বিজ্ঞাপন

ডিমেনশিয়া জানুন, আলঝেইমার্স চিনুন!

September 21, 2021 | 10:20 pm

তাওহিদা জাহান

‘ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে,
উড়াও নীরবে নিভৃত রুমালখানা
পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে
আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা’– রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

বিজ্ঞাপন

মানুষ মাত্রই স্মৃতিকাতর। যেন জীবনের সুন্দরতম স্মৃতিগুলো নিয়েই মানুষ বাঁচে আর আনমনে হাসে। একবার ভাবুন তো সেই স্মৃতি যদি একদিন আচমকা হারিয়ে যায়, চিরচেনা বাড়ি ফেরার পথ যদি কোনদিন অচেনা লাগে তখন জীবন কেমন হবে? আমাদের পক্ষে হয়ত সেই অনুভূতি বোঝা সম্ভব নয়। তবে আমাদের মনের ঘরে জমা স্মৃতির দরজা কখনো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া। ডিমেনশিয়া মস্তিষ্কের এক ধরনের রোগ যা মানুষের মস্তিস্কের কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। এ রোগে স্নায়ুকোষ, তথ্যবাহী স্নায়ুতন্তু ও স্নায়ুসংযোগ নষ্ট হয়ে যায়। মস্তিস্কের যেসব স্থানে স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে সেগুলিই প্রধানত আক্রান্ত হয় এই রোগে। এর ফলে রোগী কিছু মনে রাখতে না পারেন না।

স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কের এক ধরনের রোগ যা আলঝেইমার নামেও পরিচিত। তবে আলঝেইমার্স ও ডিমেনশিয়া রোগের মধ্যে বয়সভেদে পার্থক্য রয়েছে। ডিমেনশিয়ার কারণে যেকোন বয়সেই স্মৃতি হারিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে আলঝেইমার্স রোগের সাথে বয়স বাড়ার একটি সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত ৬৫ বছর ও এর পর থেকেই এই রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। কিন্তু ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স উভয় রোগের ক্ষেত্রেই স্মৃতি হারিয়ে যায় বলে প্রায়শই এই দুটি অভিধা এক সাথে আলোচনা করা হয়। সেই দিক থেকে সেপ্টেম্বর মাসকে ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স সচেতনতা মাস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও ২১ সেপ্টেম্বর আলঝেইমার্স দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, বাংলাদেশ আলঝেইমার্স সোসাইটি ও জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস লি. একসাথে ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স বিষয়ে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগের ভয়াবহতা দিনে দিনে বাড়ছে। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ যা আগামী ২০৩০ সালে বেড়ে নয় লাখ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ আলঝেইমার সোসাইটির হিসেব অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২২ লাখ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে-যা ভাবনার উদ্রেক করেছে। বাংলাদেশে ষাট বছরের বেশি বয়সের বয়সের মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ৪০-৫০ বছরে বয়সের মধ্যেও অনেককে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। নিম্নবিত্তের পাশাপাশি উচ্চবিত্তের মানুষেরাও রোগটিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে যারা দারিদ্রসীমার নীচে আছেন তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হল, ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স রোগের তেমন কোন চিকিৎসা নেই। তবে সচেতন হলে স্মৃতিভ্রংশ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, শরীর ভালো থাকলে তবেই মস্তিষ্ক সুস্থ থাকবে । তাই সুস্থতার জন্য সুষম খাবার খাওয়া ও নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। খাদ্যাভ্যাসের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক। অতিরিক্ত খাওয়া অথবা প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া স্মৃতি নষ্টের কারণ হতে পারে। তাই খাদ্য তালিকা সুষম খাবার রাখতে হবে। মস্তিষ্ক কর্মক্ষম রাখার জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও প্রয়োজন। আমাদের তাই মনের যত্ন নিতে হবে। জীবনের সকল সময় সুসময় হয় না। সেটি মনে ও মেনে নিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কোনভাবেই হতাশ হওয়া যাবে না। নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নেওয়া যাবে না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে একাকীত্ব ও হতাশায় ভুগলে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে স্মৃতি হারানোর প্রবণতা বেশি।

বিজ্ঞাপন

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ, নিয়মিত ঘুম না হলে মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পায় না। দীর্ঘদিন ধরে যারা অনিদ্রায় ভুগছেন, তাদের মধ্যে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অতীতে পরিবারের কারোর স্মৃতি হারানোর ইতিহাস থাকলে অনেক সময় এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য যাদের পরিবারে এ ধরনের ইতিহাস রয়েছে, মস্তিষ্কে চাপ পড়ে এমন কোনও কাজ থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে।

গবেষকগণ সম্প্রতি বয়স্কদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখেছেন যে, যারা প্রাকৃতিক দূষণের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকেছেন তাদের মধ্যে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার হার বেশি। তাই স্মৃতিশক্তি বাঁচাতে আমাদের চারপাশের পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। রাস্তাঘাটে দূষিত বায়ুর থেকে মুক্ত থাকতে অবশ্যই মাস্ক পড়তে হবে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের যেকোন বয়সেই আমরা স্মৃতিভ্রংশ হতে পারি। তাই মনে রাখার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা অনুভূত হলে অবশ্যই তা গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। আমরা শুরুর দিকে নিজেরাই মনে রাখার অনুশীলন করতে পারি। মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ানোর কিছু পদ্ধতি রয়েছে। জার্মান স্নায়ুবিজ্ঞানী বরিস কনরাড মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ছবির মাধ্যমে ভাবাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ তাতে মস্তিষ্কের বাড়তি অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে বেশি জিনিস মনে রাখা সম্ভব হয়। আমাদের মস্তিষ্কের দুটি ভাগ রয়েছে। সাধারণত আমাদের মস্তিষ্কের বাম পাশ ভূমিকা রাখে ভাষা ব্যবহার, কথা বলা, অনুধাবন করা, চিন্তা করা, গণনা করা, পড়ার মত জ্ঞানমূলক কাজগুলো প্রক্রিয়াকরণে। আর মস্তিষ্কের ডান পাশ দৃশ্যমান ও স্থানিক বিষয়গুলো যা সৃজনশীলতার সাথে জড়িত কাজগুলো প্রক্রিয়াকরণ করে। তাই স্নায়ুবিজ্ঞানীগণ মনে রাখার ক্ষেত্রে পড়া, শোনার পাশাপাশি দেখাকেও গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই কোন কিছু মনে রাখতে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে।

আমাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যদি কিছুক্ষণ আগের কোন কথা মনে না রাখতে পারা, কোন পরিকল্পনা বা ঘটনা ভুলে যাওয়া, প্রায়শই বাড়ির পথ ভুলে যাওয়ার মত ডিমেনশিয়ার লক্ষণগুলো দেখি তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভাষিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। কখনো কখনো ব্যক্তি তার চারপাশের মানুষের সাথে যথাযথভাবে যোগাযোগ করতে পারে না। এর থেকে তার মধ্যে মানসিক ও আচরণিক সমস্যা হতে পারে। আমাদের পরিবারের সদস্যদের কারুর এমন হলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই দক্ষ স্পিচ থেরাপিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের সমাজে এখনও ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স রোগীদের পাগল বলে তাকে পাগল সম্বোধন করা হয়। এক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। আমাদেরকে সমাজের সকল স্তরে ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সকল পর্যায় থেকে সচেতনামূলক উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। তাহলেই কেবল আমাদের সমাজের স্মৃতিহারা মানুষগুলো জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে করুণ পরিণতি থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাবেন।

লেখক- চেয়ারপার্সন, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সারাবাংলা/আরএফ/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন