বিজ্ঞাপন

ট্রাভেল উইথ ট্রাবলস

September 24, 2021 | 10:00 am

রয় অঞ্জন

প্রকৃতি সবসময়ই প্রকৃত, আদি এবং আসল। গতবছর গ্যালেংগার তাইমাতং রিসোর্টের লালমাটির লেপা উঠোনে ঢেলনী চেয়ারে হেলান দিয়ে দেখছিলাম এক অপরূপ নিসর্গকে। আকাশ ছোঁয়া গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, বৈয়ম গাছের উর্বশী পাতার ফাঁকে কিশোরী চাঁদের মোলায়েম আলো গলে গলে পড়ছিল কাঠ বাদামের লাল-সবুজ পাতায়। যেন আদর বুলিয়ে দিচ্ছিল পাতাদের নরম শরীরে, তখন মনে হয়েছিল, এটাই প্রকৃতি, এটাই প্রকৃত।

বিজ্ঞাপন

এই বোধটা আমার আরেকবারও হয়েছিল, সেটা অযোধ্যা পাহাড়ে। শাল, মহুয়া, শিমুল, পিয়ালের জঙ্গলে পাতাদের ঠাসা বুনটে সূর্যের রশ্মিটাও মাটিতে পৌঁছুতে না পারার দৃশ্যটা দেখে! মরুভূমিতে অথবা পাথুরে পাহাড়ে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে যতই সবুজের সমারোহ ঘটানো হোক, যতই গ্রিন হাউজ বানানো হোক না কেন, প্রকৃতির কাছে সেসব অফসেটের গায়ে বসে থাকা অক্ষর থেকে খসে যাওয়া জেরক্স কপির মতই, আসলের নকলই শুধু, কিন্তু আসল একেবারেই আসল। তেমনি এক প্রকৃতির স্বাদ পাই গ্রামের বাড়িতে। তার কোলের ওম নেয়ার লোভে ছুটে যাই কারণে–অকারণে। এবার গিয়েছিলাম একেবারেই নিছক আর অকারনেই।
বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলো দূরে বাসস্ট্যান্ড। একটা অটো ধরে যাত্রা করলাম, পিচঢালা পথ কোথাও মসৃণ আবার কোথাও গর্তে ভরা। আমার অটোটা যখন বাসস্ট্যান্ড পৌঁছালো, দেখলাম একটা বাস পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়া যাওয়ার মত করে বাসস্ট্যান্ডের পেছনের পথ দিয়ে বের হয়ে গেলো। ভাবলাম, যাক-আমি পরেরটায় যাব। কিন্তু কাউন্টারে গিয়ে বুঝলাম, বাসটা ছেড়ে দিয়ে আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে। ওরা জানালো, যে বাসটা বেরিয়ে গেল ওটাই “লাস্ট ট্রিপ” ৬ টার বাস, একটু জোরে দৌঁড়ালেই ধরতে পারবো। অগত্যা কাঁধের ব্যাকপ্যাক নিয়ে দিলাম দৌঁড়। আমি এগোই বাস এগোয়। দুরত্ব একটু বেশি হলেও ভরসায় ছিলাম বাস ধরতে পারবো, কারণ সামনেই একটা বেইলি ব্রিজ, ওখানে গেলে পাবোই। কিন্তু পান্তা ভাতে ঘি। একটা অ্যাম্বুলেন্স বিকট সাইরেন বাজিয়ে আমার সামনে এসে বেড়া হয়ে দাঁড়ালো। সেটিকে পাশ কাঁটিয়ে তাকিয়ে দেখি, বাস আর আমার মধ্যকার দুরত্ব ততক্ষণে বেড়েছে বেশ, যা পায়ে হেঁটে ধরা অসম্ভব।

একটা ব্যাটারিচালিত রিক্সা এসে দাঁড়ালো উদ্ধারকর্তার মতো, চালকের সিটে কেতাদুরস্ত প্যান্ট-শার্ট পরিহিত, ডান হাতের কবজি ঘড়িবেষ্টিত যুবক। বাসটা ধরে দেয়ার শর্তে চড়ে বসলাম। মনে মনে ভরসা করলাম, ঘড়ি যেহেতু আছে, সময়ের টানটা সে বুঝবে ভালই, কিন্তু কোথায় কী! প্রতি ঝাক্কিতে একবার করে ঘড়ি দেখে, বাসটা চলে গেলে আমাদের দেখার দুরত্বের কিঞ্চিৎ বাইরে। ছোটখাট গর্তেও পরম আদরে রিক্সাটা চালাচ্ছে , ব্রেক কষে নতুন বউকে আদর করার মতই। এরইমধ্যে মিস্টার বিনের সিঁড়িতে আটকে দেয়া সেই বুড়োর মত একটা ট্রাক্টর এসে হাজির, আমাদের সামনে সামনে চলছে গজ গতিতে। কতবার বললাম, ভাই একটু জলদি, কিন্তু কে শুনে কার কথা! উল্টো ভরসা দিল, সামনে একটা চৌমুহনী আছে, ওখানে বাসটা থামবে, ওখানেই ধরবো, নিজের সৌভাগ্যকে গনেশ কর্মকারের পাল্লায় তুলে দিয়ে বসে থাকলাম। কোনমতে ট্রাক্টরটাকে অতিক্রম করে যখন চৌমুহনী এলাম, বাসটা আমার দৃষ্টি সীমানায়, কেবলই চৌমুহনী ছেড়ে গেছে। ভরসা জাগলো পেয়ে যাবো, উঠে বসলাম একটা চলন্ত অটোতে। তখনো আকাশে সোনালী আভা, আশে পাশে বাড়িঘরে আর টং দোকানে যেন মাত্রই বাতি জ্বললো। মনে মনে আফসোস করছিলাম, প্রত্যেক বাসে যদি ৯৯৯ এর মত একটা করে নাম্বার থাকতো, ফোন করে থামাতে পারতাম। কিন্তু তা তো নেই। এদিকে গর্তে পড়া অটোর গতির উঠানামার সাথে আমার বাস প্রাপ্তির আশা নিরাশা সমানতালে পাল্লা দিতে লাগলো। একটা সিগারেট জ্বালালাম। বাসটা দেখা যাচ্ছে, কিছুটা স্বস্তি পেলাম। চরম উত্তেজনায় জ্বলন্ত সিগারেটের ছাঁইয়ের কেবল দৈর্ঘ্যই বাড়লো, টান আর দেয়া হল না। অনেকটা এগুনোর পরে সামনের রাস্তাটা সাপের জিহ্বার মত দুই ভাগ হয়ে গেল। বাসও প্রায় হাতের নাগালে চলে এলো। অটো ভাড়া মুঠোয় নিয়ে অপেক্ষায়, টপ করে নামবো আর চট করে উঠে পড়বো। আশাভঙ্গ হলো সেখানেই। বাস ধরলো ডানের রাস্তা আর অটো যাবে বাঁয়ের রাস্তায়। ড্রাইভার আশ্বাস দিলেন, সামনেই বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ড বাজার, ওখানে কাউন্টারে দাঁড়াবে, পেছনের অটোটা ধরলেই পেয়ে যাবেন। নেমে গেলাম।

বিজ্ঞাপন

মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেল, একটু স্বস্তিও পাচ্ছিলাম। একটা অটো এলো। উঠে পড়লাম, বাস আমি ধরবই। মোয়াজ্জেন গলা খুললেন, ড্রাইভারকে সমস্ত কাহিনী খুলে বললাম, শুনলো অন্য যাত্রীরাও। ড্রাইভার তার লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে আমার সাথে কথা বলছে।
• চিন্তা কইরেন না, বাখরাবাদে ধরতে না পারলে আমিই আপনেরে ইলিয়টগঞ্জ নিয়া যামু, রিজার্ভ! ৩০০ টেকা ভাড়া, আপনে আড়াই’শ দিয়েন।
• চুপ করো তো ভাই, জলদি টানো।

এতক্ষণে ড্রাইভারের মুখটা ভাল করে দেখলাম, অটোর ক্ল্যাস টানার সময় বুঝলাম হাতের শিরা-পেশি বেশ মজবুত, রংচঙ্গয়ের টি- শার্টের উপরে তাবিজ ঝুলা একটা রূপোলী চেইন। একটু পরে পরে অন্য যাত্রীরাও যার যার মত করে নেমে গেল। ড্রাইভার একবার সামনে তাকায়, একবার লুকিং গ্লাসে আমার দিকে। নিজেকে ইচ্ছেমতো খিস্তি দিলাম, ‍‌‌‍”কি দরকার ছিল এত কথা বলে তাকে বুঝিয়ে দেয়ার, আমি যে এই এলাকায় নতুন, পথভ্রষ্ট, কিছুই চিনি না!” শক্ত করে ল্যাপটপের ব্যাগটা ধরে বসলাম। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। রাস্তায় চলাচলের অটো আর রিক্সাগুলির হেডলাইট জ্বলছে। হঠাৎ অটোটা থেমে গেল। যান্ত্রিক গোলযোগ।
জায়গাটা নির্জন। আমার মাথায় অন্য চিন্তা ঢুকছে প্রবল বেগে। কিন্তু ড্রাইভার ব্যাটার কোন বিকার নাই! আরামসে নামলো, একটু জঙ্গলের দিকে গেল, কর্ম সারলো, মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে এই তারে টান, সেই সুইচে টিপ, পেছনের ইঞ্জিন কাভার খুলে এটা সেটা নাড়ানাড়ি করলেও অটোর ঘুম ভাঙ্গেনা। মোবাইলটা বের করে অটোর হুডে লেখা মোবাইল নাম্বারের ছবি তুলে নিলাম। এবার আমি বাস ধরার আশা ছেড়ে দিয়ে ভাড়াটা ছুঁড়ে দিলাম তার কোলের উপর, “ধর ব্যাটা, আমি আমার পথ ধরি”।
একটা পঁচিশ – ত্রিশ বয়সের যুবক দর্শক হয়ে এগিয়ে এলো। গ্রামে-গঞ্জে কিছু হলে চিনির গন্ধে পিঁপড়ে আসার মত করে আপনাপানিই দর্শক জুটে যায়। কি হয়েছে তা জানতে না দিয়েই জিজ্ঞেস করলাম।

বিজ্ঞাপন

• ভাই, এখান থেকে বাখরাবাদ কতদূর?
• এই তো, দুই মিনিটের রাস্তা, সামনে টালনিংটা (টার্নিং) পাড় হলেই বাখরাবাদ। চলেন আমিও যাইতাছি, বাজারে চা খাইতে।
স্বস্তি পেলাম
• বাখরাবাদ থেকে ইলিয়টগঞ্জের অটো পামু?
• কন কি! এভেইলেবেল , রাইত বারোটা পর্যন্ত।

ছেলেটা হাঁটছে, আমিও হাঁটছি, নিজের সাথে নিজে কত কথা বলছি, নিজেকে বকছি, ধমকাচ্ছি ভাগ্যকেও ছাড় দেইনি। এইসময়ে ছেলেটার কানে ফোন, যেন তার বোনের সঙ্গে কথা বলছে-
“তোর জামাইয়ে বাইত আইছেনি? আইয়া গ্যাছেও গা? আমরার বাইত আইলো না ক্যারে? হুন, আমি কাউলকা তোরার বাইত আমু, ভাগ্নীর লাইজ্ঞা একটা ঘিয়ে কালারের গেঞ্জী কিনছি, কান্ধে ঝুলাইন্যা একটা ব্যাগও আনছি, পিত কালারের, তারে ইশকুলে দিবি কবে? আমারে কইছ, আমি কেডস কিন্যা দিমু। হ হ কিন্ডারগার্টেনেই দিবি, পেরাইমারিতে দিছ না, ভাগ্নীরে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ামু।“

বিজ্ঞাপন

নিজের দিকে তাকালাম, আরে! আমারো তো ঘিয়ে কালারের গেঞ্জি, কাঁধে ব্যাগ, পায়ে কেডস! তবে কি সাংকেতিক ম্যসেজ পাসিং এ পড়ে গেলাম! শুনেছি, হাইওয়ে ডাকাত দল এভাবেই সাংকেতিক ভাষায় ‘মাল’ হাতবদল করে, আমিও কি ‘মাল’ হয়ে গেলাম! ব্যাটারির রিক্সা- প্রথম অটো- দ্বিতীয় অটো- পথ-প্রদর্শক এরা কি সবাই এভাবেই আমাকে হাতবদল করছে! ভয় একটু লাগা শুরু করলই। ভাবতে ভাবতেই বাখরাবাদ স্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। ছেলেটাকে মুখে ধন্যবাদ দিলেও ‘হাতবদলের’ ভয়টা রইয়েই গেল। জমাটি বাজার। মিষ্টির দোকানে হাই ভলিউমে টিভি চলছে, দর্শকও কম না, হঠাৎ টিভি বন্ধ। না বিদ্যুৎ আছে, মাইকে এশার আযান। একটা অটো এসে থামল, ইলিয়টগঞ্জ বলতেই ইশারায় বসতে বলল। আমি বললাম, রিজার্ভ যাবো না, আরো প্যাসেঞ্জার নাও। “যাইতে থাকি, পথে পাইলে লইয়া লমু”। ভয়টা এবার ঝাঁকিয়েই বসলো। বাজার পেরুতেই প্রায় অন্ধকার, যদিও রাখী পূর্নিমার দ্বিতীয় রাতের চাঁদ আকাশে, চাঁদের মুখে মেঘের আলোয়ান, আলো অনেকটাই স্তিমিত। সাপের শরীরের মতো আঁকাবাঁকা সড়ক, দু’ধারে বিশাল বিল, অনেক দূরে জলের মধ্যে গলা উঁচিয়ে হিজল-তমাল গাছের মত একটা দুইটা বাড়ি, লাইট জ্বলছে ওখানে। অটো ড্রাইভার হাই ভলিউমে ওয়াজ চালিয়ে দিল! এবারে আমি বুঝে গেছি কি হতে যাচ্ছে। হাই ভলিউম মানেই যেন কেউ আমার চিৎকার শুনতে না পারে।

একজন হাত দেখালো, অটো থামলো, হাতে কাস্তে, বাজারের থলে নিয়ে ড্রাইভারে পাশের সিটেই বসলো, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে, কিছু শুনি, কিছু শুনিনা। একটু পরে আবার থামলো, এবারে সে এসে আমার পাশে বসলো। এরপরে আরো তিনজন। ব্যাগে হাতিয়ে বুঝলাম জলের বোতলটা আনিনি, খুব জলের দরকার। আমার গা ঘেষা লোকটার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম, শুকনো কন্ঠ, সব শব্দ বেরও হয় না, এক কথা বারবার বলি, কাস্তেটা দেখিয়ে বললাম
• ভাই এইডা বগা কাচি না
• হ ভাই, ধার দিয়া আনছি। ভোঁতা কাচি দিয়া ধান কাটন যায় না, ধান কাটুম।

বিজ্ঞাপন

অদ্ভুত একটা ভয়, আমি কেন যেন তার ‘ধান’ শব্দটা শুনি না, শুধু ‘কাটুম’ই শুনি! বন্ধু দুলালের কথা মনে পড়লো। অনেক আগে, একবার বলেছিল, “এই রাস্তায় সন্ধ্যার পরে যাবি না, ডাকাতি হয়, খুনও করে বিলে ফেলে দেয়। ইলিয়টগঞ্জ বাজারের পরে একটা জায়গা আছে, দুই দিকে বিশাল বিল, বাংলা অনেকগুলি ‘দ’ একসাথে জুড়ে দিলে যেমন হয়, তেমন আঁকাবাঁকা রাস্তা, এখানেই ডাকাতরা রাস্তায় গাছ ফেলে ডাকাতি করে”। অটোর ঘুড়ানো-ফেরানো টের পেলাম, আমি এখন সেই “দ” অঞ্চলেই। সত্যিই, এখানে আমাকে কেটে টুকরা করে ওরা চড়ুইভাতি করলে কাক-পক্ষীও জানবে না। আমি আমার মধ্যে আর নাই, নিজের চোখে নিজের মাংস টুকরোই যেন দেখছিলাম শুধু।

কিছুটা কোলাহল- শোরগোল, গাড়ির হর্ণ, চোখ ধাঁধানো আলো। নিজের মধ্যে ফিরে এলাম, তাকিয়ে দেখি “বিসমিল্লাহ হোটেল এন্ড রেস্তোরা” ইলিয়টগঞ্জ , কুমিল্লা।

সারাবাংলা/এসএসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন