বিজ্ঞাপন

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপনে যে পরামর্শ দিলো কারিগরি কমিটি

September 13, 2021 | 11:59 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বিমানবন্দরে প্রবাসী ও বিদেশগামীদের নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় র‌্যাপিড পিসিআর ল্যাব স্থাপনের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে। ল্যাব স্থাপনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কোভিড-১৯ পরীক্ষা সম্পর্কিত কারিগরি কমিটির সভা শেষে পরামর্শগুলো জানানো হয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে।

বিজ্ঞাপন

কারিগরি কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ডিএমএফআর মলিকুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে প্রাথমিকভাবে নমুনা পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে বলা হলেও কারিগরি কমিটির বৈঠকে ২৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্র বিবেচনা করে সেগুলোর তালিকাও পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। তবে এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তাদের আবেদনপত্রে থাকা শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সুপারিশের বিষয়ে জানানো হয়েছে। বাকি ১৬টি প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্রে অপ্রতুল তথ্য ও আনুষাঙ্গিক কাগজপত্র না থাকার বিষয়ে জানানো হয়েছে।

কারিগরি কমিটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে পরামর্শ ও ল্যাবের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এখন তারা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

বিজ্ঞাপন

কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, ডিএমএফআর মলিকুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কর্তৃপক্ষ একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য তাদের দুই হাজার ৭৭০ টাকা প্রস্তাবনা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা তিন ঘণ্টার মধ্যে নমুনা সংগ্রহ করে রিপোর্ট দিতে পারবে বলে জানিয়েছে। ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নমুনা পরীক্ষার জন্য দুই হাজার টাকার প্রস্তাবনা করেছে। তবে তারা কতক্ষণ সময়ে নমুনা পরীক্ষা করাবে, সে বিষয়ে আবেদনপত্রে কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, এএমজেড হাসপাতাল লিমিটেড পাঁচ থেকে ১৩ মিনিটে নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতার কথা জানিয়েছে। প্রেসক্রিপশন পয়েন্টের বাড্ডা শাখা, সিএসবিএফ, স্টেমজ হেলথ কেয়ার (বিডি) লিমিটেড ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করতে পারবে বলে জানিয়েছে আবেদনপত্রে। এগুলো ছাড়া আরও ১৭টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। তাদের বিষয়েও জানানো হয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। এখন সেখান থেকে সংশ্লিষ্টরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

বিমানবন্দরে পিসিআর ল্যাব স্থাপনে যে পরামর্শ দিলো কারিগরি কমিটি

বিজ্ঞাপন

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কারিগরি কমিটির বৈঠকে ল্যাব স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ল্যাবের গুণগত মান, নমুনা পরীক্ষা সক্ষমতা, রিপোর্টিং সিস্টেম বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তালিকা থেকে প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে এক বা একাধিক ল্যাবকে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

কারিগরি কমিটি যেসব পরামর্শগুলো

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কোভিড-১৯ পরীক্ষা সম্পর্কিত কারিগরি কমিটির সভা শেষে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১- বেশিসংখ্যক নমুনা সীমিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করার বিষয়ে জানানো হয়েছে। এক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহের পরে রিয়েল টাইম আরটি পিসিআরের মাধ্যমে আনুমানিক তিন ঘণ্টায় এককালীন ৯৪ টেস্ট প্রতি মেশিনে পরীক্ষা করার সক্ষমতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০টি মেশিনের সাহায্যে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।

২- নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাকআপ টেস্ট পদ্ধতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যদি কোনো ক্ষেত্রে রিয়েল টাইম আরটি পিসিআরে সুস্পষ্ট রিপোর্ট না আসে, তাহলে সময় স্বল্পতার কথা বিবেচনা করে টেস্ট পয়েন্ট অব কেয়ার মলিউকুলার ডিটেকশন সিস্টেম ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।

৩- ল্যাবের গুণগত মান নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি বুথের ক্ষেত্রে কুল বক্স থাকতে হবে। নমুনা এক্সট্রাকশন কক্ষে বায়োসেফটি কেবিনেট, ডিপ ফ্রিজারসহ দুই থেকে ৮ ডিগ্রি রেফ্রিজারেটর, অটো এক্সট্রাকশন মেশিন ও ভরটেক্স মেশিন থাকতে হবে।

৪- নমুনা পরীক্ষার জন্য মাস্টার মিক্স কক্ষে পিসিআর কেবিনেট বা ল্যামিনার ফ্লো, মিনি সেন্ট্রিফিউজ ও মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ফ্রিজ থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

৫- টেমপ্লেট এডিশন ও পিসিআর মেশিন কক্ষে বায়োসেফটি কেবিনেট এবং পিসিআর মেশিনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক অনলাইন ইউপিএস রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

৬- ল্যাবে ডোনিং, ডোফিং, পর্যাপ্ত পরিমাণ পিপিই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বায়োহ্যাজার্ড ব্যাগ, অটোক্ল্যাভ মেশিন, ওয়াশিং ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও প্রয়োজনীয় বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

৭- প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ল্যাবে প্রতিদিন দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ জন যাত্রী নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজন হবে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা মধ্যে ৮০০ জন যাত্রীর নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট জানানোর সক্ষমতা থাকতে হবে ল্যাবে।

৮- প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্ট এন্ট্রিও দিতে হবে, যা কিউআর কোড স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে যাচাই করা যাবে।

৯- সংযুক্ত আরব আমিরাত গমনকারী যাত্রীদের বিদেশ ভ্রমণের জন্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরে বিমানে ওঠার দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে নমুনা পরীক্ষা ও দ্রুততম সময়ে ফলাফল দিতে হবে। এক্ষেত্রে সুপারিশ করা তালিকা থেকে এক বা একাধিক ল্যাবকে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

১০- যাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য বিধি মেনে প্রবেশ, নমুনা প্রদান, অপেক্ষা, রিপোর্ট গ্রহণ ও বহির্গমনের সঠিক ব্যবস্থাপনা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও যাত্রীদের হাত ধোয়া এবং ওয়াশ রুমের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে কারিগরি কমিটির পক্ষ থেকে।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

কবে নাগাদ প্রবাসী ও বিদেশগামীদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপনের কাজ শুরু হতে পারে— এমন প্রশ্নের উত্তরে কারিগরি কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কমিটির বৈঠক থেকে পরামর্শ পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবে।

এ বিষয়ে জানতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া পাওয়া যায়নি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী ইমরান আহমেদের কাছ থেকেও।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের এক নির্দেশনায় বলা হয়, বিমানবন্দরে র‌্যাপিড পিসিআর টেস্টের ব্যবস্থা না থাকলে পাঁচটি দেশের নাগরিক আরব আমিরাতে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই পাঁচ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। আমিরাত সরকারের এই নির্দেশনায় বিপাকে পড়েন দেশটি থেকে বাংলাদেশে ছুটি কাটাতে আসা প্রবাসীরা। পরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেয় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

১ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই মেশিন স্থাপনের জন্য দু’টি কমিটি করে দেওয়া হয়। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, দুয়েকদিনের মধ্যে জাতীয় পত্রিকায় ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। যারা আবেদন করবেন, তাদের মধ্যে থেকে সক্ষমতা যাচাই করে কাউকে অনুমোদন দেওয়া হবে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, পত্রিকায় ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ আহ্বান না করেই ডিএমএফআর ল্যাবকে র‌্যাপিড পিসিআর মেশিন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আরও কিছু অসঙ্গতিও ছিল। বিষয়টি নিয়ে সারাবাংলা ডটনেটে “বিমানবন্দরে র‍্যাপিড পিসিআর মেশিন বসবে ‘বেসরকারিভাবে’” এবং ‘বিমানবন্দরে পিসিআর পরীক্ষার দায়িত্ব একটি ল্যাবকে দেওয়ার পাঁয়তারা’ শিরোনামে দুইটি প্রতিবেদনও ছাপা হয়।

পরবর্তী সময়ে আরও অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিএমএফআর মলিউকুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস লিমিটেডের পক্ষ থেকে যে আবেদনপত্রগুলো জমা দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ। কারিগরি কমিটির বৈঠকেও প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা এসব অসঙ্গতির বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন