বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে

September 2, 2021 | 11:21 pm

সারাবাংলা ডেস্ক

ঢাকা: অপপ্রয়োগের ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অপরাধ দমনে ভূমিকা না রেখে উল্টো মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন: নারীর মানবাধিকার’ শীর্ষক অনলাইন মতবিনিময় সভায় বক্তারা একথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) ভার্চুয়াল এ সভায় বক্তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা দূর করার তাগিদ দেন। তারা বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধসহ সকল অপরাধ দমন করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে আইন প্রয়োগকারীদের সচেতন হতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। আইনের সঙ্গে আইনি অবকাঠামো জেলা ও থানাগুলোতে স্থাপন করতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। গেস্ট অফ অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাননীয় চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি, সাংবাদিক, এবং লেখক শাহরিয়ার কবির, গাজী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা এবং আইন ও বিচার বিভাগের (আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়) উপসচিব (জেলা জজ) বেগম মাকসুদা পারভীন।

বিজ্ঞাপন

স্বাগত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল সেক্টরে এগিয়ে গেছে। ভার্চুয়াল বিশ্ব আজ বাস্তব জগতের প্রতিচ্ছবি। এখানেও নারী পুরুষের বৈষম্য আছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার দুনিয়ায় নারীরা নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তাদের প্রতি নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার জানান, বাংলাদেশকে ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ক কোনো আইন আইন ২০১৮-এর আগে হয়নি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সালে প্রণয়ন করা হয় কিন্তু ২০২১-এ এসে আইনটি অপরাধ দমনে বিস্তৃত ভূমিকা রাখছে না, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আইনের অপপ্রয়োগ মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু আইন প্রয়োগের দিকে নজর দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধসহ সকল অপরাধ দমন করতে হলে আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে আইন প্রয়োগকারীদের সচেতন হতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। অনলাইনে অপপ্রচার, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের জিম্মি অবস্থা দূর করতে ফেসবুক ও ইউটিবসহ সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগের বিপন্ন অবস্থা থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, নিয়ম বহির্ভূত বিষয়গুলোর প্রচার বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের আইন থাকলেও এদেশে নাই।

এসময় তিনি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইনের সংশোধনে পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম নারীদের প্রতি অবমাননাকর আচরণ বন্ধে মানবাধিকার কমিশন থেকে গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নারীর প্রতি চলমান সাইবার অপরাধ, সাইবার বুলিং বন্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহারের কিছু টুল ব্যবহার করে এর সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে

বিজ্ঞাপন

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি, সাংবাদিক, এবং লেখক শাহরিয়ার কবির বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতামূলক, অশ্লীল, কদর্যমূলক বক্তব্য দেওয়ার পর ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুসারে কাউকে গ্রেফতার করতে দেখা যায়নি।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন এখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষানীতি প্রণয়ন হলো না, কেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এখনো নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়নি। এখনো ফতোয়া বৈধ হয়ে আছে।

এসময় তিনি সাম্প্রতিক সংঘটিত সাম্প্রদায়িক ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, মৌলবাদীতা, সাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং নারীবিদ্বেষী মনোভাব এখনও প্রশাসনের গভীরে আছে।

গাজী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপ্রয়োগ হচ্ছে। যে কোনো ঘটনায় যদি নারী যুক্ত থাকেন তাতে প্রত্যেকের নেতিবাচক মনোভাবের দৃঢ় উপস্থিতি দেখা যায়। ডিজিটাল মাধ্যমে সবচেয়ে ভুক্তভোগী হলেন নারী। সবকিছু মিলিয়ে এই ৫০ বছরে মানবিকতার অবক্ষয়, নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব, উদারতার অবক্ষয় চরমভাবে ঘটেছে।

আইন ও বিচার বিভাগের (আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়) উপসচিব (জেলা জজ) বেগম মাকসুদা পারভীন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নানা ধারা উপধারার উল্লেখ করে বলেন, নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা বেড়ে গেছে। তিনি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের একটি জরিপের উল্লেখ করে বলেন, ৫৩ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে সাইবার সহিংসতার শিকার। বাংলাদেশে মোট ৮টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, যে কোনো চলমান পরিস্থিতিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার দায় থাকে সংগঠনের। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সামাজিক নিরাপত্তার কাজে লাগাতে হবে। সমাজ নারীর কথা বলছে কিন্তু নারীর উন্নয়ন ও অধিকারকে মূল্যায়ন করে না।

সভায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রেখা চৌধুরী। তিনি সংশোধিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নানা দিক উল্লেখ করে বলেন, আইনটি প্রণয়ন করার সময় আইন মন্ত্রণালয় থেকে আইনটির মাধ্যমে কাউকে অযথা হয়রানি করা হবে না বলে আশ্বস্ত করা হলেও এই আইনে মামলার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাড়ছে। দেশের প্রায় ১১ কোটিরও বেশি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে (সূত্র: কালের কণ্ঠ ৭মে ২০২১)। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী।

সাইবার দুনিয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতার নানা ঘটনা ও পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী, শিশু, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকল জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে এবং মানবাধিকার রক্ষায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধের মাধ্যমে সংবিধানে প্রদত্ত বাক ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারের সুরক্ষা, মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সহযোগী সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ওয়াইডব্লিউসিএ, আওয়াজ ফাউন্ডেশন, অ্যাসিড সার্ভাইবার ফাউন্ডেশন, এডাব, ব্রাক, টার্নিং পয়েন্ট এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি, এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক, সংগঠনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক জনা গোস্বামী।

সারাবাংলা/আরএফ/আইই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন