বিজ্ঞাপন

সবার সমানাধিকার নিশ্চিত করতে অভিন্ন পারিবারিক আইন আবশ্যক

August 23, 2021 | 10:24 pm

রোকেয়া সরণি ডেস্ক

একবিংশ শতাব্দীতে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন জরুরি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘সকল নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিতকরণে অভিন্ন পারিবারিক আইন (ইউএফসি) প্রনয়নের লক্ষ্যে’ শিরোনামের এক অনলাইন সভায় এই দাবি উঠে আসে। তারা বলেন, ধর্ম ও পারিবারিক শিক্ষার কারণে নারীরা এখনো পরিবার ও সমাজে পুরুষদের আধিপত্য মেনে নেয় ও সম্পত্তির অধিকারে নিজ দাবি ছেড়ে দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবার সমানাধিকার নিশ্চিতে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন আবশ্যক। 

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২৩ আগস্ট ২০২১) বিকাল ৩:৩০ অনুষ্ঠিত ওই অনলাইন সভায় তরুণ প্রজন্মের সাথে মতবিনিময় করা হয়। সম্পত্তির সমঅধিকারে ধর্মীয় রাজনীতি বৃহৎ ভূমিকা পালন করছে বলে সভায় বলা হয়। বক্তারা অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নে বিরোধীদের সচেতন ও রাজি করতে তরুণসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।  

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য বাসুদেব ধর, বাংলাদেশ খৃস্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও এবং মহিলা ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি মধুমিতা বড়ুয়া।

বিজ্ঞাপন

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন, ব্যারিস্টার এ. কে. এম. রাশেদুল হক, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; কাজী রোকসানা রুমা, সাংস্কৃতিক কর্মী; অ্যাড. অমিত দাশ গুপ্ত, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ডেপুটি এ্যাটনী জেনারেল, বাংলাদেশ; অ্যাড. কাকলী মৃধা, হিন্দু বিবাহ রেজিস্টার; . জগন্নাথ বড়–য়া, অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়; মিনু চিং মারমা, মানবাধিকার কর্মী; অ্যাড. সাবিনা শিপ্রা, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও পুলক বিশ্বাস, তরুণ ব্যবসায়ী এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবরিনা, নূর-ই তানিয়া, আদিবাসী তরুণী কৃষ্ণা প্রিয়া মূর্মূ, শিক্ষার্থী ধ্রুবজ্যোতি মোহান্ত।

মতবিনিময় সভায় বলা হয়, ৭২ এর সংবিধানের মূল লক্ষ্য ছিলো মানুষের সমঅধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। পারিবারিক আইনগুলো পর্যালোচনা করে একটি সমতাপূর্ণ আইন প্রণয়ন হলে সংবিধানের মূল লক্ষ্য পূরণ হবে। নারীদের সম্পদের অধিকারে বৈষম্য থাকার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। নারীর ক্ষমতায়ন করতে হলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই বৈষম্য দূর করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সভায় উপস্থিত বক্তারা এসময় বলেন, সম্পত্তির সমঅধিকারে ধর্মীয় রাজনীতি একটা বৃহৎ ভূমিকা পালন করছে। ১০০ বছরের পুরানো এই আইন সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। এসময় বক্তারা বিভিন্ন আইনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন ব্রিটিশ শাসনামলে ও অভিন্ন পারিবারিক আইন পরিবর্তন এসেছে। হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কার হয়ে বিবাহ আইন, সতীদাহ প্রথা রদ আইন বাল্যবিবাহ বন্ধ আইন হয়েছে। পাকিস্তান আমলে মুসলিম পারিবারিক আইনে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও বৌদ্ধদের জন্য আলাদা পারিবারিক আইন নেই। হিন্দু পারিবারিক আইন দ্বারা বৌদ্ধসমাজের পরিচালিত হলেও বৌদ্ধ নারীরা কোন অধিকার পায় না। মারমা নারীদের এখনও সম্পত্তিতে কোনো অধিকার নেই। বান্দরবান জেলার নারীরা সম্পদের চার ভাগের এক ভাগ পায়। আদিবাসী নারীদের অধিকার অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন হলে সকল শ্রেনীর সকল ধর্মের নারীদের অধিকার সংরক্ষিত হবে। অনগ্রসরতা থেকে নারীদের মুক্তি দিতে পারে। 

স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আমাদের দেশে সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হলেও তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তৃণমূলে বিভিন্ন সময়ে নারীর মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে যেয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দেখেছে যে, নারীর প্রতি সহিংসতার পেছনে বৈষম্য মূলক পারিবারিক আইন একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম বলেন, আইন প্রণয়নের পথে প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতি, সংস্কৃতির যে বাধা আছে তা নিরসনে কাজ করলেও এখনো অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নে বাধা আছে। ১৯৯৩ সাল থেকে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ (বিজ্ঞ আইনজীবি, বুদ্ধিজীবী) সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মী সংগঠকদের সাথে মতবিনিময় সভা করে অভিন্ন পারিবারিক আইনের প্রস্তাবনা পূর্ণাঙ্গ করে প্রকাশ করে। এই অভিন্ন পারিবারিক আইনের প্রস্তাবনা বিভিন্ন সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আইন কমিশনে জমা দিয়ে এই প্রস্তাবনা আইনে পরিণত করার জন্য অ্যাডভোকেসি ও লবি করে যাচ্ছে।

সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য বাসুদেব ধর বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী হিন্দু নারীদের সমঅধিকার দিতে চাইলেও হিন্দু গোষ্ঠীর অনেকে তাতে আগ্রহী নয়। এটি নিরসনে তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ খৃস্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নারীরা পারিবারিক আইন অনুসারে বেশ সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন পারিবারিক আইনে কিছু বৈষম্য আছে। তবে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণীত হলে সকলের জন্য সহায়ক হবে ও সকল ধর্মের গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় থাকবে। আইন প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের সাথে, ধর্মীয় নেতাদের সাথে, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মতবিনিময় সভা অব্যাহত রাখতে হবে।

মহিলা ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি মধুমিতা বড়ুয়া বলেন, বৌদ্ধদের জন্য কোন আলাদা পারিবারিক আইন নেই। সম্প্রদায়ের অনেকে পারিবারিক আইন প্রণয়নে বিরোধিতা করছে। তৃণমূলের বৌদ্ধ নারীরা অনেক বৈষম্যের শিকার, বঞ্চিত ও লাঞ্চিত যা প্রকাশ পায় না। এমতাবস্থায় অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন হলে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সমতা আসবে।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, 'নারীকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পদ-সম্পত্তির সমঅধিকারের কোন বিকল্প নেই। পরিবার একটি প্রতিষ্ঠান, এখানে সকলের সবকিছুতে সমান অধিকার থাকতে হবে। মহিলা পরিষদ অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্পত্তি, বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, দত্তক, সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণভোষণ ইস্যুতে নারীদের সমান অধিকার দেওয়ার পক্ষে রষ্ট্রের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। এখানে রাষ্ট্রেরও দায় আছে। কাঠামোগত বাধার কারণে সরকার এই আইন প্রণয়নে অগ্রসর হতে পারছে না।' অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের দাবি প্রণয়নে তিনি সকল সম্প্রদায়কে ও তরুণ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

উক্ত অনলাইন মতবিনিময় সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিসহ উপস্থিত ছিলেন ৯৬ জন। অনলাইন মতবিনিময় সভাটি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ফেসবুক পেজ-এ লাইভ সম্প্রচার করা হয়। সভা সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রোগ্রাম অফিসার (কাউন্সেলিং) সাবিকুন নাহার।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন