বিজ্ঞাপন

মাস্টারশেফে পান্তা-আলু ভাতেই বাজিমাত কিশোয়ারের

July 12, 2021 | 8:58 pm

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি হিসেবে রান্না বিষয়ক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার গ্র্যান্ড ফিনালেতে জায়গা করে নিয়েছেন কিশোয়ার চৌধুরী। দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে দেশি সব রান্না তুলে ধরে গোটা প্রতিযোগিতাতেই একের পর এক চমক উপহার দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখেছেন গ্র্যান্ড ফিনালেতেও। সেখানে রীতিমতো পান্তা ভাত আর আলু ভর্তার সঙ্গে সার্ডিন মাছের ভাজি আর পেঁয়াজ-কাঁচা মরিচের সালাদের একটি ডিশ হাজির করেছেন। তাতেই বাজিমাত! পান্তা-আলু ভাতে রীতিমতো চমৎকৃত তিন বিচারক— অ্যান্ডি অ্যালেন, মেলিসা লিওং ও জক জনফ্রিলো। তারা এতটাই বিমোহিত যে এই রান্নার জন্য দিয়েছেন পারফেক্ট টেন! তিন বিচারকের কাছে ৩০ নম্বরের মধ্যে ৩০ নম্বরই অর্জন করে নিয়েছেন কিশোয়ার। গ্র্যান্ড ফিনালে জয় করে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথেও একধাপ এগিয়ে গেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের মাস্টারশেফ আসরগুলোর মধ্যে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মনে করা হয় মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়াকে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই আসরে দেশীয় বিভিন্ন রান্নাকেই মাস্টারশেফে পরিবেশন করে একের পর এক ধাপ পেরিয়েছেন কিশোয়ার। গত ৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত দুই পর্বের প্রতিযোগিতা শেষে স্থান করে নিয়েছেন গ্র্যান্ড ফিনালেতে। চূড়ান্ত এই পর্বে তার বাকি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার ক্যাম্পবেল ও জাস্টিন নারায়ণ। এই তিন জনেরই একজনের মাথায় শোভা পাবে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ১৩তম এই আসরের সেরা প্রতিযোগীর মুকুট।

এবারের আসরের গ্র্যান্ড ফিনালেকে ভাগ করা হয়েছে দুইটি এপিসোডে। এর মধ্যে সোমবার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ সময় বিকেলে প্রথম পর্বটি প্রচারিত হয়েছে। এই পর্বে প্রতিযোগীরা মাস্টারশেফ কিচেনে ঢুকতেই জানিয়ে দেওয়া হয়, প্রতিযোগিতা হবে তিনটি রাউন্ডে। এর মধ্যে প্রথম এপিসোডে ছিল দুইটি রাউন্ড। এর মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ডেই পান্তা-আলু ভাতে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন কিশোয়ার। দ্বিতীয় এপিসোডে প্রেশার টেস্টের মাধ্যমে শেষ হবে দীর্ঘ এই প্রতিযোগিতা। তিন রাউন্ড মিলিয়ে মোট পয়েন্ট থাকছে ১৪০।

বিজ্ঞাপন

প্রথম রাউন্ডে মিস্ট্রি বক্স

গ্র্যান্ড ফিনালের প্রথম রাউন্ডে ছিল মিস্ট্রি বক্স চ্যালেঞ্জ। এ মৌসুমের বিভিন্ন পর্বে অতিথি বিচারক হয়ে আসা বিশ্বখ্যাত শেফরা একটি করে উপকরণ রেখেছিলেন এই মিস্ট্রি বক্সে। নিয়মিত তিন বিচারকের পাশাপাশি অতিথি এসব বিচারকদেরও সন্তুষ্ট করার শর্ত ছিল প্রতিযোগীদের জন্য। এ রাউন্ডে বাংলাদেশের মেয়ে কিশোয়ার চৌধুরী এবারের আসরে অংশ নিয়ে যেসব চমৎকার রন্ধন কৌশল শিখেছেন, সেগুলো দেখাবেন বলে ঠিক করেন। কিশোয়ার চৌধুরী শুরুতেই এমন একটি ডিশ বেছে নিলেন, যেটি নিয়ে এর আগে বিচারকরা খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না।

বিজ্ঞাপন

তবে এবার কিশোয়ার চৌধুরীর নতুন কৌশলে রান্না করা এ ডিশ মুগ্ধ করে বিচারকদের। কিশোয়ার অর্জন করেন ২১ পয়েন্ট। প্রথম রাউন্ডে অন্য প্রতিযোগী জাস্টিন নারায়ণের অর্জনও ২১ পয়েন্ট। তবে প্রথম রাউন্ডে সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করেন পিটার ক্যাম্পবেল। তার রান্না চেখে দেখে বিচারকরা দিয়েছন ৩০-এর মধ্যে ২৮ পয়েন্ট।

মাস্টারশেফে পান্তা-আলু ভাতেই বাজিমাত কিশোয়ারের

বিজ্ঞাপন

পান্তা ভাত আর আলু ভর্তায় বাজিমাত

দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রতিযোগীদের জন্য ছিল দারুণ চমক। এ রাউন্ডের শুরুতেই মাস্টারশেফে কিচেনে হাজির হন প্রতিযোগীদের পরিবারের সদস্যরা। তাতে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এ রাউন্ডে প্রতিযোগীদের পরিবারের সদস্যরাও তাদের ভাগ্য নির্ধারণে অংশ নেন। বিচারকরা প্রত্যেক প্রতিযোগীর পরিবারের সদস্যদের দু’টি আলাদা গোল থেকে দুটি কার্ভবল বেছে নিতে বলেন। কার্ভবলের একটিতে ছিল রান্নার উপকরণ, অন্যটিতে রান্না করার পদ্ধতি ও কৌশল।

বিজ্ঞাপন

এ রাউন্ডে কিশোয়ার উপকরণ হিসেবে পান হোয়াইট সয়া সস। আর রান্নার কৌশল হিসেবে পান স্মোক। এগুলোর ব্যবহার করে তিনি যে ডিশ বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করেন, সেটি স্বাভাবিকভাবে কেউই হয়তো চিন্তা করবে না। কিন্তু কিশোয়ার তো গোটা প্রতিযোগিতাতেই দেশীয় খাবারকে তুলে ধরে চমক দেখিয়ে গেছেন। গ্র্যান্ড ফিনালের মহারণ জিততে তিনি বেছে নেন বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাবার পান্তা ভাত! না, পহেলা বৈশাখে ‘ফ্যান্সি’ হোটেলের ‘ফ্যান্সি’ কোনো খাবার নয়, একদম সাদামাটা পান্তা-আলু ভাত। হ্যাঁ, কিশোয়ারের পরিবেশন করা ডিশে ছিল পান্তা ভাত, যেটিতে তিনি ‘স্মোক’ ব্যবহার করেছিলেন। এর সঙ্গে ছিল আলু ভর্তা, যার ওপর কড়া করে ভেজে নেওয়া শুকনো মরিচ। এর সঙ্গে ছিল হোয়াইট সসে মেরিনেট করে মুচমুচে ভাজা সার্ডিন মাছ আর পেঁয়াজ-কাঁচা মরিচ-ধনে পাতার সালাদ (সালসা)।

মাস্টারশেফে পান্তা-আলু ভাতেই বাজিমাত কিশোয়ারের

কিশোয়ার তার এই ডিশের পরিচিতি দিয়েছেন— স্মোকড রাইস ওয়াটার, আলু ভর্তা, সার্ডিন, সালসা। ডিশটি পরিবেশনের পর তিনি বিচারকদের বলছিলেন, ‘এটি আপনারা রেস্টুরেন্টে পাবেন না। ফিনালে ডিশ হিসেবে এমন একটি খাবার পরিবেশনের সিদ্ধান্তটি ছিল খুব আতঙ্কজনক। কিন্তু ফিনালে ডিশ হিসেবে এটি রান্না করাটা আমার নিজের জন্য অত্যন্ত ভালো লাগার।’

কিশোয়ার উদ্বেগে থাকলেও তার পরিবেশন করা এই ডিশেই জিভে জল চলে আসে বিচারকদের। তারা পান্না-আলু ভাতের আকুণ্ঠ প্রশংসা করেন। বলেন, এটি ইতিহাস ও স্বাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আর তাদের এই প্রশংসা যে নিছক কথার কথা ছিল না, তার প্রমাণ মিলল রেজাল্ট কার্ডে। অ্যান্ডি, মেলিসা, জক— তিন জনই এই ডিশকে দিয়েছেন দশে দশ। অর্থাৎ দ্বিতীয় রাউন্ডে কিশোয়ার সম্ভাব্য ৩০ নম্বরের পুরোটাই অর্জন করে নিয়েছেন পান্তা-আলু ভাতের মোহনীয় স্বাদে।

মাস্টারশেফে পান্তা-আলু ভাতেই বাজিমাত কিশোয়ারের

ফাইনালের লড়াইয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা

দ্বিতীয় রাউন্ডে তিন বিচারকের কাছ থেকেই পারফেক্ট  টেন পাওয়ার পর দুই রাউন্ড শেষে কিশোয়ারের ঝুলিতে রয়েছে ৫১ পয়েন্ট। প্রথম রাউন্ডে চমৎকার শুরুর পর দ্বিতীয় রাউন্ডে কিছুটা পিছিয়ে পড়েও আরেক প্রতিযোগী পিটার ক্যাম্পবেলের মোট পয়েন্ট এখন ৫৩। আরেক প্রতিযোগী জাস্টিন নারায়ণও রয়েছেন গা ঘেঁষেই। তার নম্বর ৫০। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) প্রচারের অপেক্ষায় থাকা তৃতীয় রাউন্ডে থাকছে প্রেশার টেস্ট, যেখানে প্রতিষ্ঠিত একজন বিশ্বখ্যাত শেফের কোনো একটি সিগনেচার ডিশ তৈরি করে দেখাতে হয়। সেই রাউন্ডের ৮০ নম্বরের মধ্যে কে কত পাবেন, তার ওপরই নির্ভর করতে চূড়ান্ত বিজয়।

কিশোয়ারে আবেগাপ্লুত বাংলাদেশি, প্রবাসীরাও

প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই বাংলাদেশি বিভিন্ন খাবার রান্না করে কেবল বিচারকদের নয়, দেশের মানুষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও আবেগে ভাসিয়ে চলেছেন কিশোয়ার। এই তো সেমিফাইনালেও ‘আফটার ডিনার ডেজার্ট’ পর্বে উপহার দিয়েছিলেন আইসক্রিম ও শুকনো ফলের সঙ্গে পান ও পান মসলার একটি রেসিপি, যেটিকে বলা হচ্ছিল ‘আ লাভ লেটার টু বাংলাদেশ’। এছাড়া খিচুড়ি, বেগুন ভর্তার মতো একের পর এক পদ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশি খাবারও বিশ্বমঞ্চ জয় করার সক্ষমতা রাখে। আর তাই মাস্টারশেফের একেকটি পর্বে টিভি সেটের সামনে থেকে চোখে ফেরাতে পারেন না বাংলাদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শকরা। কিশোয়ারের গর্বে তাদের চোখের কোণায়ও জল চিকচিক করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আফরিনা আসাদ মেঘলা শুরু থেকেই দেখে আসছেন এবারের মাস্টারশেফ। একেকটি পর্বে কিশোয়ারের জয়কে তিনি নিজের জয় হিসেবে অনুভব করে থাকেন। মেঘলা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা অনেকেই নিজেদের নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগি। বিদেশি চ্যানেলগুলোতে বিভিন্ন কুইজিনের সুদৃশ্য সব রেসিপির প্রদর্শনী দেখে হয়তো মনে করি, বাংলাদেশি খাবার বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করার উপযোগীই নয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশীয় খাবার যে কতটা আকর্ষণীয়, সেটি প্রমাণ করে দিচ্ছেন কিশোয়ার।’

মাস্টারশেফে পান্তা-আলু ভাতেই বাজিমাত কিশোয়ারের

তিনি আরও বলেন, ‘যে পান্তা ভাত আর আলু ভর্তা দেখলে আমরা নাক সিঁটকাই, সেটিকেই কি না কিশোয়ার মাস্টারশেফের গ্র্যান্ড ফিনালের ডিশ হিসেবে হাজির করেছেন! আর বিচারকরাও পারফেক্ট টেন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশি খাবারও বিশ্বের যেকোনো কুইজিনের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিতে সক্ষম। কিশোয়ারের এ এক অসামান্য অর্জন। গ্র্যান্ড ফিনালেতে শেষ পর্যন্ত কিশোয়ার ট্রফি জিততে না পারলেও আমাদের সবার কাছে তিনিই চ্যাম্পিয়ন শেফ, ট্রু মাস্টারশেফ।’

সিডনি প্রবাসী নিশি শারমিনের কণ্ঠেও একই আবেগ। তিনি বলেন, ‘এই খাবারগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবিকার প্রতিনিধিত্ব করে। এবারের আসরজুড়ে কিশোয়ার চৌধুরী একাধিক বাঙালি খাবার পরিবেশন করেছেন। এর আগেও তিনি বেগুন ভর্তা, খিচুড়ির মতো খাবারকে ডিশ হিসেবে পরিবেশন করেছেন। গত পর্বে তো তিনি অভিনব স্টাইলে ডেজার্ট হিসেবে পান পরিবেশন করেছেন। বিচারকরা পানকে ‘আফটার ডিনার মিন্ট’ হিসেবে অনেক প্রশংসা করেন।’

তিনি বলেন, ‘এবার গ্র্যান্ড ফিনালেতে পান্তা ভাত, আলু ভর্তার সঙ্গে পোড়া মরিচ, মাছ ভাজা, পেঁয়াজ-মরিচ ও ধনিয়া পাতার সালাদ খাইয়ে ১০০% পয়েন্ট নিয়ে আসতে পারার পেছনে কী অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দক্ষতা থাকতে পারে, তা ভেবেই রীতিমতো অবাক আমি! মোট কথা, তিনি বাঙালির সহজ জীবনযাত্রার দৈনন্দিন মধ্যবিত্ত খাবার মাস্টারশেফের টেবিলে তুলে ধরছেন। কিশোয়ারকে স্যালুট।’

পান্তা-আলু ভাতে মুগ্ধতা ছড়ানো কিশোয়ারের হাতে শেষ পর্যন্ত মাস্টারশেফের ট্রফি ওঠুক না ওঠুক, এরই মধ্যে তিনি জয় করে নিয়েছেন বিচারক, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগীসহ হাজারও দর্শকের মন।

সারাবাংলা/আইই/আরএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন