করে গেছে প্রচণ্ড তাপ, পোড়া ছাইয়ের ধূলা, টয়লেটের অভাব, একটু ছায়ার অভাব, তাঁবুর ভিতরে অসহনীয় গরম, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চাপ, করোনা সংক্রমণর ভয়ের মধ্যেও। তবু তারা থেমে নেই। সেই সময় অনুভব করেছি তারা আসলে এটাকে চাকরি হিসাবে নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। তাই সকল ভয়ের উপরে উঠে মানবতার পতাকা উঁচুতে তুলেছেন।

বিজ্ঞাপন

একটু অন্য চিত্রও আছে, মুদ্রার অন্য পিঠ না থাকলে সেটা তো আসল মুদ্রা নয়। লকডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু স্টাফ স্রেফ না জানিয়ে চলে যায় কর্মস্থল ছেড়ে, বুঝে উঠতে উঠতেই দিন পনেরো চলে গেছে (আমার প্রায় তিন হাজার স্টাফ)। তারা বাড়ি যায় ছুটি কাটাতে কিন্তু পরে আর ফেরেনি। ছুটির হিসাব চাওয়া হলে দেখা যায় তারা কর্মস্থলের বাইরে এবং লকডাউন ঘোষণা হবে শুনেই হাওয়া। জানতে চাওয়া হলে নানা কথা। দ্রুত যোগদান করতে বলা হলে কান্নাকাটি, কীভাবে আসব ইত্যাদি। আচ্ছা তাহলে ছুটি কাটান, কারণ কর্মস্থলের বাইরে থেকে তো আর সব ক্ষেত্রে হোম অফিস সম্ভব নয়। যেই না বলা সেই না ফল, ছুটি কাটা যাবে শুনে এসে হাজির। মানুষের চরিত্র। হ্যাঁ, আগে ছুটিতে থাকায় লকডাউনে পড়ে আসলেই আটকা পড়েছেন এমন ঘটনাও আছে, তবে তা হাতে গোনা। তবে সব ছাপিয়ে মানবতার দায়িত্ব পালনকারীদের সংখ্যাই ভারী।

লকডাউনে কক্সবাজার শহরের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ, পর্যটক নেই, রাস্তার কুকুরগুলো ক্ষুধার্ত। মানুষ দেখলেই দৌড়ে আসে, আমরা ভয় পাই। গত বছর লকডাউনের সময় আমাদের সহকর্মী শাহ ভাইকে কুকুর কামড়ে মারাত্মক আহত করেছিল, কয়েকটা সেলাই দিতে হয়েছিল তাঁকে। সেই ভয় গেঁথে আছে মনের মধ্যে, পরে লক্ষ্য করলাম কুকুরগুলোর চোখে হিংস্রতা নেই, আছে মিনতি, যদি ওদেরকে একটু খাবার দেওয়া হয় সেই আকুতি। দু’দিন নিজে নিজে বাসার সামনের রাস্তার কুকুরদের খাবার দিতে গিয়ে আরেক বিপত্তি, ওরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়, আমাকে ঘিরে ধরে, দুই দল ঝগড়া শুরু করে। তরুণ সহকর্মীর সাথে যুক্ত হলাম ফিড দি ডগস প্রজেক্টে, নিজেরাই দাতা, নিজেরাই কর্মী। কলাতলী থেকে মেরিন ড্রাইভ রাস্তার প্রায় পঞ্চাশটা কুকুরকে খানিক খাবার দেওয়া হচ্ছে। ধন্যবাদ আমার সহকর্মী পলাশকে। সৈকতের ঘোড়াদের জন্যও কিছু করার চেষ্টা চলছে।

মানুষের ঘরেও তো খাবার নেই। কাজ নাই তাই। রিকশা চলে না, দোকান বন্ধ, রেস্টুরেন্ট বন্ধ, সৈকতে এটা সেটা বিক্রি করে চলা মানুষের আয় শূন্যে এসেছে ঠেকেছে। পর্যটন শহরে মানুষ না থাকলে স্থানীয়দের জীবিকা চলবে কিভাবে। অন্য জেলাগুলোতেও নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ প্রায় না খেয়ে আছে। সাধ্যমত কিছু করার চেষ্টা করি। আমি তো আর গায়ে খেটে দিতে পারছি না তাই বন্ধু তৃষ্ণার উদ্যোগে হাত বাড়াই। ছোট বোন রোমা শুরু করেছে বাচ্চাদের খাবার দেওয়া, সমুদ্রে এক বিন্দু শিশিরের মতো সেখানেও থাকি। কক্সবাজারে বৃহত্তর ময়মসিংহবাসীদের একটা গ্রুপ আছে, তারাও কিছু হতদরিদ্র্যের ঈদটা আনন্দময় করতে চান। সেখানেও আমরা সামিল হতে চাই। ঈশ্বর সাধ দিয়েছেন কিন্তু সামর্থ্য নেই। যাদের আছে তারা করেন নিশ্চয়ই।

আমি জানি আমার বন্ধু পরিচিতজনেরা সবাই নিজ নিজ সাধ্যমত করছেন। তবুও কত পরিবার ক্ষুধায় ঈদ কাটাবেন সে হিসাব আন্দাজ করতে পারি। বেদনার্ত হৃদয়ে মেনে নেওয়া ছাড়া আমার মতো অতি সামান্য মানুষের কতটা করার আছে।

ক্যাম্পে গিয়েছিলাম আজ, কেউ মাস্ক পরছে না, দূরত্ব বজায় রাখার তো প্রশ্নই আসে না। এত অল্প জায়গায় এত মানুষ। দুএকজনকে জিজ্ঞেস করি মাস্ক কেন পড়ছেন না, উত্তর পাই, “ন অইতো করোনা”। কেউ কেউ বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেন, যেন এইসব ঢঙের কথা শুনবার সময় নাই। লাজুক হেসে কেউ আবার পকেট থেকে মাস্ক বের করে নাকের নীচে ঝুলিয়ে দেন। চলছে জীবন সেখানে অন্যের দয়ায়। সেখানে শিশুদের চোখেও স্বপ্ন দেখি না, কিভাবে দেখবে তারা স্বপ্ন যেখানে প্রতিনিয়ত দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস। করোনা শুরু হবার পরে ক্যাম্পের ভিতরের লারনিং সেন্টারগুলো বন্ধ, শিক্ষার আলোর একটুখানি ঝলক ছিল সেটাও আর নাই এখন, কবে হবে কেউ জানে না। ঘিঞ্জি গায়ে গায়ে লাগা ঘরগুলোতে কেবল জৈব জীবনের প্রবাহ বয়ে চলেছে, রান্না খাওয়া কাপড় ধোয়া চলছে, বিয়ে হচ্ছে, সন্তান হচ্ছে, জৈব জীবন থেমে নেই। বেড়ে গেছে পারিবারিক সহিংসতা। যুদ্ধ হোক আর মহামারি, দিনশেষে নারীই  ভুক্তভোগী।

বাড়ি যাই না দুই মাস, মাকে দেখি না দুই মাস, মেয়েকে দেখি না...আহা বাড়ি। লকডাউনে পরিবহন বন্ধ, কক্সবাজার থেকে ফ্লাইট চলছে না। ছেলেকে দেখি না দুই বছর হয়ে গেল, ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট বন্ধ। হতাশা আসে মাঝে মাঝে, আবার ভাবি বেঁচে আছি সুস্থ আছি সবাই, নিয়মিত আয় আছে, ভ্যাকসিন পেয়েছি। তাতেই তো জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত আমার।

শরণার্থী শিবির ঘেঁষা এই শহরে একলা থাকেলও সহকর্মীরা আছেন, আকাশ আছে, আছে সমুদ্র। আর আছে কালো রঙের একটা ছোট্ট বেওয়ারিশ কুকুর, ওর নাম দিয়েছি আমি ভুলু, যে কিনা আমাকে ওর মা মনে করে। বের হওয়ার সাথে সাথে দৌড়ে আসে, গায়ে গা ঘেঁষতে চায়, হাত চেটে দিতে চায়, হাঁটতে গেলে সাথে আসে। কোনো কোনো মন খারাপের রাতে একটু বের হই সামনের রাস্তায়, ভুলু চুপচাপ আমার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী, কক্সবাজার, বাংলাদেশ

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন