বিজ্ঞাপন

কাপ্তাই হ্রদে পানিস্বল্পতা: মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বাড়ল ১০ দিন

July 28, 2021 | 8:44 pm

প্রান্ত রনি, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

রাঙ্গামাটি: গত বছরের মতো এ বছরও পানিস্বল্পতার কারণে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময় আরও ১০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে গত ১ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত এই হ্রদে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকলেও ১ আগস্ট থেকেই মৎস্য শিকারীরা মাছ ধরতে পারবেন না। বরং আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ থাকবে এই হ্রদে মৎস্য আহরণ।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১০ আগস্টের মধ্যেও যদি পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে না বাড়ে, তাহলে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেবে। বুধবার (২৮ জুলাই) দুপুরে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত একটি জুম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) রাঙ্গামাটি উপকেন্দ্র প্রধান আজহার আলী, মৎস্য সমিতির নেতা কবির হোসেন, আব্দুল শুক্করসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের বংশবিস্তার ও প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছরের ১ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত তিন মাস সব ধরনের মাছ শিকার, বাজারজাতকরণ ও পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে থাকে জেলা প্রশাসন। গত বছরও একইভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তবে এই সময়ের মধ্যে হ্রদের পানি না বাড়ায় নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ১ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ১১ আগস্ট থেকে শুরু হয় মাছ আহরণ।

জানা যায়, সেই সময় পর্যাপ্ত পানি না থাকলেও মৌসুমের শুরুর দিকে মাত্রাতিরিক্ত মাছ আহরণের ফলে মৌসুমের শেষে দিকে হ্রদে মাছ তেমন পাওয়া যায়নি। এতে বিএফডিসির মাছ অবতরণের বিগত কয়েক বছরের রেকর্ড পতন হয়েছে। এ কারণেই এ বছর নিষেধাজ্ঞার বাড়তি ১০ দিনে পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে না বাড়লে পরে সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন ও বিএফডিসি।

বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আপাতত ১০ আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। তবে এটি নির্ভর করছে হ্রদে পানি কী পরিমাণে বাড়বে, তার ওপর। যদি পানি ১০৩ ফুট পর্যন্ত উন্নীত হয়, তাহলে ১০ আগস্ট মধ্যরাতের পর মাছ ধরা শুরু হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে আমরা ৮/৯ আগস্ট আবার সভা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’

বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের সহকারী মার্কেন্টিং অফিসার শোয়েব সালেহীন বলেন, ‘বিএফডিসির অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে মাছ অবতরণ, পরিবহনসহ যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এখন হ্রদে পানির ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। পানির বাড়লেই আমাদের কাজ শুরু হবে।’

বিজ্ঞাপন

এদিকে মৎস্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বল্প পানিতে মাছ আহরণ ও ছোট ফাঁসের কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারণে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ দিন দিন কমছে। বিএফডিসি স্বল্প পানিতে মাছ আহরণ শুরু করার কারণে আহরণ মৌসুমের প্রথম প্রান্তিকেই বেশিরভাগ মাছ ধরা পড়ে যায়। এর অন্যতম কারণ হলো— হ্রদে অবমুক্ত পোনা তিন মাস সময়ে পর্যাপ্ত বাড়ে না এবং হ্রদের পানিস্বল্পতার কারণে ছোট ছোট ঘোনাগুলোতে মাছ পৌঁছাতে পারে না। এতে মূল অংশগুলোতে মাছ ছড়িয়ে থাকে। জেলেদের মাছ ধরার সাধারণ জাল ও ছোট ফাঁসের কারেন্ট জালে সেগুলো ধরা পড়ে যায়। তাই মৌসুম শেষের দিকে হ্রদে মাছ থাকে না এবং প্রাকৃতিক প্রজননও উল্লেখজনকভাবে ঘটছে না।

তারা বলছেন, বিশেষত গত দুই-তিন বছর ধরে রাঙ্গামাটিতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের পানি না নামার কারণে হ্রদে পানি বাড়ছে না। আগের বছরগুলোতে বৃষ্টির পানি ও উজানের ঢলের কারণে হ্রদ এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতো। আহরণ মৌসুম শুরু নিয়েই কোনো দুঃশ্চিন্তার কারণ ছিল না।

বিজ্ঞাপন

১৯৫৬ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষে কাপ্তাই বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৬২ সালে বাঁধ নির্মাণ শেষে রাঙ্গামাটির বিশাল এলাকাজুড়ে তৈরি হয় কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ। এই হ্রদই বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর আয়তনের এই হ্রদ বাংলাদেশের পুকুর ধরনের মোট জলাশয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ।

১৯৬১ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষে এ হ্রদ তৈরি করা হলেও এটি রাঙ্গামাটিতে মৎস্য উৎপাদন ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। এ হ্রদের মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন সাড়ে ২২ হাজার জেলে।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন