বিজ্ঞাপন

ওপারে ভালো থেকো সালমান

September 6, 2021 | 4:49 pm

উজ্জল জিসান

দিনটি ছিল শুক্রবার। তারিখ ছিল ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। এখন গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে টেলিভিশন থাকলেও তখন হাতেগোনা কয়েক বাড়িতে ছিল। তাও আবার সাদাকালো। বড় চাচাতো ভাই বিয়েতে টিভি পেয়েছিলেন। সেই টিভিটাই আমরা দেখতাম। সকালে বিকেলে রাতে যখন ইচ্ছে করে। শুক্রবার সকালে 'মনের মুকুরে', বিকেলে বাংলা সিনেমা আর রাতে ‘আলিফ লায়লা।’

বিজ্ঞাপন

সেদিন সকালে টিভি দেখতে যাইনি প্রাইভেট থাকায়। বিকেলে টিভিতে দেখাচ্ছিল ‘আলোর মিছিল' ছবিটি। 'এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে' সেই গানের ছবি। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য গণিতের স্যার শুক্রবারও পড়াতে এসেছেন। পড়তাম বন্ধু আউয়ালের বাড়িতে গিয়ে। পড়ে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এরপর খাওয়া দাওয়া করে 'আলিফ লায়লা' দেখার জন্য সেই ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির।

অনেক লোক টিভি দেখতে আসে তাই আঙিনাতেই টিভি বের করে দিতেন তিনি। আবার বসারও ব্যবস্থা করতেন। ‘আলিফ লায়লা’ শুরু হবে রাত ৮টার বাংলা খবরের পর। কিন্তু আমরা আগেই গিয়েছি। মোজারুল হক ছিল আমার বন্ধু। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাস করেছিলেন। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তিও হন তবে পাস না করায় সংসার জীবন শুরু করে। সবশেষ ক্যান্সারের কাছে হার মেনে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন ২০১২ সালে।

বিজ্ঞাপন

যে কারণে মোজারুলের কথা বলা। রাত ৮টার বাংলা সংবাদের ঠিক আগ মুহূর্তে সে আমাকে বলে, সালমান শাহ মারা গেছে। তোর নাকি প্রিয় নায়ক। আজ শেষ সে। আমি কোনো বুঝে ওঠার আগেই তাকে একটা থাপ্পর মেরে বসি। কী বলিস এসব। সালমান শাহ মারা যাবে কেন? ও অনেক মন খারাপ করে বলে, দেখ টিভির খবরে দেখাবে এখন।

তার কথা শেষ হতে না হতেই খবরের শিরোনাম শুরু হলো। শুরুতেই চিত্রনায়ক সালমানের মৃত্যুর খবর। মুহূর্তেই যেন আকাশটা ভেঙে পড়লো মাথায়। চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে গেল। কাকে কীভাবে বলব যে সালমান মরতে পারে না। এসব মিথ্যা কথা। যেন বোবা হয়ে গেলাম। এটা কী হলো তাও আবার আত্মহত্যা। এটি হতে পারে না। তাকে নিশ্চয়ই কেউ হত্যা করেছে। ‘আলিফ লায়লা’ দেখবো কী! সবার মুখে শুধু সালমান মৃত্যুর কথা।

বিজ্ঞাপন

রাতে ঘুমও হলো না ঠিকমতো। সকালে উঠে স্কুলে গেলাম। সবার মুখে সালমানের মৃত্যুর কথা। কারও হাতে ম্যাগাজিন, কারও হাতে পত্রিকা আবার কারও হাতে বিশেষ সংখ্যা। সবাই পড়ছে কীভাবে কী হয়ে গেলো। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এমনকি চানাচুর ঝালমুড়িওয়ালাও সালমানের মৃত্যু নিয়ে কথা বলেছে। সবার চোখে মুখেই ভালোবাসার আবেগ দেখতে পেয়েছি। তার জন্য সারাদেশে ১১ জন তরুণ-তরুণী জীবন দিয়েছে। কতটাই জনপ্রিয় ছিল সালমান।

৬ সেপ্টেম্বর দিনটি আজও বেদনার মত ফিরে আসে। এদিন ভোলার মতো নয়। কেমন জানি আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। তার প্রতি কেন এত এত টান। কেন তার জন্য হৃদয় কাঁদে। কেন তার জন্য চোখের কোণে জল জমা হয়। সারাবছর গান শুনি তার তবুও কেন এই দিনটিতে এখনও আবেগে ভেসে যাই।

বিজ্ঞাপন

তখনকার দিনে এত এত মিডিয়া ছিল না। ছিল না বেসরকারি কোনো টেলিভিশন। ছিল না প্রথম আলো, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ বা বাংলাদেশ প্রতিদিন। আমার বিশ্বাস আজকের দিনে সালমানের কিছু হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রকৃত দোষীরা আইনের আওতায় আসত। কিন্তু সালমান তোমার কপাল খারাপ। হত্যাকারীরা আড়ালেই থেকে গেল। ওপারে ভালো থেকো সালমান।

লেখক: সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/ইউজে/এজেডএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন