বিজ্ঞাপন

সবটাই ছিল বাবুলের ‘অভিনয়’

May 12, 2021 | 6:28 pm

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: স্ত্রীকে খুনের খবর পেয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে অঝোরে কেঁদেছিলেন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। এমনকি কান্নায় ভেঙে পড়া বাবুল জানাজায় দাঁড়াতেও পারছিলেন না! তার চোখের জল আবেগাক্রান্ত করেছিল সহকর্মীদের, দেশের আপামর মানুষকেও। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বাবুল আক্তার। জঙ্গিদের টার্গেট হয়েছিলেন তিনি ও তার পরিবার— এমন আলোচনাও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার ফেসবুকে স্ত্রী হারানোর বিয়োগব্যাথা নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাসও দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ঘটনার পাঁচ বছরের মাথায় এসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উঠে এসেছে— সবটাই ছিল বাবুল আক্তারের অভিনয়! হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাবুল নিজেই। তার শ্বশুর থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করেছেন, জনৈক এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের জেরে দাম্পত্য কলহ থেকে বাবুল নিজেই তার স্ত্রীকে খুনের পরিকল্পনা করেন ও নির্দেশ দেন। আর পিবিআই বলছে, তিন লাখ টাকায় খুনি ভাড়া করে বাবুল আক্তার এই হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করেন।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ও আর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয় মাহমুদা খানম মিতুকে। স্ত্রীকে খুনের ঘটনায় পুলিশ সদর দফতরের তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা নাটকীয়তার পর ওই বছরের আগস্টে বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

সবটাই ছিল বাবুলের ‘অভিনয়’

বিজ্ঞাপন

হত্যাকাণ্ডের পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে মিতুর বাবার মোশাররফ হোসেন প্রথম এই খুনে বাবুলের জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাবুল যা করেছেন সবটাই ছিল তার অভিনয়।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাত ঘুরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলার তদন্তভার পড়ে পিবিআইয়ের ওপর। এরপর আস্তে আস্তে জট খুলতে থাকে দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলা চাঞ্চল্যকর এই মামলার। মঙ্গলবার (১১ মে) বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। তদন্তে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের লক্ষ্যে বুধবার ওই মামলার ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পিবিআই।

বিজ্ঞাপন

এরপর বুধবার দুপুরে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারসহ আট জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার বাকি সাত আসামি হলেন— মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক প্রকাশ হানিফুল হক প্রকাশ ভোলাইয়া, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু, মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার সাক্কু ও শাহজাহান মিয়া।

বিজ্ঞাপন
সবটাই ছিল বাবুলের ‘অভিনয়’

যেভাবে প্রকাশ পেল বাবুলের সম্পৃক্ততা

বাবুল আক্তারের পূর্বপরিচিত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল হক। মঙ্গলবার (১১ মে) সাইফুল হক ও গাজী আল মামুন নামে আরেক ব্যক্তি চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফীউদ্দিনের আদালতে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে সাইফুল হক জানিয়েছেন, মিতু হত্যার তিন দিন পর তিনি বাবুল আক্তারের নির্দেশে গাজী আল মামুনের মাধ্যমে মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসাকে তিন লাখ টাকা দেন। গাজী আল মামুন সেই মুসার আত্মীয়। মামুনও জবানবন্দি দিয়ে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

মূলত এই টাকা লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পরই পিবিআই নিশ্চিত হয়, মিতুকে হত্যার জন্যই মূলত এই তিন লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় এটি ছিল একটি কন্ট্রাক্ট কিলিং।

পিবিআই, চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাইফুল হকের মাধ্যমে বাবুল আক্তার তিন লাখ টাকা পাঠান। মুসার আত্মীয় গাজী আল মামুনের মাধ্যমে সাইফুল তাকে টাকাগুলো দেন। বিকাশের মাধ্যমে এই টাকা লেনদেন হয়েছে। বিকাশের লেনদেনের স্লিপ আমরা উদ্ধার করেছি। আমরা তদন্তে এটা নিশ্চিত হয়েছি যে হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার তার পূর্বের কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) অনুযায়ী টাকাগুলো মুসার কাছে পাঠিয়েছেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা তো শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সন্দেহভাজন। পরে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া গেছে। আবার মুসা ছিলেন বাবুল আক্তারের সোর্স। অথচ হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের পর্যায়ে বাবুল আক্তার দাবি করেছিলেন, মুসাকে তিনি চেনেন না। কিন্তু এখন প্রকাশ হচ্ছে, স্ত্রী হত্যার তিন দিন পর তিনি মুসার কাছে টাকা পাঠিয়েছিলেন। সব তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’

বুধবার সকালে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারও এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সাইফুল ও মামুনের জবানবন্দির পরই মূলত বাবুল আক্তারের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া বাবুল আক্তার শুরু থেকে তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সবটাই ছিল বাবুলের ‘অভিনয়’

“ঘটনাস্থলের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সিসিটিভির ফুটেজে একজনকে দেখা গিয়েছিল। পরে জানা যায় সে বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ কামরুল ইসলাম সিকদার মুসা। ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট মুসাকে চেনা গেছে। কিন্তু তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে মুসাকে নিয়ে বাবুল আক্তার কোনো সন্দেহের কথা বলেনি। পরে আমরা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছি যে বাবুল আক্তার ইচ্ছাকৃতভাবে তার ব্যক্তিগত সোর্স মুসাকে নিয়ে পুলিশকে কিছু জানায়নি,’— বলেন পিবিআই প্রধান।

বাবুল আক্তার জঙ্গিদের সন্দেহ করার মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন জানিয়ে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে আহত হওয়ার কথা বলেছিলেন বাবুল। সে কারণে তিনি যখন স্ত্রী হত্যায় জঙ্গিদের জড়িত থাকার সন্দেহের কথা বলেছিলেন, তখন পুলিশ সেটা বিশ্বাস করেছে। আবার স্ত্রী নিহতের পর উনি আপনজন হারানোর মতোই আচরণ করেছেন। তার কথা তখন সবাই বিশ্বাস করেছিলেন।’

‘অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে’

পাঁচলাইশ থানায় দায়ের করা মামলায় মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেছেন, কক্সবাজারে কর্মরত থাকাকালীন বাবুল আক্তার এনজিও কর্মকর্তা ভারতীয় নাগরিক গায়ত্রী অমর শিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। বিষয়টি জেনে যাওয়ার পর মিতুর সঙ্গে তার দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। এর জেরে বাবুল আক্তাকে তাকে খুনের পরিকল্পনা করেন এবং সহযোগীদের নির্দেশ দিয়ে মিতুকে খুন করান।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বাবুল আক্তার কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকার সময় গায়ত্রী ইউএনএইচসিআরের ফিল্ড অফিসার (প্রটেকশন) হিসেবে সেখানে কর্মরত ছিলেন। তখন বাবুল আক্তার গায়ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাবুল আক্তার সুদানে মিশনে ছিলেন। তখন তার মোবাইল রেখে যান বাসায়। গায়ত্রী ওই মোবাইল নম্বরে বিভিন্ন সময়ে ২৯টি মেসেজ পাঠান। মেসেজগুলো মিতু তার ব্যবহৃত একটি খাতায় লিখে রাখেন। হত্যাকাণ্ডের কয়েকমাস আগে বাবুল আক্তার চীনে যান প্রশিক্ষণের জন্য। তখন বাবুল আক্তারকে গায়ত্রীর উপহার দেওয়া ‘তালিবান’ ও ‘বেস্ট কেপ্ট সিক্রেট’ নামে দু’টি বই পান মিতু। তালিবান বইয়ের তৃতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে— 05/10/13, Coxsbazar, Bangladesh. Hope the memory of my offering you this personal gift, shall etarnalize our wonderful bound, love you, Gaitree.

সবটাই ছিল বাবুলের ‘অভিনয়’

একই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা ২৭৬ নম্বরের পরের পাতায় বাবুল আক্তারের নিজের হাতে লেখা আছে গায়ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা। এজাহারে উল্লেখ আছে, ‘সেখানে লেখা আছে— ‘First meet: 11 Sept, 2013, First PR in Cox. 07 Oct 2013. G Birth Day, 10 October, First (----) 05 Oct 2013; First beach walk: 8th Oct, 2013, 11 Oct 2013, Marmaid with family, 12 Oct 013, Temple Ramu Prayed Together, 13 Oct 2013; Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk.’ এছাড়া ‘বেস্ট কেপ্ট সিক্রেট’ বইটির প্রথম দিকের দ্বিতীয় পাতায় গায়েত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে “‘5/10/2013; with my sincere love.’ Yours Gaitree.”

মোশাররফ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রথমে বাবুল আক্তারের মোবাইলে গায়ত্রীর মেসেজ পায় আমার মেয়ে। এরপর দু’টি বইয়েও নানা কথাবার্তা দেখতে পায়। তখন তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ-অশান্তি চরমে ওঠে। বাবুল তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। মিতু বেশ কয়েকবার আমাদের বিষয়গুলো জানিয়েছিল।’

হত্যাকাণ্ডের পর শুরুতে বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনেননি কেন— জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরাও সবার মতো বাবুল আক্তারকে বিশ্বাস করেছিলাম। সে খুন করতে পারে— এটা প্রথমে ভাবতেই পারিনি। আর যেহেতু একটি মামলা দায়ের হয়েছিল, একই ঘটনায় তো দু’টি মামলা হতে পারে না। সেজন্য আমি তখন মামলা করতে পারিনি। এখন তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই আমাকে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তারা আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। আইনে বলা আছে, কোনো মামলায় ঘটনার সঙ্গে বাদীর জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে হয়তো সুয়ামোটো মামলা করতে পারে পুলিশ, অথবা বিচারপ্রার্থী স্বজন করতে পারে। সে হিসেবে আমি মামলা করেছি।’

পিবিআইয়ের তদন্তে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি ‍উঠে আসায় ‘স্বস্ত্বিবোধ’ করছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিবিআই, চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান সারাাবংলাকে বলেন, ‘এ সংক্রান্ত কিছু ডক্যুমেন্ট আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। এটাই এই হত্যাকাণ্ডের মূল ফ্যাক্ট। মূল মোটিভ কিন্তু এটাই। আমরা সার্বিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখব।’

সারাবাংলা/আরডি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন