বিজ্ঞাপন

পল্লী উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ

May 14, 2021 | 6:23 pm

শুভজিত বিশ্বাস

“ধনের ধর্ম অসাম্য। ধনকামী নিজের গরজে দারিদ্র সৃষ্টি করিয়া থাকে”

বিজ্ঞাপন

ঠিক এভাবেই দরিদ্রতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে চিরায়ত জমিদারী ব্যাবস্থার বৃত্ত ভেঙ্গে এক নতুন জমিদারী ব্যাবস্থা শুরু করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  তাই ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি লিখেছেন, –

“জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়, চাষির”

বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথ নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দীর্ঘদেহী লম্বা চুল দাড়িওয়ালা একজন নিরেট ভদ্র মানুষ, যার সাহিত্য আমদের মনের গহিনে এক নির্মল স্রোতধারা বইয়ে দেয়। যেন নীপবন হাতছানি দিয়ে ডাকে নবধারা জলে স্নান করার জন্য।

কোমল হৃদয়ের রবীন্দ্রনাথকে পারিবারিক প্রয়োজনেই জমিদারীর দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। কিন্তু জমিদারীর দায়িত্ব নিয়েই তিনি চিরায়ত প্রথার বৃত্ত ভেঙ্গে মানবিক জমিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাঁর অভিষেক অনুষ্ঠান পুণ্যাহের মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন

‘জমিদার রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থের অমিতাভ চৌধুরী লিখেছেন, –

“প্রিন্স দ্বারকানাথের আমল থেকে সম্ভ্রম ও জাতিবর্ণ অনুযায়ী পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে থাকে বিভিন্ন আসনের বন্দোবস্ত। হিন্দুরা চাদর ঢাকা শতরঞ্জির উপর একধারে, তার মধ্যে ব্রাহ্মনের স্থান আলাদা এবং চাদর ছাড়া শতরঞ্জির উপর মুসলমান প্রজারা অন্যধারে। সদর ও অন্য কাছারির কর্মচারীরাও নিজ নিজ পদমর্যাদা মতো বসেন পৃথক আসনে। আর বাবুমশায়ের জন্য ভেলভেটে মোড়া সিংহাসন”।

বিজ্ঞাপন

সেদিনও ঠিক সেই ভাবেই শুরু হয়েছিল পুণ্যাহ অনুষ্ঠান। নতুন জমিদার পেয়ে কাছারি মুখরিত। পুরোহিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কপালে পরিয়ে দিলেন চন্দনের তিলক। তিনি তখন দেবেন নতুন কাপড়, মৎস্য, দধি, দক্ষিণা। শুরু হবে প্রজাদের করদান পর্ব।

কিন্তু একি! বেঁকে বসলেন তরুণ জমিদার রবীন্দ্রনাথ! বললেন এইভাবে পুণ্যাহ উৎসব চলবে না। তিনি সবার মাঝে বসতে চান।

বিজ্ঞাপন

নায়েব গোমস্তারা জানালেন দ্বারকানাথের আমল থেকেই এই পৃথক বসার ব্যবস্থা। জমিদারের সিংহাসনে বসার কথা। নায়েব গোমস্তারা বসবেন চেয়ারে। প্রজারা জাতিভেদ অনুসারে পৃথক পৃথক আসনে মাটিতে।

রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, – “এমন পৃথক ব্যবস্থা কেন”?

জানানো হল, – “এই প্রথাই চলে আসছে”।

রবীন্দ্রনাথের জবাব, – “শুভ অনুষ্ঠানে এ জিনিস চলবে না। সব আসন তুলে দিতে হবে। হিন্দু মুসলমান, ব্রাহ্মণ চণ্ডাল, সবাইকে একই ভাবে একই আসনে বসতে হবে। প্রাচীন প্রথা আমি বুঝি না। সবার একাসন করতে হবে। জমিদার হিসেবে এই আমার প্রথম হুকুম”।

জমিদারির সম্ভ্রম আর প্রাচীন প্রথায় আস্থাবান নাবিকেরা ঘোষণা করলেন সকলে একযোগে পদত্যাগ করবেন।

টলানো গেল না নবীন জমিদারকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় প্রজাদের উদ্দেশ্যে বললেন – “তোমরা পৃথক আসন সব সরিয়ে দাও। একসাথে বস। আমিও বসব। আমি তোমাদেরই লোক”।

হ্যাঁ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ সকলেরই লোক হতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি দয়ালু জমিদার রূপে নিজেকে জাহির করেন নি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল প্রজাদের স্বাবলম্বী করা, আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ করা, তাদেরকে ভুমিলক্ষীর আরাধনায় জয়যুক্ত করা। তিনি বুঝেছিলেন ভিক্ষা দিয়ে মনুষ্যত্ব জাগানো যায় না, – তাই তিনি প্রজাদের ডেকে বলতেন, – “তোমাদের ভালো একমাত্র তোমরা নিজেরাই করতে পার। যে কাজ একা করতে পারবে না। যে কাজ পাঁচ জনের উপকারে লাগব, সে কাজ তোমরা একত্রে মিলেমিশে কর। দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ”।

প্রজাদের স্বাবলম্বী করার লক্ষে তিনি পল্লী উন্নয়নের নানা কর্মসূচী হাতে নেন। তিনি ছিলেন দূরদর্শী। তিনি জানতেন পল্লী উন্নয়নের জন্য দরকার কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। দরকার বিজ্ঞান ভিত্তিক চাষাবাদ।

১৯০৯ সালে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরা বিদেশ থেকে ফিরে শুরু করলেন বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ, সার, পাম্প ইত্যাদির ব্যবহার। সেই সাথে শিলাইদহ কুঠিবাড়ির ৮০ বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠা করলেন দেশের প্রথম কৃষি গবেষণাগার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে কৃষিবিজ্ঞানী না হলেও কৃষির উন্নতি ও কৃষির পরীক্ষা নিরীক্ষায় এত উৎসাহী ও আগ্রহশীল ছিলেন যে পরবর্তীকালে তিনি ক্যানিংএ ডেনিয়াল হ্যমিলটন সাহেবের কৃষিক্ষেত্র ও গবেষণাগার নিজে চোখে দেখে আসেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে প্রথম ১৯১০ সালে পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করেন সেচ কাজে। সেই সাথে উচ্চ ফলনশীল বীজের মাধ্যমে চাষাবাদ শুরু করেন । জমি উর্বর করার জন্য রথীন্দ্রনাথের সাথে পরামর্শ করে জেলেদের থেকে কিনে নিতেন নৌকা বোঝাই সস্তার ইলিশ মাছ এবং সেই মাছে চুন দিয়ে মাটিতে পুঁতে রেখে তৈরি করা হত চাষের উপযোগী জৈব সার।

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় শিলাইদহে প্রথম ব্যবহার হয় রাশিয়া থেকে আনা ট্রাক্টর। প্রথম দিন ট্রাক্টর চালাবার সময় শুধু ট্রাক্টর দেখতেই হাজির হয়েছিল হাজার হাজার গ্রামবাসী।

পরবর্তীতে গ্রামবাসীরাও শুরু করেন ট্রাক্টর এর মাধ্যমে চাষের কাজ। কাছারি থেকে ট্রাক্টর পাওয়া যেত একরকম বিনামুল্যে। শুধু মেরামতি এবং চালকের খরচ বাবদ বিঘে প্রতি একটাকা করে আদায় করা হত। এই পদ্ধতি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রাশিয়া থেকে আরও ১২টি ট্রাক্টর আনান।

পল্লী গ্রামে জমিদারী করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন কৃষকের উপর ঋণের খড়গ। মহাজনের উচ্চ সুদের ঋণের কারণে কিভাবে গরিব কৃষকেরা খতিগ্রস্ত হয়। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এই ঋণ ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে না পারলে পল্লী উন্নয়নে তাঁর সকল উদ্যোগই ব্যর্থ হবে।

গ্রামের দরিদ্র প্রজাদের কষ্ট লাঘব করতে ১৮৯৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে প্রথম কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। এই ব্যাংক সম্পর্কে সুধীর সেন তার ‘Rabindranath Tagore on Rural Reconstruction’ গ্রন্থে লিখেছেন, – “Shilaidaha in the district of Nadia was selected as the center of his experience. A part of nucleus for rural work was already available there. An Agricultural Bank had been founded (in 1893-94) to advance loans particularly seasonal to the cultivators on reasonable rates of interest.

পরবর্তীতে শুধুমাত্র কৃষি কাজে ঋণ দেওয়ার জন্য ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক’। এই ব্যাংক স্বল্প সুদে গ্রামের গরীব চাষিদের মধ্যে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে মহাজনদের কাছ থেকে চাষিদের মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

রবীন্দ্রনাথ এসকল ব্যাংকের মূলধন সংগ্রহ করেন তাঁর ধনী বন্ধুদের থেকে ধার করে। কিন্তু ১৯১৩ সালে কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন। এতে করে ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি পায় এবং কৃষকদের মধ্যে ঋণ প্রদান সুনিশ্চিত হয়।

সারাবাংলা/এসএসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন