বিজ্ঞাপন

‘জ্ঞান ফিরে যার কাছেই যাই, দেখি সেই মৃত’

August 6, 2021 | 7:34 pm

মো.আশরাফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করসপন্ডেন্ট

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ‘দুই বছরের কোলের বাচ্চার কান্নার শব্দে জ্ঞান ফিরে পেয়েছিলাম। মাটি থেকেই দেখি সবাই আমার মতোই শুয়ে আছে। কয়েকটা শিশু কান্না করছে। আমাকে দাঁড় করানোর জন্য চিৎকার করছি, কিন্তু মনে হচ্ছে আমার কথা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। হাত-পায়ে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। একটু পর কে যেন এসে মাটি থেকে আমাকে তুললো। উঠে দেখি সবাই মৃত। স্বামী, বাবা, নানা-নানি, মামা-মামী, খালা, খালাতো ভাই, চাচাতো বোন, ননদের স্বামী সবাই মারা গেছে।’

বিজ্ঞাপন

এভাবেই বজ্রপাতের ঘটনার বর্ণানা দিচ্ছিলেন বরের বড় বোন ও সেদিনের বরযাত্রী সেলিনা খাতুন। ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে ৪৭ জন বরযাত্রীসহ কনের বাড়িতে বর-বউ আনতে যাচ্ছিলেন তারা। কনের বাড়িতে পৌঁছার আগেই বৃষ্টিতে আটক পড়ে বজ্রপাতে ১৭ জনের প্রাণহানি হয়। বজ্রপাতের ঘটনায় আরও অন্তত ১২ জন বরযাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন।

গত বুধবার (৪ আগস্ট) দুপুরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাঁকা ঘাটে বজ্রপাতে তাদের মৃত্যু হয়। এসময় বরপক্ষের ১৬ জনসহ স্থানীয় এক মাঝি ঘটনাস্থলেই মারা যান। বরপক্ষের মোট ৪৭ জন সদস্য নিয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে কনের বাড়িতে যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে। বরের বাড়ি সদর উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের সূর্যনারায়ণপুর গ্রাম থেকে বরযাত্রী পদ্মা নদী পার হয়ে কনের বাড়িতে যাওয়ার পথে এ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার দিনের বরযাত্রী, নিহতের স্বজন ও প্রতক্ষদর্শীরা জানান, গত সোমবার (২ আগস্ট) শিবগঞ্জের দক্ষিণ পাঁকা গ্রামের হোসেন আলীর মেয়ে সুমি খাতুনের সাথে বিয়ে হয় সদর উপজেলার সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে আল মামুনের। বুধবারসকালে ৪৭ জন আত্মীয়স্বজন নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় রওয়ানা হন বরযাত্রীরা। নৌকাটি দক্ষিণ পাঁকা গ্রামের ঘাটে এসে পৌঁছাতেই শুরু হয় বৃষ্টি। এসময় বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে আশ্রয় নেন ঘাটের ছাউনিতে। সেখানেই হঠাৎ বিকট শব্দে বজ্রপাত ঘটে এবং ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান।

চার ভাই-বোনকে রেখে চলে গেলেন বাবা-মা, দাদা-দাদি

বিজ্ঞাপন

 

বজ্রপাতে কবলে পড়ে বেঁচে ফেরা বরের বোন সেলিনা খাতুন বলেন, ‘বজ্রপাত হওয়ার কিছু সময় পর স্থানীয় লোকজন এসে আমাদের উদ্ধার করে। উঠে স্বামীর কাছে গিয়ে তার মুখ-হাত নাড়াচাড়া করছি, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বাবার কাছে গিয়ে দেখি তিনিও মারা গেছেন। খালার কাছে গেলাম, খালাও বেঁচে নেই। যার কাছেই যাই, দেখি সেই মৃত। যে কয়েকজন জীবিত ছিল, তাদেরকে মেডিকেলে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যেও কয়েকজন এখনও (বৃহস্পতিবার দুপুরে) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।’

বিজ্ঞাপন

সেলিনা খাতুন আরও বলেন, ‘ঘটনাস্থলেই আমার মামা-মামী মারা গেছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তাদের কোলে থাকা ৩ বছরের মেয়ে বেঁচে গেছে। বাচ্চাটি এখনও মেডিকেলে ভর্তি আছে। খালা ও খালাতো ভাই মারা গেলেও, তাদের পরিবারের খালাতো ভাবি বেঁচে গেছেন।’

‘জ্ঞান ফিরে যার কাছেই যাই, দেখি সেই মৃত’

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, বৃষ্টির কবলে পড়ে ছাউনিতে আশ্রয় নেওয়ার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই বজ্রপাত হয়। এসময় একসাথেই সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। যে ছাউনিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তার টিনে আগুন ধরেছিল। স্বামীকে হারালেও দুই বছরের ছেলের জন্যই আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বলেই মনে করেন তিনি।

বজ্রপাতে নিহতরা হলেন- বরের বাবা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের জনতার হাট গ্রামের শরিফুল ইসলাম (৪২), দুলাভাই সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের গোঠাগ্রামের মো. সোহবুল (৩৫), ফুফু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের জৈটকাপাড়া গ্রামের বেলিয়ারা বেগম (৩৪), ফুফা টিপু সুলতান (৪০), নানা নারায়ণপুর ইউনিয়নের মহারাজনগর ডাইলপাড়া গ্রামের মো. তোবজুল (৭০), নানি জমিলা বেগম (৬০), খালা ল্যাতন বেগম (৪৫), খালাতো ভাই মো. বাবলু (২২), মামা মো. সাইদুল (৪০), মামি টকিয়ারা বেগম (৩০) ও মামাতো ভাই মো. বাবু (১৫)।

বজ্রপাতে ১৭ বরযাত্রীর মৃত্যু: এলাকা জুড়ে শোকের মাতম

এছাড়া সূর্য্যনারায়ণপুর গ্রামের মো. কালুর ছেলে মো. আলম (৪৫), মো. মোস্তফার ছেলে মো. পাতু (৪০), বরের চাচাতো ভাই সূর্য্যনারায়ণপুর গ্রামের ধুলু মিয়ার ছেলে মো. সজিব (২২), মো. সাহালাল ওরফে বাবুর স্ত্রী মোসা. মৌসুমী (২৫), সুন্দরপুর গ্রামের সেরাজুল ইসলামের ছেলে আসিকুল ইসলাম (২৪) ও ফেরিঘাটের লোক শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের দক্ষিণপাকা গ্রামের মো. রফিকুলও (৬০) বজ্রপাতে মারা যান।

দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মীয়-স্বজন ও আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিয়েবাড়িতে এখন শোক আর আহাজারি। নিহতের পরিবারের পাশে জেলা প্রশাসন ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

সারাবাংলা/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন