বিজ্ঞাপন

বর্ষা আর বিধিনিষেধে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুস্থ’ বুড়িগঙ্গা

August 5, 2021 | 3:08 am

রাজনীন ফারজানা, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

ঢাকা: নদী দূষণের কথা আসলে বুড়িগঙ্গার কথা আসবেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে, গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে নদীর স্বাস্থ্য সবচেয়ে ভালো আছে। আর এর পেছনে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান বিধিনিষেধের প্রভাব দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যেসব শিল্প কারখানা নদী দূষণের জন্য দায়ী, বিধিনিষেধের কারণে বর্তমানে সেগুলো বন্ধ থাকায় কিংবা সেগুলোতে উৎপাদন সীমিত থাকায় দূষণ কম হয়েছে। বিধিনিষেধের কারণে নৌপথে কমেছে জন ও যানচলাচল। সে কারণেও কমেছে দূষণ। এছাড়া চলমান বর্ষার প্রভাবও পড়েছে বুড়িগঙ্গায়।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (৪ আগস্ট) বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস), স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণা কার্যক্রম থেকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ‘চলুন দেখি নদীর স্বাস্থ্য’ শীর্ষক এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কার্যক্রমে নদীর পানির দৃশ্যমান উন্নতি বা অবনতির পাশাপাশি এতে থাকা বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ মেপে দেখা হয়।

বর্ষা আর বিধিনিষেধে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুস্থ’ বুড়িগঙ্গা

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা যায়, সার্বিকভাবে তিনটি পৃথক পর্যবেক্ষণে বুড়িগঙ্গা নদীতে গড় পিএইচ-এর মান বাংলাদেশের আদর্শ মানমাত্রার (৬.৫-৮.৫) মধ্যে ছিল। ২০২১-এর পর্যবেক্ষণে সবক’টি স্থানে পানিতে দ্রবীভূত বস্তুকণা (টিডিএস) উপস্থিতি কম দেখা গেলেও পুরাতন বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে এর মান ৬০০ পিপিএম পাওয়া গেছে (আদর্শমান ১০০ পিপিএম), যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে বুড়িগঙ্গার পানিতে ২০১৯ ও ২০২০ সালে পানির ঘোলাত্বের মানও আদর্শ মানের চেয়ে প্রায় ১ থেকে ৩ গুণ বেশি খারাপ ছিল। ২০২১ সালে এসে পানির ঘোলাত্বের মানের বেশ উন্নতি হয়েছে। বুড়িগঙ্গার পানিতে গড় ঘোলাত্বের পরিমাণ এখন প্রতি লিটারে ৫ এনটিইউ, যা আদর্শমানের (১০ এনটিইউ) মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ বুড়িগঙ্গার পানি গত ২ বছরের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি পরিষ্কার হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০১৯ ও ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এসে বুড়িগঙ্গার পানির মান অনেকটা উন্নত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার ক্যাপস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের নেতৃত্বে বুড়িগঙ্গা নদীর বসিলা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু হয়ে পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাট পর্যন্ত এই গবেষণা কার্যক্রম চালানো হয়। কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল।

বসিলা ব্রিজের নিচ থেকে যাত্রা শুরু করে সোয়ারিঘাট পর্যন্ত এলাকার নদীর সাতটি স্থানে পানি পরীক্ষা করে দেখা হয়। এসময় খালি চোখে যেমন পানির ঘোলা ভাব কম দেখা গেছে তেমনি পানিতে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ মাত্রা, দ্রবীভূত অন্যান্য পদার্থ, প্লাস্টিকসহ অন্যান্য পদার্থ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। তবে বসিলা ব্রিজ থেকে যতই পুরান ঢাকার দিকে এগিয়েছে, দূষণের মাত্রা ততই বাড়তে দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

বসিলা ব্রিজ থেকে আশরাফাবাদ পর্যন্ত চারটি স্থানে নদীর পানির দৃশ্যমান ও অন্যান্য উন্নতি চোখে পড়লেও আশরাফাবাদ শেখ জামাল স্কুলের কাছে এসে দেখা যায় তীরের দিকে নদী পানি বেশ দূষিত। সেখানে একটি সুয়ারেজলাইন থেকে আবর্জনা এসে নদীতে পড়তে দেখা যায়। যদিও হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সুয়ারেজলাইন বন্ধ থাকার কথা। অবশ্য যে পাইপ দিয়ে সুয়ারেজবর্জ্য এসে নদীতে পড়ছে তার ঠিক পাশেই সুয়ারেজের একটি মূল স্লুইস গেট বন্ধ থাকতে দেখা যায়।

বর্ষা আর বিধিনিষেধে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুস্থ’ বুড়িগঙ্গা

বিজ্ঞাপন

আশরাফাবাদ পয়েন্ট থেকে কিছু পূর্বে গবেষক দল পানি পরীক্ষা করে দেখতে পায়, সেখানে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতিলিটার পানিতে মাত্র ২ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম, পিএইচ মান ৯। অর্থাৎ পানি ক্ষারীয়। ধারণা করা হয়, বাসা বাড়ি থেকে আসা পানির প্রভাবে সেখানে পানিতে সাবান ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি বেশি ছিল। ওই এলাকায় পানিতে ঘোলাত্ব ও ভাসমান বস্তুকণার উপস্থিতি অনান্য জায়গার চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এভাবে যেখানেই সুয়ারেজলাইন, ড্রেন, আবর্জনার স্তুপ, নৌকা ও অন্যান্য জলযান চলাচল বেশি, সেখানে দূষণের মাত্রাও বেশি দেখা গেছে।

গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, মানুষের শরীরের মতো বুড়িগঙ্গার শরীরে বেশ কিছু টিউমার ও ক্যানসার রয়েছে। নদী দখল হচ্ছে নদীর শরীরের টিউমার, আর ক্যানসারের জীবাণু হচ্ছ সুয়ারেজের ও কলকারখানার বর্জ্য নিষ্কাশনের লাইন দিয়ে প্রবাহিত দূষিত তরল। তরল বর্জ্য দূষণ ক্যানসার মতো করে পুরো নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই নদী দূষণ কমিয়ে একে জল-জীবনের জন্য উপযোগী করে তুলতে দখল-দূষণ বন্ধ করার বিকল্প নাই।

বর্ষা আর বিধিনিষেধে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুস্থ’ বুড়িগঙ্গা

তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারির পাশাপাশি প্রতিবছর বিভিন্ন দূষণের কারণে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। শুধু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তা নয়, দূষণের কারণে মারা যাচ্ছে নদী। তেমনি একটি মৃতপ্রায় নদী বুড়িগঙ্গা। ঢাকার চারপাশে নদীগুলো একসময় ছিল ঢাকা সৌন্দর্যের কেন্দ্রভূমি। কিন্তু বর্তমানে দূষণের ফলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি দূষণ হয়ে উঠছে স্বাস্থ্যহানির অন্যতম কারণ।

এবারের গবেষণা কার্যক্রমে বুড়িগঙ্গার পরিস্থিতি ভালো পাওয়ার বিষয়ে ড. কামরুজ্জামান বলেন, বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই নদীর স্বাস্থ্য কিছুটা ভালো থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিধিনিষেধে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত থাকার বিষয়টি। মানুষজনের চলাচলও কিছুটা সীমিত ছিল। ফলে নদী হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বলা যায়। তাতে করে পানির রঙ অনেকটা ভালো, পানিতে বস্তুকণার পরিমাণও কমেছে, গন্ধও পাওয়া গেছে কম। তারপরও যেসব পয়েন্টে বর্জ্য লাইন এসে মিলিত হয়েছে, সেসব পয়েন্টে কিন্তু নদীর অবস্থা আগের মতোই।

বর্ষা আর বিধিনিষেধে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুস্থ’ বুড়িগঙ্গা

স্টামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) প্রতিবছর শুকনো ও বর্ষা মৌসুমে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার আশপাশে নদীর পানির মান পর্যবেক্ষণ করে। ক্যাপসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২০১৯ সালের ডিসেম্বর ও ২০২০ সালের এপ্রিলের তুলনায় চলতি আগস্টের এই পর্যবেক্ষণে বুড়িগঙ্গার পানির মান ভালো পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০১৯-এর পর্যবেক্ষণে বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের গড় মান ছিল প্রতি লিটারে ১ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম, যা ২০২০ সালে যা ছিল ১ দশমিক ৮ ছিল। দুইটি মানই আদর্শ মানের (লিটারে ৫ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক কম ছিল। এবারে এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ২৬ মিলিগ্রাম। এটি আদর্শ মানের কাছাকাছি। পাশাপাশি আগের দুই বছরের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ ভালো।

বাপার যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, নদী একটি জীবন্ত সত্তা। এর জন্য একজন অভিভাবক রয়েছে, যার নাম জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। কিন্তু নদীর পানি-স্বাস্থ্য দেখার মতো কেউ নেই। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই, ঢাকার চার পাশের পাঁচটি নদী রক্ষা করে ঢাকাকে রক্ষা করুন।

নদী পর্যবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত অভিভাবক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং নদী রক্ষা আইন আরও শক্তিশালী হয়— সরকারের প্রতি সে আহ্বান জানান তিনি।

বর্ষা আর বিধিনিষেধে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুস্থ’ বুড়িগঙ্গা

ক্যাপসের গবেষণা পর্যবেক্ষণ প্রধান আব্দুল্লাহ আল নাঈম বলেন, এ নদীর পানির মান ভালো করার জন্য গবেষকদর ভূমিকা অপরিসীম। নদীর পানির মান ভালো করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এর জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও প্রয়োজন। ক্যাপসের মতো পরিবেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণাগুলো নদীমাতৃক দেশের নদীর পানির আয়তনের কাছে নগণ্য।

ক্যাপসের নদীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম থেকে নদীর জন্য কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে— নদী ও নদীর পার থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে; শিল্প বর্জ্যের জন্য ইটিপি বা সিইটিপি’র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে; ত্রুটিপূর্ণ নৌযান মেরামত ও নৌযানে পয়ঃপ্রণালীর আধুনিকায়ন করতে হবে; নদীতে পৌর বর্জ্য ছাড়ার আগে স্ক্রিনিং পদ্ধতিতে কঠিন বর্জ্য অপসারণ করতে হবে; সুয়ারেজ বর্জ্যের জন্য STP ব্যবহার করতে হবে এবং আরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করতে হবে।

সারাবাংলা/আরএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন