বিজ্ঞাপন

ইভানার মৃত্যুরহস্য: মামলা নিয়ে পরিবারের রহস্যময় আচরণ

September 24, 2021 | 3:48 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আন্তর্জাতিক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল স্কলাসটিকার কর্মকর্তা (ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর) ইভানা লায়লা চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবার ও বন্ধু-সহকর্মীদের অভিযোগ, স্বামী আব্দুল্লাহ মাহমুদ হাসান রুম্মানের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার জের ধরে মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে ইভানাকে। তার শ্বশুর বাড়ির অন্য সদস্যদের কাছেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, ইভানাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। ইভানার বন্ধু আইনজীবীরা বলছেন, তাদের কাছে যেসব তথ্যপ্রমাণ রয়েছে তাদের স্পষ্ট প্রতীয়মান— ইভানাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও ইভানার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। বরং থানায় মামলা দায়ের নিয়ে তার মা-বাবা ও বোনের আচরণ অনেকটাই রহস্যজনক।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানার নবাব হাবিবুল্লাহ রোডে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পেছনে) দুই ভবনের মাঝখান থেকে ইভানা লায়লা চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন থেকেই ইভানার মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

একদিন পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইভানার মরদেহ দাফন পরবর্তী সময়ে তার বাবা এ এস এম আমান উল্লাহ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেছিলেন, এইমাত্র মেয়েকে দাফন করলাম। একটু মানসিক শক্তি অর্জন করেই থানায় অভিযোগ করব। আমার মেয়ে আত্মহত্যা করলেও তার পেছনে নানা কারণ জানতে পারছি। মেয়ে সব মুখ বুজে সহ্য করেছে। কোনোদিন কিছু বুঝতে দেয়নি আমাদের। এমনকি রুম্মান (ইভানার স্বামী) অন্য নারীর সাথে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছে, সেটিও আমরা জানতাম না। আমরা অবশ্যই এ ঘটনার বিচার চাই।

বিজ্ঞাপন

এরপরও আরও এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ইভানার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। ঠিক কী কারণে ইভানার মা-বাবা বা বোন থানায় অভিযোগ করছেন না, সে বিষয়েও তাদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সবশেষ গত বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে ইভানার বাবার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ইভানার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে সারাবাংলার অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৫ সেপ্টেম্বর ইভানা ৯ তলার ছাদ থেকে লাফ দেন। ওই সময় রুম্মানের বাবা (সাবেক সচিব) ইভানার বাবা আমান উল্লাহ ও বোন ফারহানাকে ফোন করে পরীবাগের বাসায় ডেকে নেন। তারা সেখানে পৌঁছালে ইভানার শ্বশুর তাদের দুই ভবনের মাঝখানে পরে থাকা ইভানার মরদেহের কাছে নিয়ে যান। বাবা ও বোন ইভানার মরদেহ দেখার পর তার শ্বশুরের সঙ্গে ওপরে বাসায় যান। সেখানে প্রায় দুই তিন ঘণ্টা অবস্থান করেন। সেখান থেকে তারা তাদের বনানীর বাসায় চলে যান।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

ইভানার মৃত্যুরহস্য: মামলা নিয়ে পরিবারের রহস্যময় আচরণ

বিজ্ঞাপন

ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশ ইভানার মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে নিয়ে যায়। ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে ময়নাতদন্ত হয়। এরপর মরদেহ তার শ্বশুর গ্রহণ করে বারডেমের হিমঘরে রাখেন। ১৭ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয় ইভানার মরদেহ।

ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনাস্থল থেকে ইভানার মরদেহ মর্গে ও মর্গ থেকে হিমঘরে নেওয়া পর্যন্ত কাজগুলো করেছেন তার শ্বশুর। ইভানার বাবা ও চাচাতো ভাইয়েরা কেবল হিমঘর থেকে মরদেহ নিয়ে দাফনের কাজ করেছেন। এই পুরোটা সময়ে ইভানার স্বামী রুম্মানের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। ইভানার দাফনের পর চাচাতো ভাইয়ের একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা ছাড়া আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ বা মামলা দায়েরের কোনো উদ্যোগ পরিবারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি ইভানার মৃত্যুর ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও।

বিজ্ঞাপন

ইভানার স্বামী, শ্বশুরবাড়ি ও পরিবারের সদস্যদের এমন আচরণে পুলিশও বিস্মিত। পুলিশ বলছে, হত্যা-আত্মহত্যা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ঘটনা তারা দেখেছেন। কিন্তু দুই সন্তানের জননী একজন নারীর মৃত্যুর পর হাসপাতাল, মর্গ, হিমঘর বা দাফনের গোটা প্রক্রিয়ায় স্বামীর কোনো উপস্থিতি বা ভূমিকা নেই— এমন অভিজ্ঞতা তাদের নেই! কেবল রুম্মান নয়, এ ঘটনায় ইভানার পরিবারের সদস্যদের আচরণেও তারা হতবাক।

শাহবাগ থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, স্বামী রুম্মানের আচরণ তো বটেই, তার চেয়েও আশ্চর্য হলাম ইভানার বাবা ও বোনের আচরণ দেখে। মেয়ের মরদেহ দেখে বা বোনের মরদেহ দেখে যেভাবে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠার কথা, অ্যাম্বুলেন্স বা লোকজন ডেকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা— এর কিছুই তারা করলেন না। তাদের মধ্যে সে অর্থে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল না। তারা নিথর অবস্থায় পড়ে থাকা ইভানাকে রেখে স্বাভাবিক তার ঘরে চলে গেলেন! অথচ সেখানে বাবা ও বোনের সামনেই ইভানার শাশুড়ি পর্যন্ত বলছিলেন, ‘মরবি তো এখানে কেন? বনানীতে গিয়ে মরতে পারলি না!’

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— তাহলে কি ইভানার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাদের মগজ ধোলাই করেছেন? রুম্মান ও তার মা-বাবা কি ভয় দেখিয়েছেন? নাকি ইভানার দুই সন্তানের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাদের থানায় অভিযোগ দিতে কেউ নিষেধ করেছেন? নাকি সাবেক সচিব তার দাপট দেখিয়েছেন, যার কারণে ইভানার মা-বাবা ও বোন মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না? প্রকৃত কারণ যাই হোক না কেন, সত্য এটিই— ইভানার মৃত্যুর পর ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো মামলা করা হয়নি। আর সেই সুযোগে রুম্মান ও তার পরিবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রুম্মানের কাছ থেকে মানসিক আঘাত পেয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর হাত কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন ইভানা। বাবা ও বোনকেও তিনি বিষয়টি জানিয়েছিলেন। কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ইভানাকে সে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের কোনো প্রয়াস তাদের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি। ইভানাকে কোনো মানসিক চিকিৎসকের কাছেও তারা নিয়ে যাননি। আর এর মাধ্যমে বরং ইভানাকে ক্রমেই চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তার সহকর্মী-বন্ধুরা।

জানা গেছে, ইভানাকে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের ওষুধ খাওয়াচ্ছিলেন তার স্বামী রুম্মান। এর মধ্যেই গত ৬ সেপ্টেম্বর রুম্মান তার পরিচিত চিকিৎসক কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হকের কাছে নিয়ে যান। ডা. মুজিবুলের চেম্বারটি ইমপালস হাসপাতালে, রুম্মান নিজেই সেই প্রতিষ্ঠানটির একজন আইনজীবী। ইভানার জন্য ডা. মুজিবুলের লেখা ব্যবস্থাপত্রে দেখা গেছে, কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তিনি ইভানাকে বেশকিছু ওষুধ খেতে বলেছেন। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাধারণত যে ওষুধ দেওয়া হয়, এমন ওষুধও ছিল সেই ব্যবস্থাপত্রে। শুধু তাই নয়, একটি ব্যবস্থাপত্রে রোগীর রোগের যে বিবরণ থাকে, ডা. মুজিবুলের ব্যবস্থাপত্রে সে বিষয়ে কিছুই ছিল না। একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ হয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, ইভানাকে যে ওষুধ তিনি খেতে বলেছিলেন সেই ওষুধ খেলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অথচ সেই ওষুধই বাড়তি ডোজে ইভানাকে প্রতি রাতে খাওয়ানো হতো বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

ইভানার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নিয়ে প্রশ্ন তো রয়েছেই। স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ির আচরণও ইভানাকে সার্বক্ষণিক মানসিক চাপে রাখত। রুম্মান বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় শ্বশুর-শাশুড়ি চাইতেন, ইভানা ডিভোর্স নিয়ে চলে যাক। এমনকি ইভানার মৃত্যু হলেও তাদের কিছু যায় আসে না— এমন ইঙ্গিতও দিতেন তারা। জানা গেছে, ইভানা হাত কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে সে খবর জানতে পারেন তারা। ইভানার মরদেহ যেদিন উদ্ধার করা হয়, সেদিনও ওই প্রসঙ্গ টেনে শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা ইভানাকে বলেছিলেন— ‘তুই মরতে চাস? হাত কাটলেই কেউ মরে নাকি? মরা কি এতই সহজ?’ মানসিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা ইভানা এমন কথায় আরও আহত হন এবং এই কথোপকথনের পরপরই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে ৯ তলার ছাদ থেকে লাফ দেন বলে অভিযোগ তার বন্ধু-সহকর্মীদের।

মৃত্যুর আগে ইভানা তার মানসিক যন্ত্রণার কথা, ডিভোর্সের কথা, স্বামীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কথা, সবার কাছে মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা তার শিক্ষক ও সহকর্মী বন্ধুদের ফেসবুক মেসেঞ্জারে শেয়ার করেছিলেন। রুম্মানের সঙ্গে তার কথিত প্রেমিকা নারী আইনজীবীর কথোপকথনের স্ক্রিনশটও দিয়ে যান মেসেঞ্জারে। ওইসব স্ক্রিনশটে দেখা যায়, রুম্মান ওই নারীর সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে তার বাবার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলিয়ে দেন। ওই নারীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় এমন বিষয়ও উঠে এসেছে— ইভানা ‘চলে গেলে’ তারপর তাদের বিয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত কথা হবে। ইভানার এই ‘চলে যাওয়া’র বিষয়টি ডিভোর্স অথবা ইভানার মৃত্যুকে ইঙ্গিত করে বলা হয়ে থাকতে পারে— এমনটিই মনে করছেন ইভানার পরিচিতরা।

এদিকে, ইভানার বন্ধু-সহকর্মীরা এরই মধ্যে এসব তথ্যপ্রমাণ নিয়ে শাহবাগ থানায় হাজির হয়েছিলেন। তারা এসব তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে একটি আবেদনও জমা দিয়েছেন। তাতে ইভানার মৃত্যুর ঘটনায় নেপথ্যে কী রয়েছে, সে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানানো হয়েছে। থানায় ইভানার শিক্ষক ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনওয়ার বলেন, আমাদের এই আবেদনকে আমলে নিয়ে থানা চাইলে এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করতে পারে অথবা অপমৃত্যুর মামলাটিতেও এই আবেদনও সংযুক্ত তথ্যপ্রমাণকে তদন্তে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

পরে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মওদুদ হাওলাদার আবেদনটি গ্রহণ করে বলেন, তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত আবেদনটি আমরা তদন্তের স্বার্থে আমলে নেব। ইভানার মৃত্যুর পেছনে যদি অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেলে আমরা সে বিষয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থাও নেব। সেক্ষেত্রে অপমৃত্যুর মামলাটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রূপান্তরিত হবে।

থানা সেই আবেদন আমলে নিক বা না নিক, বাস্তবতা হলো— ইভানার মৃত্যুর পেছনে আত্মহত্যার প্ররোচনার বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে এলেও ৯ দিন পরও এ সংক্রান্ত কোনো মামলা পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা হয়নি।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন