বিজ্ঞাপন

এলএনজির চাহিদা বাড়ছে, সংস্থান নিয়ে চিন্তায় সরকার

July 15, 2021 | 10:28 pm

ঝর্ণা রায়, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস- এলএনজি নিয়ে এক রকম বিপাকে পড়েছে পেট্রোবাংলা। একদিকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি মিলছে না, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তি, এ পরিস্থিতে এলএনজি সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরমধ্যে আগামী দুই বছরের মধ্যে যে চার বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত হচ্ছে তাতে এলএনজির যোগান কী করে হবে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো করতে পারেনি পেট্রোবাংলা। এদিকে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে সমন্বয় এনে পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের পরামর্শক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেল।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা গেছে, এবার এলএনজি আমদানিতে মাত্র ২৫ শতাংশ ভুর্তুকি পেয়েছে পেট্রোবাংলা। জানা গেছে, ভুর্তুকির জন্য ৩ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা চেয়েছিল পেট্রোবাংলা। এর বিপরীতে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থবিভাগ। যা মোট চাহিদার চার ভাগের একভাগ।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পেট্রোবাংলার বছরের খরচ মিটিয়ে উদ্ধৃত টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়কে দিতে হচ্ছে। গত দুই বছরে চার হাজার করে আট হাজার কোটি টাকা পেট্রোবাংলা সরকারকে দিয়েছে। এতে করে নিজেদের প্রকল্প ব্যয় মেটাতে প্রতিষ্ঠানটি হিমশিম খাচ্ছে। এর উপরে এলএনজির ভুর্তুকির সংস্থান তাদের জন্য চাপ বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে অর্থ মন্ত্রণালয় পেট্রোবাংলা থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত আট হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এর বিপরীতে বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে। ফলে ভর্তুকির চাহিদা বাড়ছে। সবকিছু মিলিয়ে এভাবে কতদিন চালিয়ে নেওয়া যাবে সেটি বলা মুশকিল।’

তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি একনেক বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, পেট্রোবাংলা থেকে অর্থবিভাগ যে পরিমানে টাকা নিয়ে যাচ্ছে সে পরিমাণে ভর্তুকি পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চারটি এলএনজি ভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এ সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চড়া দামে আমদানি করা এলএনজি দিয়ে পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়াত্ত ও ব্যক্তি মালিকানাধীন এলএনজিভিত্তিক চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি নির্মাণ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ঘাটে। একটি খুলনার রূপসায়। এগুলো থেকে মোট ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। জ্বালানি হিসেবে এগুলোতে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ইউনিক গ্রুপ নির্মাণ করছে ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। ৫৮৪ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য চুক্তি হয় ২০১৯ সালের ৭ জুলাই। এটি ২০২২ সালের জুলাই মাসে উৎপাদনে যাওয়ার কথা। এখানে দিনে গ্যাসের প্রয়োজন হবে ২ কোটি ৯২ লাখ ঘনফুট।

নারায়ণগঞ্জে এলএনজি ভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে সামিট পাওয়ার। সামিট মেঘনাঘাট -২ নামে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মানের জন্য ২০১৯ সালের ১৪ মার্চ চুক্তি সই হয়। সামিটের ৫৮৪ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতকেন্দ্রটি ২০২২ সালের মার্চে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই কেন্দ্রের জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হবে দৈনিক ৩ কোটি ঘনফুট।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি নির্মাণ করছে রিল্যায়েন্স বাংলাদেশ পাওয়ার লিমিটেড। ৭১৮ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করবে পিডিবি। এটি ২০২২ সালের ৩১ আগস্টে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। ৭১৮ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দিনে ১০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ২ কোটি ঘনফুট হারে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে।

আর রাষ্ট্রায়াত্ত কোম্পানি নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড খুলনার রূপসায় ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকারি কোম্পানির এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। একই বছরের আগস্টে আসবে দ্বিতীয় ইউনিট। এরইমধ্যে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এটি আমদানি করা গ্যাসে চালানোর কথা। এখানে দৈনিক ৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে।

সূত্র জানায়, এলএনজি চালিত এই চার বিদ্যুতকেন্দ্রের জন্য এক কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে। এই পরিমাণে গ্যাস কোথা থেকে আসবে তার রূপরেখা এখনো ঠিক হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বিতরণ সংস্থা পেট্রোবাংলার অপারেশন অ্যান্ড মাইনস এর পরিচালক প্রকৌশলী আলী মো. আল- মামুন সারাবাংলাকে জানান, আমরা ৫০ কিলোমিটারের ৪২ ইঞ্চি একটা পাইপ লাইন হচ্ছে। এরইমধ্যে এটি একনেক বৈঠকে পাস হয়েছে। এটি আগামী ২০২৪ এর জুন পর্যন্ত এর সময়সীমা রয়েছে। এরমধ্যে পাইপলাইনটি নির্মাণ হবে। কিন্তু এই চার বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যে ১ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট যে গ্যাসের দরকার হবে তা এখনি পাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সাল কিংবা ২৫ সালের দিকে এটি হয়ত পাওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি কোন দিক কী করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল এই পাইপ লাইন নির্মাণের সময় এই কেন্দ্রগুলোর সম্পৃক্ততা। এখন এই ৪২ ইঞ্চির কাজ শেষ না হলে তো দেওয়া যাবে না।’

জানা গেছে, দেশে এখন দিনে ৯০ কোটি ঘনফুট এলএনজি গ্যাস গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে যে এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে তা থেকে সর্বোচ্চ একশ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ সম্ভব। কিন্তু বিশ্বের কোথাও এলএনজি টার্মিনাল তাদের সক্ষমতার ৭০ ভাগের বেশি এলএনজি সরবরাহ করে না। এ কারণে আগামী দুই বছরে এই বিশাল বাড়তি গ্যাসের চাহিদা পূরণে শঙ্কিত জ্বালানিখাত।

সূত্রে জানা গেছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি বৈঠকে ২০২২ ও ২৩ সালে যে এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত হচ্ছে সেখানে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।

যদিও দিনের এবং রাতের গ্রাহক চাহিদার সমন্বয় করে কীভাবে গ্যাসের সরবরাহ চালু রাখা যায় এ নিয়ে চিন্তা করছে পাওয়ার সেল। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ গ্যাস এখন পাচ্ছি ১১২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সর্বোচ্চ দরকার হচ্ছে ১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই পরিমাণ গ্যাস ২৪ ঘণ্টায় প্রয়োজন হয় না।’

তিনি বলেন, ‘রাতে নানা কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। যেখানে রাতে আটটায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট লাগে। সেখানে রাতে বারোটায় ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামে। আমরা বলছি, যখন গ্রাহক চাহিদা কম হবে সেই সময়ের গ্যাস সমন্বয় করা হোক।’

জ্বালানি বিভাগের সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে নেটওয়ার্কভুক্ত গ্রাহকদের গ্যাসের মোট দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুটের সঙ্গে আমদানিকৃত এলেনজির দৈনিক ৭৪৬ মিলিয়ন ঘনফুটের সমতুল্য গ্যাস মিলিয়ে দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ১৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

সারাবাংলা/জেআর/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন