বিজ্ঞাপন

ক্রয় আইন না মেনেই নির্মাণ হচ্ছে জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্স

July 24, 2021 | 8:26 am

জোসনা জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সরকারি ক্রয় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ৬৪ জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্স নির্মাণ (প্রথম পর্যায়ে ২২ জেলা) শীর্ষক প্রকল্প। সেই সঙ্গে প্রকল্প তৈরি সঠিকভাবে না হওয়ায় বাস্তবায়নে বিরাজ করছে ধীরগতি।

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবির পরীবিক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। প্রতিবেদনটি জুন মাসের শেষ দিকে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

আইএমইডি’র সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এতে বেশ কিছু সুপারিশ রয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা সেটিও জানতে চাওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ২২ জেলায় পূর্ত কাজের প্রতিটি ভবনের অনূকুলে ২টি করে প্যাকেজ থাকলেও বাস্তবে শুধুমাত্র কুমিল্লা জেলা ছাড়া সব জেলায় অনুমোদন ছাড়া ২টি প্যাকেজ একসঙ্গে করে একটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে ডিপিপি এবং পিপিআর-২০০৮ এর বিধি ১৭ ব্যত্যয় ঘটেছে।

চলতি বছরের জুনের মধ্যে সকল প্রকার আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা থাকলেও সমীক্ষাকালীন চলতি বছরের ১০ জুন পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। পণ্য ক্রয়ের ৭টি প্যাকেজের মধ্যে একটি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া লিফট ক্রয়ের জন্য একটি করে প্যাকেজ থাকলেও সমীক্ষাকালীন চলতি বছরের জুন পর্যন্ত লিফট ক্রয় বাবদ কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রধান কাজ ২২টি জেলায় (ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, চট্টগ্রাম ,কুমিল্লা, বাক্ষ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, রংপুর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, এবং ঝালকাঠি) ৬ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা। বর্তমানে ২২টি জেলার মধ্যে ১৭টি জেলার (ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর লালমনিরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল এবং ঝালকাঠি) নির্মাণ কাজ ফিনিশিং শেষ পর্যায় রয়েছে।

চারটি জেলায় (নোয়াখালী, সিলেট, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ) নির্মাণ কাজের অগ্রগতি গড়ে মাত্র ১৫ শতাংশ এবং কুমিল্লা জেলায় সবেমাত্র দরপত্র চূড়ান্তকরণের জন্য টিইসি মিটিংয়ে পেশ করা হয়েছে। পূর্ত কাজের ভৌত অগ্রগতি গড়ে ৬০ শতাংশ যা প্রকল্প মেয়াদে সন্তোষজনক নয়। মূলত প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) আরডিপিপি (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) যথাযথভাবে প্রণয়ন না হওয়া এবং ব্যবস্থাপনায় দূর্বলতার কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এছাড়াও দেখা যায়, অনুমোদিত আরডিপিপি অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ৩টি পদে (প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর, নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী) জনবল নিয়োগ না দেয়ায় নির্মাণ কাজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের ভৌত কাজ শেষ হবে না।

প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ না হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ডিপিপি অনুযায়ী সময়মত দরপত্র আহবান করতে না পারা এবং ডিপিপি আরডিপিপি অনুযায়ী বছরভিত্তিক আর্থিক ও ভৌত কাজের পরিকল্পনা প্রস্তুত না করা। সময়মত জমি না পাওয়ার কারণে কক্সবাজার ও বাগেরহাট জেলার পরিবর্তে সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলায় অন্তর্ভুক্তিতে সময় বিলম্ব, সুনামগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলায় নিজেস্ব জমি না থাকায় জমি অধিগ্রহণে সময় বিলম্ব, প্রায় প্রতিটি স্থানেই গাছ ও পুরাতন স্থাপনা অপসারণে জটিলতা, ৩টি জেলায় (রংপুর, লালমনিরহাট এবং খুলনা) জমির সাইজের কারণে টাইপ নকশা পরিবর্তন করে নতুন নকশা প্রণয়ন, ৩টি স্থানে ( হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ) ফাউন্ডেশনের নকশা পরিবর্তন, কয়েকটি জেলায় ( ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট) ভবনের দিক পরিবর্তনের নকশা প্রাপ্তিতে সময় বিলম্ব এবং করোনা মহামরির কারণে ৫ থেকে ৬ মাস কাজ বন্ধ থাকায় মূলত নির্মাণ কাজে ধীরগতি ।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য যে, নিজস্ব জমি না থাকা সত্ত্বেও সুনামগঞ্জ জেলা অন্তর্ভুক্ত করা যুক্তিযুক্ত ছিল না। একই কারণে কুমিল্লা জেলার পরিবর্তে নিজস্ব জমি আছে এমন জেলা নির্বাচন করা সমীচীন ছিল। তবে প্রকল্পের শুরুতে যথাযথভাবে বেজলাইন সার্ভে, ফিজিবিলিটি স্টাডি করে ডিপিপি আরডিপিপি প্রণয়ন করা হলে এই সমস্যাগুলো আগেই জানা যেত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়নন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্প গুলোর কিছু নির্বাচিত চলমান প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা ও সমাপ্ত প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন করে। এরই ধারাবহিকতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন ৬৪ জেলায় জেলা সমাজসেবা কমপ্লেক্স নির্মাণ ( প্রথম পর্যায় ২২ জেলা) (প্রথম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পটি নিবিড় পরিবীক্ষণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেকনোকনসাল্ট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এই প্রতিষ্ঠানটির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৭টি জেলায় যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন ছাড়া ভেরিয়েশন করা হয়েছে ( ফরিদপুর ১২ দশমিক ১২ শতাংশ, চট্টগ্রাম ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ, দিনাজপুর ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, নেত্রকোণা ২১ দশমিক ২১ শতাংশ, রংপুর ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ, ময়মনসিংহ ১৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও কিশোরগঞ্জ ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ)। এই ৭টি জেলার ভেরিয়েশন অনুমোদনের জন্য প্রকল্প দপ্তরের প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে।

গত ২৭ মে পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির) সভায় এই ৭টি জেলার ভেরিয়েশন অনুমোদনের জন্য পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়। নেত্রকোণায় আরডিপিপির প্রাক্কলিত মূল্য থেকে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ ভেরিয়েশন করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত একবার অডিট সম্পাদিত হয়েছে। এই অডিটে ২টি অডিট আপত্তি ছিল, যার সংশ্লিষ্ট টাকার পরিমাণ ৭ লাখ ৯৭ হাজার ২৫০ টাকা। আপত্তির জবাব অডিট অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে, আপত্তিটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। প্রকল্পের প্রধান অংশ ভবন নির্মাণ কাজের বিষয়ে কয়েকটি জেলায় (ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, ঢাকা ও লালমনিরহাট) পূর্ত অডিট সম্পাদিত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ , লালমনিরহাট ও ঢাকায় পূর্ত অডিটে আপত্তি নেই। ময়মনসিংহ জেলায় ২টি ( টাকার পরিমাণ এক কোটি ১২ লাখ ৭৯ হাজার ১২৯ টাকা) ও ফরিদপুর জেলায় ২টি ( টাকার পরিমাণ ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৪৩১ টাকা) করে পূর্ত অডিট আপত্তি রয়েছে। অডিট আপত্তির জবাব অডিট অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে নির্মাণ কাজ বিএনবিসি এবং অনুমোদিত ড্রইং ডিজাইন অনুযায়ী কাজ চলমান রয়েছে। নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত মালামালের ল্যাবে টেস্ট এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হ্যামার টেস্টের প্রাপ্ত ফলাফলগুলো সন্তোষজনক পাওয়া গেছে। সরেজমিন রুম, কলাম, বীম বাউন্ডারি ওয়াল ছাড়াও ছাদের রেলিংয়ের পরিমাণ করে ড্রইংঅনুযায়ী সঠিক পাওয়া গেছে। তবে কিছু জেলায় ( রাজশাহী, নেত্রকোণা, ময়মনসিং, রংপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, লালমনিরহাট ও চাপাইনবাবগঞ্জ) নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ইটের মান ( আকৃতিগত ও কোণা ভাঙ্গা) সন্তোষজনক নয়। নোয়াখালী, হবিগঞ্জ, সিলেটে ঢালাই কাজে যে পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে তা সন্তোষজনক নয়। সাটারিং সঠিক না হওয়ায় এবং ভাইব্রেটর মেশিন ঠিকমত ব্যবহার না করায় কিছু ক্ষেত্রে কাজে হানিকম্ব (ওয়াল ফুলে উঠা) দেখা গেছে। শ্রমিকদের হ্যান্ড গ্লাবস, গাম্বুট, হ্যালমেট ইত্যাদি সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হযনি। নেত্রকোণা, মযমনসিংহে দরজার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি চৌকাঠে চিড়ল ফাটল দেখা গেছে। এছাড়াও কয়েকটি জেলায় (নেত্রকোণা, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহ) প্লাস্টার পরবর্তীতে দেওয়ালের অনেক জায়গায় সাদা সাদা লোনা ভেসে উঠেছে।

আইএমইডি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, হবিগঞ্জও সুনামগঞ্জ জেলায় নির্মাণ কাজের অগ্রগতি কম হয় তাই আলাদাভাবে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে নিবিড় তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের ১৭টি জেলায় (ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, চট্টগ্রাম, ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়া, রংপুর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা বরিশাল এবংঝালকাঠি) ভবনের কাজ ফিনিশিং শেষ পর্যায়ে রয়েছে তাই এই জেলাগুলোর নির্মাণ কাজ দ্রুত পূণাঙ্গভাবে শেষ করে ভবন ব্যবহরের উপযোগী করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে, ভেরিয়েশন অনুমোদনের প্রয়োজন হলে ভেরিয়েশনের বিধান অনুযায়ী এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে, প্রকল্পের আওতায় আরডিপি অনুযায়ী যথাযথ আউটসোর্সেসিংয়ের ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দিতে হবে।

প্রকল্পে দূর্বল দিক: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা প্রকল্পটির দুর্বল দিকগুলো হচ্ছে, উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন না করা, ফিজিবিলিটি স্টাডি ও বেজলাইন সার্ভে না করা, সময়মত দরপত্র আহবান করতে না পারা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পিআইসি ও পিএসসি সভা না করা।

সারাবাংলা/জেজে/একে

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন