বিজ্ঞাপন

আপিলে ঝুলে আছে প্রাইমারির দফতরিদের চাকরি

June 11, 2021 | 1:49 pm

কামরুল ইসলাম ফকির, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দফতরি কাম প্রহরীদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দুই বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে আছে। হাইকোর্টে রিট করে নিজেদের পক্ষে রায় পেয়েও রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কারণে সেই রায়ের বাস্তবায়ন পাননি তারা। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাদের।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না বাড়ায় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে হাইকোর্টে ছয়টি রিট দায়ের করেন দেশের বিভিন্ন জেলার ৯৩২ জন দফতরি কাম প্রহরী। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দফতরি কাম প্রহরীদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল আবেদন এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

ভুক্তভোগী দফতরিরা চান হাইকোর্টের রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন। আর রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, নিয়ম অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার গোপীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দফতরি কাম প্রহরী পদে কাজ করেন আছাদুল ইসলাম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘স্কুলে আমরা নানা ধরনের কাজ করে থাকি। কিন্তু সেই অনুযায়ী বেতন পাই না। রাতদিন কাজ করলেও আট বছর ধরে একই বেতন-ভাতা পেয়ে আসছি। আমাদের বহু কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। হাইকোর্ট আমাদের চাকরি জাতীয়করণ করতে বলেছেন। কিন্তু সরকার রায় বাস্তবায়ন করছে না। দ্রুত আমাদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি জানাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্থাপনা, ভবন, মেশিনারিজ, ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও ইক্যুইপমেন্টের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় বিবেচনা করে ২০১২ সালে দফতরি কাম প্রহরী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তবে ২০১২ সালের আগে দেশের ৬৮৪টি বিদ্যালয়ের জন্য রাজস্ব খাতে সমসংখ্যক পদ সৃষ্টি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এরপর ২০১২ সালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দেশের ৬৫ হাজার ৫২৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৪ হাজার ৮৪৩টি বিদ্যালয়ে দফতরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য প্রথম পর্যায়ে ৩৬ হাজার ৯৮৮টি পদ সৃষ্টি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তার মধ্যে প্রথম ধাপে ২২ হাজার ৯২৫টি ও পরবর্তী সময়ে আরও ৪৯২০টি দফতরি কাম প্রহরী পদে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রথমে তারা সর্বসাকুল্যে সাত হাজার টাকা বেতন-ভাতা পেতেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে সরকার ঘোষিত অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হওয়ায় তাদের বেতন-ভাতা বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৪৫০ টাকা। তবে এরপর আর তাদের বেতন বাড়েনি।

দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি না হওয়া এবং অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কারণে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে হাইকোর্টে পৃথক ছয়টি রিট করা হয়। ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্মচারী কল্যাণ সমিতির’ সভাপতি সাধন চন্দ্র বাড়ৈসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ৯৩২ জন দফতরি কাম প্রহরী এ সব রিট দায়ের করেন।

বিজ্ঞাপন

২০১৭ ও ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে এসব রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে দফতরি কাম প্রহরীদের চাকরি কেন রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা হবে না এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দফতরি কাম প্রহরী পদে জনবল নিয়োগের নীতিমালা-২০১২ সংশোধনে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চান হাইকোর্ট।

পরে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্টের একই বেঞ্চ রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন। রায়ে দফতরি কাম প্রহরীদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে দফতরি কাম প্রহরী পদে জনবল নিয়োগের নীতিমালা-২০১২ এর কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, আইনজীবী দেওয়ান মো. আবু ওবায়েদ হোসেন ও নাছির উদ্দিন খান সম্রাট। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সাইফুল আলম।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে। চেম্বার আদালত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে তা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। এরপর আপিল বিভাগে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনটি এখন আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন মোল্লা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ২০১৩ সাল থেকে একই বেতন-ভাতায় চাকরি করে আসছি। গত আট বছরে আমাদের বেতন-ভাতা বাড়েনি। দফতরি কাম প্রহরীদের সুযোগ-সুবিধা না বাড়ার কারণে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। উচ্চ আদালত এই পদে নিয়োজিতদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন।’

চাকরি সরকারিকরণের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন. ‘হাইকোর্ট দফতরি ও প্রহরী পদে আলাদা আলাদাভাবে লোক নিয়োগ দিতে বলেছেন। আদালতের রায় মেনে সরকার শিগগিরেই আমাদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করবে, এটিই আমাদের দাবি। পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা খেয়ে পরে বাঁচতে চাই।’

এ বিষয়ে রিটকারীদের আইনজীবী দেওয়ার মো. আবু ওবায়েদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আদালত রায়ে বলেছেন একসঙ্গে দফতরি ও নাইট গার্ড (প্রহরী) পদে চাকরি করা যাবে না। দিনের বেলায় দফতরি আর রাতে নাইট গার্ডের দায়িত্ব পালন করা দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান সমর্থন করে না। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী কাউকে দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। বাংলাদেশের সার্ভিস রুলস অনুযায়ীও কাউকে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। কাউকে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করালে তাকে ওভারটাইম দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট একইসঙ্গে দফতরিদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে চেম্বার আদালত রায় স্থগিত করেন। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আর শুনানি হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন এখন আপিল বিভাগে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ।’

দফতরিদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা উচিত উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, ‘আট বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দফতরিরা একই বেতন-ভাতায় কাজ করে আসছেন। তাদের কোনো সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। তাই আমি মনে করি দফতরিদের পরিবার-পরিজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা উচিত।’

জানতে চাইলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাসান চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপিল বিভাগ ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার আপিল শুনানিও ভার্চুয়ালি হচ্ছে না। শারীরিক উপস্থিতিতে আপিল বিভাগে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে তখন ধারাবাহিকভাবে আপিল মামলার শুনানি শুরু হবে। তখন এই মামলাসহ অন্যান্য মামলাগুলো স্বাভাবিক নিয়মে কার্যতালিকায় আসবে।’

সারাবাংলা/কেআইএফ/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন