বিজ্ঞাপন

ইভানার মৃত্যুর দায় কার

September 24, 2021 | 6:00 pm

সারাবাংলা ডেস্ক

ঢাকা: ইংরেজি মাধ্যম স্কুল স্কলাসটিকার কর্মকর্তা ইভানা লায়লা চৌধুরীর রহস্যজনক মৃত্যুর নয় দিন পরেও মামলা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় তার পরিবার। বোনের মৃত্যুর আঘাত মেনে নিতে না পারা ও ইভানার দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কারণে তারা কিছুটা দ্বিধায় আছেন বলে জানিয়েছেন প্রয়াত ইভানার বড় বোন প্রকৌশলী ফারহানা চৌধুরী। এদিকে প্রশ্ন উঠছে এই মৃত্যুর দায় আসলে কার?

বিজ্ঞাপন

শান্তা তাওহিদা বলেন, ‘ইভানার মৃত্যুর জন্য আমরা সবাই দায়ী। স্বামী, শ্বশুরবাড়িই শুধু নয় তার পরিবার, বন্ধু বা সমাজও সমানভাবে দায়ী। যখন কেউ বলে যে সে মানসিক কষ্টে আছে তাকে সাহায্য করা বাকিদের দায়িত্ব। তাকে আশ্বাস দেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই আমরা ইভানাদের রক্ষা করতে পারব।’

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ‘ইভানার মৃত্যু; দায় কার?’ শিরোনামে সারাবাংলা ডট নেটের আয়োজনে সারাবাংলা লিগ্যাল চেম্বার পাওয়ার্ড বাই প্রিমিয়ার ব্যাংক শিরোনামের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী  ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফীনের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ। এছাড়াও ছিলেন চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবদুর নুর তুষার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের চেয়ারপারসন শান্তা তাওহিদা। ইভানার বড় বোন ফারহানা চৌধুরী ও তার স্বামী মুজতাবা আহসান ছাড়াও ছিলেন ইভানার বন্ধু, শিক্ষক ও সহকর্মীদের অনেকে।

ইভানার বৈবাহিক জীবনের অশান্তি বা অনিশ্চয়তা নিয়ে আগে থেকে তেমন কিছু জানতেন না বলেও দাবি করেন তার বড় বোন ফারহানা চৌধুরী। কিন্তু ইভানার মৃত্যুর পর তার বন্ধু-পরিচিত ও সহকর্মীদের কথায় তার জীবনের অশান্তির নানা দিক জানতে পেরে এখন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানার নবাব হাবিবুল্লাহ রোডে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পেছনে) দুই ভবনের মাঝখান থেকে ইভানা লায়লা চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন থেকেই ইভানার মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। একদিন পর ইভানার মরদেহ দাফন পরবর্তী সময়ে তার বাবা এ এস এম আমান উল্লাহ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেছিলেন, এইমাত্র মেয়েকে দাফন করলাম। একটু মানসিক শক্তি অর্জন করেই থানায় অভিযোগ করব। আমার মেয়ে আত্মহত্যা করলেও তার পেছনে নানা কারণ জানতে পারছি। মেয়ে সব মুখ বুজে সহ্য করেছে। কোনোদিন কিছু বুঝতে দেয়নি আমাদের। এমনকি রুম্মান (ইভানার স্বামী) অন্য নারীর সাথে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছে, সেটিও আমরা জানতাম না। আমরা অবশ্যই এ ঘটনার বিচার চাই।’ কিন্তু একথা বলার আটদিন পরেও মামলা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছিল নানা মহল থেকে।

সারাবাংলার লাইভে যুক্ত হয়ে ফারহানা চৌধুরী বলেন, তার বাবা-মায়ের বয়স অনেক বেশি এবং তারা কিছুটা অসুস্থও। সন্তানের মৃত্যুর পাশাপাশি দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ওনারা মুষড়ে পড়েছেন। সেখান থেকেই কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতা। কিন্তু এখন ইভানার বিবাহিত জীবনের নানা ঘটনা জানতে পেরে তারাও ঘটনার মীমাংসা চান।

বিজ্ঞাপন

ফারহানা চৌধুরী জানান, ইভানার সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য ১৫ বছর। ছোটবোনের থেকেও তাকে সন্তান হিসেবেই বেশি দেখেছেন। বোনের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ছিল। তিনি জানান, ইভানার ছোট সন্তানের অটিজমের লক্ষণ থাকায় সেটি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তারা। ইভানাও এটি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সন্তানের থেরাপির জন্য বনানী যেতেন ইভানা। সেই সুবাদে প্রতি সপ্তাহেই বাবার বাড়ি যেতেন তিনি। কখনও কাউকে বুঝতে দেননি যে তার পরিবারে কতটা অশান্তি, বরং সবার সামনে ইভানা ও তার স্বামী সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতেন।

ইভানার মৃত্যুর দায় কার

বিজ্ঞাপন

লাইভে ইভানার বন্ধু, শিক্ষকের পাশাপাশি তার স্বামী রুম্মানের বন্ধু উপস্থিত হয়ে বলেন, তারা অনেক আগে থেকেই জানতেন ইভানা কতটা অসুখী। ইভানা বিচ্ছেদের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নিজের ও সন্তানের জীবনের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাবা-মায়ের পারিবারিক সম্মান ও শারীরিক অসুস্থতার কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন।

লাইভে সবার কথা শুনে বোন ফারহানা চৌধুরী বলেন, ‘সত্যি বলতে আজ নতুন এক ইভানার কথা জানছি যার কথা আমাদের জানা ছিল না। ইভানার বন্ধু ও পরিচিতদের কাছ থেকে শুনে মনে হচ্ছে আমরা বলছি যে আমরা বোনরা খুব কাছাকাছি কিন্তু আজ বুঝলাম আমরা আসলে বোনকে চিনতামই না। ইভানার দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত নিয়েও আমরা চিন্তিত। ইভানার দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত আর বোনের মৃত্যু নিয়ে আমরা এতটাই ট্রমার মধ্যে আছি যে, অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ হয়নি। ওর পারিবারিক অশান্তি নিয়ে অত জানতামও না। এখন সবার কথা শুনে আমরাও জানতে পারছি যে ইভানা আসলে কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এখন আমরাও চাই যে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক ও ইভানার মৃত্যুর পেছনে কেউ দায়ী থাকলে তা বের হয়ে আসুক।'

ডা. আব্দুন নুর তুষার ইভানা লায়লার চৌধুরী যে প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাচ্ছিলেন সেটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রেসক্রিপশনে আবশ্যক যা যা থাকার কথা তা নাই। রোগীর ডায়াগনোসিস, রক্তচাপ, হার্টরেট ইত্যাদির তথ্য নেই, যা দেখে মনে হচ্ছে চিকিৎসক রোগী না দেখেই ওষুধ দিয়েছেন।’ তাছাড়া প্রেসক্রিপশন দেখে হাইপোথাইরয়েডের ওষুধ বলে চিহ্নিত করার পাশাপাশি এসব ওষুধের মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে বলেও সন্দেহ করেন প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়াও একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব রোগীর সমস্যা অনুযায়ী ডাক্তারের কাছে রেফার করা। কিন্তু ইভানার ক্ষেত্রে দেখা যায় কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ হলেও থাইরয়েড ও মানসিক রোগের ওষুধ দিচ্ছিলেন। এখানে দুটো ওষুধের প্রভাবে ইভানার বিষণ্ণতা ও সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি বেড়ে যেতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তাই ইভানার মৃত্যু রহস্যের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়ার পাশাপাশি এই চিকিৎসার বিষয়টিও তদন্তের দাবি জানান তিনি।

আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘ইভানার মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারকেই মামলা করতে হবে তা না। তার যেসব আইনজীবী বন্ধু কালোব্যাজ পরে থানায় গিয়েছিলেন বা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রদর্শন করছেন তারা নিজেরাও মামলা করতে পারতেন।’

থানায় যাওয়া আইনজীবীদের অন্যতম আসিফ বিন আনোয়ার বলেন, তারা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ নেয়নি। পুলিশের ডিআইজি পর্যায়ে যোগাযোগ করার পরেও তারা মামলা নেয়নি। তাদের বলা হয়েছে, যেহেতু ইভানার মৃত্যুর পর তার চাচাত ভাই অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন তাই এখন আর বাইরের কারও মামলা নেওয়া হবে না। এখন একমাত্র ঘনিষ্ঠ পরিবার যদি মামলা করে সেটিই গ্রহণযোগ্য হবে।

সারাবাংলা/আরএফ/

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন