বিজ্ঞাপন

আড়তদারের ‘নিয়ন্ত্রণেই’ চট্টগ্রামে চামড়া কেনাবেচা

July 21, 2021 | 9:45 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ‘একদিনের চামড়া ব্যবসায়ী’ বা মৌসুমি সংগ্রহকারীদের হটিয়ে এবারও চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিরা। গত দুই বছর প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে চামড়া সড়কে ফেলে চলে যেতে বাধ্য হওয়ার পর এবার মৌসুমি সংগ্রহকারীদের তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি। ফলে এবার চামড়ার বাজারে গত কয়েক বছরের মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তবে এবার কোরবানি কম হওয়ায় চামড়া সংগ্রহের পরিমাণও কম বলে জানিয়েছেন সংগ্রহকারীরা।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২১ জুলাই) কোরবানির পর নগরীর বিভিন্ন এলাকার বড় ব্যবসায়ীরা তাদের কর্মচারিদের মাধ্যমে পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন বিভিন্ন স্পটে। তাদের অনেকেই আড়তদারের প্রতিনিধিও। আবার আড়তদারও তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মাদরাসা, পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করেন। তবে আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিরা মিলে কম দাম ধরে রেখে পুরনো কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

চট্টগ্রামে কোরবানির কাঁচা চামড়ার বাজার প্রতিবছর ‘চার হাত চক্রে’ নিয়ন্ত্রণ হতো। কোরবানি দাতাদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করতেন এলাকার উঠকি তরুণ-যুবকরা, যাদের মৌসুমি সংগ্রহকারী বলা হয়। তারা কয়েকজন মিলে ৫-৬টি করে চামড়া সংগ্রহ করতেন। তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কিনে নিতেন বড়-মাঝারি মানের ব্যবসায়ীরা, যারা শুধু কোরবানির সময়ই চামড়া কিনতে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেন এবং সেই চামড়া বিক্রি করেন আড়তদারের কাছে। সেই ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে আড়তদারের প্রতিনিধির কাছে। প্রতিনিধির কাছ থেকে চামড়া যেত আড়তদারের ডিপোতে।

বিজ্ঞাপন

তবে সেই ‘চার হাত চক্র’ গত বছর থেকে ভেঙ্গে যায়। ২০১৯ সালে আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিরা ‘অস্বাভাবিক দরপতন’ ঘটিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনা বন্ধ রেখেছিলেন। এতে কাঁচা চামড়া সড়কে ফেলে দিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। এরপর গত বছর মৌসুমি সংগ্রহকারীর সংখ্যা অর্ধেকেরও কমে নেমে আসে। কাঁচা চামড়ার বাজারের ওপর প্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিরা। গত বছরও মৌসুমি সংগ্রহকারীদের একই কৌশলে চামড়া ফেলে যেতে বাধ্য করা হয়। এরমধ্য দিয়ে এ বছর কাঁচা চামড়ার বাজারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এসেছে আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে।

চট্টগ্রাম নগরীর পাড়া-মহল্লা থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে আনা হয় নগরীর চৌমুহনী কর্ণফুলী বাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ঈদগাহ বৌবাজারসহ বিভিন্ন স্পটে। সেখান থেকেই আড়তদারের প্রতিনিধিরা কিনে চামড়া নিয়ে যান আড়তে। চৌমুহনী এলাকায় প্রতিবছর দুপুর থেকে মৌসুমি সংগ্রহকারীদের ব্যাপক ভিড়-হাকডাক থাকত। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।

বিজ্ঞাপন

চৌমুহনী এলাকায় প্রায় দুই ঘন্টা অবস্থান করে মাত্র তিনজন কিশোরকে পাওয়া গেছে, যারা মোল্লাপাড়া থেকে ৩০টি বড় গরুর চামড়া নিয়ে সেখানে বিক্রির জন্য আসেন। কিন্তু বড় সংগ্রহকারী কিংবা আড়তদারের প্রতিনিধি কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিলেন না। সাকিব নামে এক কিশোর সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতবারও ৪০টি কিনে এনেছিলাম। প্রতিটি ৩০০ টাকায় কিনে ৩৫০ টাকা করে বিক্রি করেছিলাম। এবারও ৩০০ টাকা করে কিনেছি। কিন্তু এবার ১৮০-২০০ টাকার চেয়ে বেশি দাম দিতেই চাচ্ছে না। চামড়া কিনতেই চাচ্ছে না।’

আড়তদারের ‘নিয়ন্ত্রণেই’ চট্টগ্রামে চামড়া কেনাবেচা

বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর দুপুর থেকে কাঁচা চামড়া বিক্রি শুরু হলেও আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিরা এবার সকাল থেকেই তৎপরতা শুরু করেন। আড়তদার সরাসরি কাঁচা চামড়া কেনার জন্য আসেননি। প্রতিনিধিদেরই কাঁচা চামড়া কিনতে দেখা গেছে প্রতিবারের মতো। বিক্রেতারা জানান, সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যেই প্রতিনিধিরা গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দামে কিছু চামড়া সংগ্রহ করে নেন। দুপুরের পর থেকে তারা আর ২০০ টাকার ওপরে চামড়ার দর নির্ধারণে আগ্রহী হচ্ছিলেন না। এর ফলে দর পড়ে যায়। আর ছাগলের চামড়া বিনামূল্যেই আড়তদারের প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করতে হয়েছে সংগ্রহকারীদের।

আড়তদার মাহবুবুল আলমের প্রতিনিধি হাজী মোহাম্মদ দুলালকে চৌমুহনী এলাকায় ঘুরে ঘুরে কাঁচা চামড়া কিনতে দেখা গেছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সকালে আমি নিজেই ১১০০ পিস চামড়া কিনেছি। সেগুলো ছিল শহরে কোরবানি হওয়া গরুর চামড়া, বড় গরু। ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা করে নিয়েছি। দুপুরের পর থেকে যেসব চামড়া আসছে সেগুলো ছোট গরুর। গ্রামগঞ্জ এবং মাদরাসা থেকে আসছে। সেগুলো আমরা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা পর্যন্ত দর বলছি। বড় গরু আর ছোট গরুর চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে খরচ একই। কিন্তু বিক্রির সময় বড় চামড়ার চেয়ে ছোট চামড়ার দাম কম।’

বিজ্ঞাপন

তবে বিকেল ৫টার দিকে চৌমুহনী এলাকায় ঘুরে বড় চামড়া নিয়ে অর্ধশতাধিক বিক্রেতাকে বসে থাকতে দেখা গেছে।

আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা থেকে ৭৯টি কাঁচা চামড়া নিয়ে আসা আব্দুর রাজ্জাক সারাবাংলাকে বলেন, ‘একেকটি চামড়া আমি কিনেছি ২০০ টাকা করে। বড়-ছোট মিলিয়ে কিনেছি। গাড়ি ভাড়াসহ আমার খরচ পড়েছে প্রতিটিতে কমপক্ষে ২৬০ টাকা। আমার কাছ থেকে চামড়াগুলো কিনতে চাচ্ছে ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা, সর্বোচ্চ ২৫০ টাকার মধ্যে। গতবার ২৫০ টাকায় কিনে ফেলে দেওয়ার ভয়ে সেই দামে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এবারও ফেলে দিতে হবে কি না জানি না।’

মো. ফেরদৌস নামে একজন সংগ্রহকারী সারাবাংলাকে বলেন, ‘৩০০ টাকা দিয়ে চামড়া কিনেছি। আমাকে দাম দিতে চাচ্ছে ২০০ থেকে ২২০টাকা। গাড়ি ভাড়া আছে, কামলার বেতন আছে, আমার তো পুরোই লস। যারা চামড়া কিনতে আসে, তারা চিটিংবাজ। এরা ইচ্ছা করে দাম কমিয়ে রাখে। বাজার দর তুলতেই দেয় না। অথচ সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দামে বিক্রি করতে পারলে আমাদের লাভ হয়। কিন্তু তারা সেটা দেবে না। পরে আমাদের চামড়া ফেলে দিতে হয়। গতবারও আমি ৬০টি চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেছি।’

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রস্তুত করা চামড়ার। কাঁচা চামড়া তো সরকারের নির্ধারিত দামে কিনলে হবে না। সেই দামে তো আমরা কিনতে পারব না। কারণ কাঁচা চামড়া সেই দামে কিনে লবণ দেওয়ার খরচসহ যোগ করলে যে দাম পড়বে, সেই দাম তো ট্যানারির মালিক আমাকে দেবে না।’

গত ১৫ জুলাই ট্যানারি মালিকরা কত দামে আড়তদারদের কাছ থেকে কোরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহ করবে সে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ট্যানারি মালিকরা এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরু বা মহিষের চামড়া কিনবে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়; গত বছর এই দাম ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরু বা মহিষের চামড়ার দাম হবে ৩৩ টাকা থেকে ৩৭ টাকা, গত বছর যা ২৮ থেকে ৩২ টাকা ছিল। এছাড়া সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর খাসির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ১০ থেকে ১২ টাকায় বেঁধে দিয়েছিল সরকার।

কাঁচা চামড়ার খুচরা বিক্রেতা মো. সালাহউদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘চামড়া আমরা সংগ্রহ করি ঠিক, কিন্তু মাঝখান থেকে আড়তদারের লোকজনই দাম নিয়ন্ত্রণে রাখে। আড়তদারের কাছে তো আমরা সরাসরি মাল বিক্রি করতে পারি না। আড়তদাররা দালাল রাখে, তারাই আমাদের থেকে কিনে ডিপোতে বিক্রি করে। পাঁচজন দালাল যখন একসাথে কম দাম দিতে চায়, তখন আমরা বেশি দাম ধরে বসে থাকলে সেগুলো আর বিক্রি হয় না। আবার যারা বেশি টাকা বিনিয়োগ করে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে, তাদের সঙ্গে আড়তদারের লাইন আছে। তারা ঠিকই লাভ পায়। আড়তদারের কথা হচ্ছে, সব চামড়া তারাই তাদের লোকজন দিয়ে কিনবে।’

বিকেলে নগরীর মুরাদপুরে গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিনিট্রাক, রিকশায় করে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আড়তে। আতুরার ডিপো চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়ার বৃহত্তম আড়ত। আড়তের সামনে লবণ দিয়ে কাঁচা চামড়ার স্তূপ করা হচ্ছে।

আড়তদারদের অভিযোগ, চট্টগ্রামে এখন মাত্র একটি ট্যানারি আছে। প্রস্তুত করা চামড়া বিক্রির জন্য তাদের ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের কাছ থেকে আড়তদারদের গত তিন-চার বছর আগেরও পাওনা আছে। এ কারণে চট্টগ্রামে চামড়া কেনার ক্ষেত্রে অনেক আড়তদার এবার বিরত আছে। আড়তদার কম, চামড়া বেশি- স্বাভাবিকভাবেই দাম পড়ে গেছে।

আড়তদারের ‘নিয়ন্ত্রণেই’ চট্টগ্রামে চামড়া কেনাবেচা
মুরাদপুর এলাকার মেসার্স এআই লেদারের ব্যবস্থাপক আইয়ূব আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবার কোরবানি কম হয়েছে। চামড়া অনেক কম। কিন্তু দাম আমরা গতবারের মতোই দিচ্ছি। আমরা প্রতিটি চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা করে নিচ্ছি। বড়-ছোট মিলিয়েই নিচ্ছি। ট্যানারি মালিকরা টাকা পরিশোধ করে না। আমাদের ১১২ জন আড়তদার আছেন। কিন্তু অনেক আড়তদার এবার চামড়া কিনছেন না। চামড়া যদি পচে, তাহলে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কারণেই পচবে।’

আড়তদার মুসলিম উদ্দিন সারাবাংলাকে জানান, বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা এবং মাঝারি-ছোট গরুর চামড়া ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় তিনি কিনছেন। প্রতি বর্গফুট ১৮ টাকা থেকে ২২ টাকার মতো দাম পড়েছে। করোনার সময়ে এবার কোরবানি কম হওয়ায় চামড়ার পরিমাণ কম। সোয়া তিন লাখের মতো চামড়া সংগ্রহ হবে বলে তিনি জানান।

‘এবার চামড়ার বাজার খুব সুন্দর। বিশৃঙ্খলা নেই। অনেকেই দাম না বুঝে, চামড়ার বিষয় না বুঝে পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করত। তাদের কারণে আমাদের সমস্যায় পড়তে হত। এখন সেই সমস্যা অনেক কমেছে। চামড়া আসছে আড়তে। আশা করি, এবার কাউকে চামড়া বিক্রি না করে রাস্তায় ফেলে চলে যেতে হবে না’– বলেন মুসলিম উদ্দিন।

আতুরার ডিপোর আড়তে বৃহস্পতিবারও কাঁচা চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণের কাজ চলবে। দুই-তিন সপ্তাহ পরে ট্যানারি থেকে প্রতিনিধিরা এসে প্রক্রিয়াজাত করা শুকনো চামড়া যাচাই করবেন। এরপর সেই চামড়া বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আড়তদারেরা।

সারাবাংলা/আরডি/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন