বিজ্ঞাপন

রেলের কোচ সংগ্রহ: বৈদেশিক প্রশিক্ষণসহ নানা খাতে বাড়তি ব্যয়

July 21, 2021 | 8:31 am

জোসনা জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এই প্রশিক্ষণ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। এ বাবদ বাড়তি ৪২ লাখ ২ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া স্ট্যাডি ট্যুর বাবদ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ১১ লাখ টাকা। এই ট্যুরও সম্পন্ন হয়েছে। এ বাবদ অতিরিক্ত ১১ লাখ ৩২ হাজার টাকা টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বাইরেও নানা খাতে বরাদ্দের অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য মিটারগেজ এবং ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রকল্পে। তবে অন্যান্য খাতে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে চুক্তিমূল্য কম হওয়ায় প্রকল্পটির মোট ব্যয় কমিয়ে প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে আগামী ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মামুন-আল-রশিদ। সংশোধনীর জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে জানান, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ২০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার কোচ এবং দুইটি অটোমেটেড ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্টস সংগ্রহ করা হবে। নিরাপদ ও মানসম্পন্ন যাত্রীবাহী ক্যারেজ পরিচালনার মাধ্যমে উন্নত যাত্রীসেবা দেওয়া হবে। পুরাতন ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ক্যারেজ প্রতিস্থাপন করা, যাত্রীবাহী গাড়ীর স্বল্পতা দূরীকরণ, নতুন ট্রেন পরিচালনা করা এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা হবে। এজন্য প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এটি ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। এখন ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পিইসি সভার কার্যপত্রে পরিকল্পনা কমিশনের মতামত দিতে গিয়ে বলা হয়েছে- মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ২০০টি মিটারগেজ (এমজি) ক্যারেজের মূল্য প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৬৮৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। টেন্ডারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত দর অনুযায়ী সিসিজিপি কর্তৃক অনুমোদিত ব্যয় ৬১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং এই ব্যয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হয়। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পর এই ক্যারেজ গুলোর অতিরিক্ত কম্পোনেন্টস সংযোজন করা হয়েছে যার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ক্যারেজগুলোর কি কি কম্পোনেন্টস ও সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে, কোন কম্পোনেন্টে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, বিষয়টি কোন পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে, সংযোজনের ফলে কিকি সুবিধা পাওয়া গেছে, সংযোজিত সিস্টেম কার্যকর রয়েছে কি না তা জানা প্রয়োজন।

রেলের কোচ সংগ্রহ: বৈদেশিক প্রশিক্ষণসহ নানা খাতে বাড়তি ব্যয়

বিজ্ঞাপন

মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে ৫০টি ব্রডগেজ (বিজি) ক্যারেজের মূল্য প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। টেন্ডারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত দর অনুযায়ী সিসিজিপি অনুমোদিত ব্যয় ২১৩ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং এই ব্যয়ে ঠিকাদারের সাথে চুক্তি সম্পাদিত হয়। ঠিকাদারের সাথে চুক্তি সম্পাদনের পর এই ক্যারেজগুলোর অতিরিক্ত কম্পোনেন্টস ও সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে যার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ক্যারেজগুলো কিকি কম্পোনেন্টস ও সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে, কোন কম্পোনেন্টে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, বিষয়টি কোন পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে, সংযোজনের ফলে কি কি সুবিধা পাওয়া গেছে, সংযোজিত সিস্টেম কার্যকর হয়েছে কিনা তা জানা প্রয়োজন।

মূল ডিপিপিতে ২টি ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্টস বাবদ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৩০ কোটি টাকা। টেন্ডারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত দর অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে চুক্তিমূল্য ছিল ৩৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। পরবর্তীতে লে আউট ও ডিজাইন পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা অর্থাৎ এ অঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। লে আউট ও ডিজাইন কি পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং এর ফলে কোন কোন উপ-অঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে তা বিস্তারিতভাবে জানা প্রয়োজন। অনুমোদিত ডিপিপিতে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) বাবদ ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এ বাবদ অতিরিক্ত ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকাসহ মোট ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে তাই ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে। পিএসআই কোম্পানির টার্মস অব রেফারেন্স, এ পর্যন্ত কয়টি পিএসআই সম্পন্ন করেছে এবং কিভাবে এ বাবদ অতিরিক্ত ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে তা আলোচনা করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া অনুমোদিত ডিপিপিতে সার্ভে বাবদ ৩০ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছিল । এ বাবদ অতিরিক্ত ৭০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে তাই ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এরইমধ্যে সব ক্যারেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কী সার্ভে করা হয়েছে এবং এ বাবদ ৭০ লাখ টাকা কোন কাজে প্রয়োজন হবে তা জানা প্রয়োজন। এমজি ও বিজি ক্যারেজ পরিবহনের জন্য অনুমোদিত ডিপিপিতে ৩০ লাখ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
বর্তমানে অতিরিক্ত ২ কোটি ৭০ লাখ টাকাসহ মোট ৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে তাই উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন কাজে কোন সংস্থাকে অতিরিক্ত ২ কোটি ৭০ লাখ দেওয়া হবে তা আলোচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া পোর্ট ডিউজ বাবদ অতিরিক্ত ৪০ লাখ টাকা আরডিপিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সকল ক্যারেজ এরমধ্যে রেলওয়ে বহরে সংযোজন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পোর্ট ডিউজ এর যৌক্তিকতা জানা প্রয়োজন।

পিইসি সভার কার্যপত্রে আরও বলা হয়েছে- মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে দেশীয় ভ্রমণ বাবদ কোনো ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়নি। প্রস্তাবিত আরডিপিপিতে ১০ লাখ টাকার বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আরডিপিপিতে অফিস স্টেশনারি বাবদ ২ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ বাবদ ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতা আলোচনা করা প্রয়োজন। এদিকে প্রকল্পের আওতায় সকল কাজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্রকল্পের কার্যক্রম প্রায় শেষ হয়েছে। এ পর্যায়ে ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি বাবদ ১১ কোটি ৬৬ লাখ এবং প্রাইস কন্টিজেন্সি বাবদ ২৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা বাদ দেওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে- বর্তমান বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১ হাজার ১৬৫টি মিটার গেজ যাত্রীবাহী গাড়ী রয়েছে, যার মধ্যে ৪৫৬টি কোচের বয়স ৩৫ বছরের উর্দ্ধে এবং ১৩৫টির বয়স ৩১ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। মেকানিক্যাল কোড অনুসারে যাত্রীবাহী কোচের ইকোনোমিক লাইফ ৩৫ বছর। সে অনুসারে ৪৫৬টি বয়সোত্তীর্ণ কোচ এবং ১৩৫টি কোচ যাদের বয়স ৩১ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে অর্থাৎ সর্বমোট ৫৯১টি কোচ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে চলাচল করছে। যার ফলে যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়েতে মোট ৩২৪টি ব্রড গেজ কোচের স্বল্পতা রয়েছে।

এর আগে যে সমস্ত কোচ অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে তাদের প্রতিস্থাপন হিসাবে কোচ সংগ্রহ না হওয়ায় এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ জন্য যাত্রীবাহী গাড়ীর চাহিদা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ট্রেন প্রবর্তন করার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির ( একনেক) সভায় অনুমোদন লাভ করে। এসময় মোট ১ হাজার ৩৭৪ কোটি ৫০ লাখ ৪১ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়।

কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ হ্রাস, এমজি ও বিজি প্যাসেঞ্জার ক্যারেজের জন্য নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তিকরণ, এমজি ও বিজি অটোমেটিক ট্রেন ওয়াশিং প্ল্যান্টসের ভেরিয়েশন, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে করে সংশোধিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রাক্কলিত ব্যয়ের পরিমাণ হয়েছে মোট ১ হাজার ২০০ কোটি ৫২ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এ ব্যয় মূল প্রকল্প ব্যয়ের চেয়ে ১৭৩ কোটি ৯৮১ লাখ টাকা কম। এছাড়া প্রকল্প মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

সারাবাংলা/জেজে/একে

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন