বিজ্ঞাপন

পুলিশে আত্মহত্যা বন্ধে পদক্ষেপ জরুরি

September 19, 2021 | 5:08 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার ঘটনা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত তিন বছরে ১৮ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া বেশিরভাগ সদস্যই পারিবারিক কলহের জেরে এ পথে গিয়েছেন। সবশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর র‌্যাব সদর দফতরে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল শুভ মল্ল নিজের অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলিতে আত্মহত্যা করেছেন। তার আগে গত ৬ আগস্ট দুপুরে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী মারুফ হোসেন সরদারের বেইলী রোডের সরকারি বাংলোতে কনস্টেবল মেহেদী হাসান ডিউটিরত অবস্থায় মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। আর গত ২১ জুলাই ঈদের দিন (ঈদুল আজহা) ভোরে আত্মহত্যা করেন মেহেরপুরের মুজিবনগর রতনপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত সাইফুল ইসলাম। এর কয়েকদিন আগে ১৫ জুলাই রাঙ্গামাটি পুলিশ লাইন্সে নিজের অস্ত্র মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন কাইয়ুম সরকার।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যায় সহকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। রাষ্ট্র নিয়ে যারা চিন্তা করেন তারাও পুলিশের আত্মহত্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন। যারা জনগণের নিরাপত্তা দেন তারাই যদি মানসিক চাপে থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি শঙ্কায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা বন্ধে এখনই কাজ করতে হবে।

আত্মহত্যা করা পুলিশ সদস্যদের সহকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চাকরি পাওয়ার পর খোলা আকাশের নীচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করা, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বডিগার্ড, মালি এমনকি বাবুর্চি হয়ে কারও কারও জীবন কাটাতে হয়। আত্মহত্যা করা বেশিরভাগ কনস্টেবলের এ প্রবণতার অন্যতম কারন হলো ছুটি না পাওয়া। পরিবারের সঙ্গে এ নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়। আর এ থেকে পারিবারিক কলহ, সংসার ভেঙ্গে যাওয়া এবং চুড়ান্ত পর্যায়ে মানসিক চাপ তৈরি হওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

সার্ভিসে থাকা বেশ কয়েকজন সেনাবাহিনীর সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরে তারা দুই মাসের ছুটি পেয়ে থাকেন। সেনাবাহিনীতে একটি নিয়ম আছে, এই ছুটি হচ্ছে- বিশ্রাম নেওয়া। পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো। যাতে কোনো ধরণের মানসিক চাপ তৈরি না হয়। ছুটি থেকে ফিরে কর্মস্থলে চনমনে থাকাটাই হয় প্রত্যাশিত।

অথচ পুলিশে অলিখিত নিয়ম যেন ছুটি না পাওয়ার। দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয় তাই ছুটি দেওয়া হবে না; জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে গেছে তাই ঈদের ছুটি বন্ধ। চুরি ছিনতাই বেড়ে গেছে তাই টহল বাড়াতে হবে এজন্য সবার ছুটি বাতিল। সামনে জাতীয় নির্বাচন তাই ছুটিতে যাওয়া নিষেধ। সবশেষ যোগ হয়েছে, করোনার কারনে সবার ছুটি বাতিল করেছে উর্ধ্তন কর্তৃপক্ষ। নানা কারনে পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়। অন্যদিকে ছুটি না কাটালে বিপরীতে বাড়তি টাকাও মেলে না। এ কারণে নানাদিক থেকে মানসিক চাপ তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

আবার ছুটি চাইতে গিয়ে একজন থেকে আরেকজনের টেবিলে অনুমতির জন্য ঘুরতে হয়। এক কর্মকর্তা থেকে আরেক কর্মকর্তার কাছে যেতে হয়। একেকজন গালমন্দসহ নানা কথা শোনান। পুলিশে তিন বছর পর পর ‘রেস্ট এন্ড রিক্রিয়েশন লিভ’ নামে ১৫ দিনের একটি ছুটি কাটানোর বিধান আছে। সেটিও ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হয় না। এ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে পুলিশ সদস্যদের মনে।

ছুটির বিষয়টি শুধু পুলিশের অধস্তনদেরই সমস্যা তা কিন্তু নয়। বরং উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছুটি খুব একটা পান না। তবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কর্মক্ষেত্রেই নানাভাবে বিশ্রাম নিয়ে থাকেন। তাদের জবাবদিহিতা অনেকটা কম। বেতন এবং কাজের তুলনায় উর্ধ্তনরা অনেকটা বেশি সুবিধা পেয়ে থাকেন। তারা পরিবার নিয়ে থাকতে পারেন। যেখানে পুলিশ কনস্টেবলদের বেশিরভাগই পরিবার ছাড়া থাকতে হয়। আবার যেখানে থাকেন, থানা কম্পাউন্ড বা ব্যারাক সেখানকার পরিবেশও তেমন একটা উন্নত না। তবে নতুন নতুন থানা কমপ্লেক্স গড়ে ওঠায় আবাসন ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানকারী পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা বন্ধে পুলিশ বাহিনীর কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলে মনে করছি। থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে পরিবার নিয়ে থাকতে পারেন এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ব্যাচেলর থাকলেও থাকা ও খাওয়ার উন্নত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পর্যাপ্ত খেলাধুলাসহ বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিবাহিত ও অবিবাহিতদের আলাদা আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ছুটি কাটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতার সময়ে পাশে থাকা ও রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুলিশ সদস্যদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য জেলায় জেলায় পুলিশ হাসপাতালের শাখা খুলতে হবে। অধস্তন সদস্যদের বেতন যেহেতু কম সেজন্য নিয়মিত রেশন, ভাতা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বেতনের টাকা যেন ‘ভবিষ্য তহবিল’ ছাড়া আর কোনো খাতে কাটা না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে।

ছুটি কাটানো যে কোনো চাকুরিজীবীরই অধিকার। যে কোনো অবস্থাতেই ছুটি কাটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের বেতন কম তাদের পর্যাপ্ত ভাতার ব্যবস্থা করা জরুরি। মানসিক চাপ কমাতে বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা রাখাও জরুরি। সাবেক পুলিশ সদস্যদের অনেকের মতে, পর্যাপ্ত ছুটি ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশ সদস্যদের এই আত্মহত্যার হার মোটামুটি শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/ইউজে/এসবিডিই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন