বিজ্ঞাপন

স্বপ্নের আন্তক্ষরি

May 14, 2021 | 12:26 pm

রয় অঞ্জন

স্বপ্ন আমি দেখি না অনেকবছর। অবশ্য গত ৫-৬ মাস ধরে মাঝে মাঝে বাবাকে দেখি। গল্প করি, হুইল চেয়ার ঠেলি, খাই, একদিন তো বাবাকে কোলে নিয়ে রিকশায় ঘুরেছি শহরজুড়ে, বাবা যেন শিমুল তুলোর একটা পুতুল। এছাড়া স্বপ্ন-টপ্ন আমার খুব একটা আসে না। এক ঘুমে রাত কাবার। অনেকবছর আগে প্রতিরাতেই স্বপ্ন দেখতাম, সেই থেকেই ভূত-প্রেত, দত্যি- দানবের সাথে আমার মাখামাখি। মনে পড়ে ছোট বেলায় ‘দৈত্য রাজের গুপ্ত কথা’ বইটা পড়ে পড়ে মনের ভিতরে দৈত্য-দানব, অসুর, রাক্ষস, খোক্ষসের বাসা হয়েছে। ঘুমানোর আগে বালিশে তিন টোক্কা আর চিরকুটে “মা” লিখে খোলের ভিতর ঢুকিয়ে রাখার দাওয়াইতেই ভূত-প্রেতের সাথে আড়ি হয়েছে একদিনেই।

বিজ্ঞাপন

দেশে এখন অতিমারি, আজ এখানে কাল ওখানে, আজ এপাড়ায়-কাল ওপাড়ায়, আজ এর বাবা, কাল ওর ভাই মারা যাবার খবর পাই শুধু। তার উপরে বোঝার উপরে শাঁকের আঁটির মত বন্ধু মেসবাহর লাইভ দেখলাম বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে। কত বড় নির্বোধ আর গোঁয়ার জাত আমরা, মাস্ক না পরার অপরাধে ম্যাজিস্ট্রেট অর্থদন্ড দিচ্ছেন জনে জনে! বাপরে, তুই নিজে যদি একটু ভর না করিস, দূর্গা মা কি করে পার করবেন তোকে! তোরা তো আবার উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে দিতে ওস্তাদ! সারাদিনই এসব ছিল ভাবনায়।

কাল স্বপ্ন দেখলাম, একেবারে পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমার মত। এক ঝোলা মাস্ক কিনলাম, বিনামূল্যে বিতরণ করব আর কয়টা সচেতনমূলক বক্তব্য দেব বলে। যেখানে যাকে পাই, তাকেই দেব, চাইলে বাড়ির বউ-বাচ্চার জন্যও দেব, তবুও মাস্ক পর। কি যেন একটা মার্কেটের গেটে গেলাম, কাঁধে মাস্কের ঝোলা। লোকজনের ভিড় বেশ। এখানেই শুরু ভেবে যেই না পা বাড়িয়েছি, উর্দি পরা কয়েকজন এসে সামনে দাঁড়ালো। একজনের তো ইয়া বড় গোফঁ, লিকলিকে শরীর। বুঝলাম গোঁফের কারণেই চাকরিটা হয়েছে দৈবারিক সাহেবের। শরীরে জোরের চেয়ে গলার জোর বেশ চড়া। ‘এই মিয়া এহানে কেন? ফুটপাতে বহ, দেখ না, লেখা আছে মার্কেটে হকার প্রবেশ নিষেধ, ও ফুটে বইলে টু পাইস দিতে হইব মনে কইরা ফাঁকতাল মারতে আইছো! ফুটো মিয়া”। অনেক অনুনয়- বিনয় করেও গোঁফওয়ালাকে আমার হাতেমতাই হবার ইচ্ছেটা বোঝাতে পারলাম না, বেরিয়ে এলাম। মাথার উপরে তাওয়া গরম সূর্য, তবুও দমি না আমি। হাঁটছি আবার, হয়তো অন্য কোথাও বিলাবো কাঁধের বোঝা।

বিজ্ঞাপন

শরবতের দোকান, কাঁচের বাক্সের ভিতরে বেদানা, আপেলের টুকরো, মাল্টার কাটপিছ ভাসছে একিউরিয়ামের রঙ্গিন মাছের মতো। কয়েক টুকরো বরফের সাঁতার কাটা দেখে টাইটানিকের বরফের চাঁই এর কথা মনে হলো। দেখতে ভদ্রোচিত ক’জন গোল হয়ে গিলছে, গ্লাসে গ্লাসে হুড়োহুড়ি। মায় খেয়ে ঝিকে দিচ্ছে। শিউরে উঠলাম, কারো মুখে মাস্ক নাই! ভাবলাম, ভদ্ররা হয়ত ভদ্রতা বুঝবেন। এগিয়ে গিয়ে যেই না প্রথম মাস্কটা বাচ্চা মেয়েটাকে দিলাম, “বাবু, এখন তো খারাপ সময়, মাস্ক ছাড়া বের হবে না, কেমন? পাগলে ধরে নিয়ে যাবে” অমনি খেঁকিয়ে উঠলো তার মা বা দিদি যে কেউই হতে পারেন। আজকাল তো বয়স ঠাওর করা দুস্কর। “ঐ মিয়া, মাস্ক লাগবো না, ম্যালা মাস্ক নিয়া বাইর হইছি, ব্যাগে আছে, অন্য জায়গায় বেঁচেন”। কাঁচুমাঁচু হয়ে বললাম, “আপু আমি বেঁচি না, কাঁধে যা দেখছেন, সব বিনা মূল্যে বিলাবো বলেই বেরিয়েছি আজ”। পাশে থেকে আরেকজন লাফিয়ে উঠলেন, ‘ আপা একদম ধরবা না এসব, ইউটিউবে দেখছি, মাস্কের মধ্যে অজ্ঞান করার ওষুধ দেওয়া থাকে, একবার অজ্ঞান হলে কেল্লাফতে, ডাক্তারের বাপেও বাঁচাইতে পারবো না, ওই মিয়া তুমি যাইবা? নাকি পুলিশ ডাকুম, আমাগোরে ব্যক্কল পাইছো?” ফিরে এলাম, কিন্তু দমলাম না। আরেকটু এগোলাম।

চটে ঘেরা একটা দোকান, ভেতর থেকে গরম ভাপ বের হচ্ছে। বুঝলাম চায়ের দোকান। উঁকি দিয়ে দেখলাম চাচার বয়সী দোকানীর কপালের ঘাম কেতলিতে পড়ছে টুপটাপ। তার চেয়ে বেশি ঘামছেন যারা ভেতরে বসে চা খাচ্ছেন আর বিড়ি টানছেন। চটের ঘরটা এয়ারপোর্টের স্মোকিং জোনের মত লাগলো। নানান পদের টোবাকো স্মেল মিশে একটা অন্য রকম ফ্লেভার। দোকানী চাচাকে বুঝিয়ে বললাম,
- চাচা, আমার ব্যাগে অনেক মাস্ক, পাবলিকরে ফ্রি তে দেব, একটা টুল দেন না, বসে বসে মাস্ক বিলাই, সব্বাইরে দেব।
- কেমন একটা অবিশ্বাসী চোখে তাকালেন- ধান্ধাটা কী?
- না না চাচা, কিচ্ছু না, পাবলিকরে সচেতন করি।
- বয়স তোমার চেয়ে কম হলেও এই ফুটে কিন্তু আমি পোন্র বছর। বহুত দেখছি।
- চাচা, এক বান্ডিল আগে আপনরে দেই? নিজেও লাগান, বাসার জন্যও নিয়ে যান। আর চটের মধ্যে একটা কাগজ লাগিয়ে দেই, “মাস্ক পরবেন না , চা পাইবেন না, চা খাইলে মাস্ক ফ্রি”। কেমন হয়?
দোকানীর চোখ চকচক করে উঠলো, ক’পাটি দাঁত বের করে বললেন- বাজান, রোজা? এক কাপ চা খাইবেন? মালাই দিয়া দেই? ঘাইম্মা গেছেন, আমার ঠান্ডার মেশিনডা নষ্ট, এক গ্লাস ফিল্টার পানি দেই? পইসা লাগবো না। “বলেই চা-পানি হাজির করলেন, একটা পরিস্কার ন্যাকড়া নিয়ে কাঠের টুলটা মুছে দিয়ে বললেন, চা খাইয়া কামে লাইজ্ঞা পড়েন। দেখলেই বুঝা যায়, আপনে ভালা ঘরের মানুষ। আমার কাজে বসে গেলাম, মোটা হরফে কাগজে লিখে দিলাম -

বিজ্ঞাপন

“মাস্ক পরবেন না , চা পাইবেন না, “
“চা খাইলে মাস্ক ফ্রি”

“পরিবেশ রক্ষা করুন, আবর্জনা এখানে ফেলুন”

বিজ্ঞাপন

আরেকটা কাগজে লিখে ময়লা ফেলার ড্রামটার গায়ে ঝুলিয়ে দিয়ে বসে পড়লাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই আমি হাতেমতাই হয়ে গেলাম, সবার নাকে-মুখে আমার দেওয়া মাস্ক, বেশ ভাল লাগল, অন্তত সচেতন লোভী মানুষদের দেখে।

পায়ের কাছে বসে থাকা বাচ্চা বেড়ালটার আহ্লাদী নখ আঁচড়ানোতে ঘুমটা ভেংগে গেল, স্বপ্নটাও টুটে গেল, দোকানী চাচার দোকানে ভিড় লেগেছিল কি না মনে করতে পারলাম না আর। আচ্ছা, আন্তক্ষরীর মত স্বপ্নের পরে বাস্তব জোড়া লাগিয়ে গল্প লেখা যায় না! যায় কি? তবে না হয় এরপর থেকে একটা সচেতন জাতির গল্প লিখি? লিখবো হয়ত।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন