বিজ্ঞাপন

সৈয়দ শামসুল হক; চিরায়ত গল্পের গথিক

September 27, 2021 | 1:31 pm

মনি হায়দার

সৈয়দ শামসুল হক!

বিজ্ঞাপন

না, অধিক লেখার প্রয়োজন নেই। তিনটি শব্দের মধ্যে তিনি নিজস্ব স্বরুপে প্রকাশিত হন তাবৎ বাঙালির মনন চেতনায়। সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি নির্মাণের অশ্ব ছুটিয়েছেন দিকবিদিক, বিরামহীন, ভয়হীন, নিঃশঙ্ক চিত্তে। অধিকার করেছেন, হানা দিয়েছেন পাঠকদের মননের গোপন মহাফেজখানায়। দেখিয়েছেন শিল্পের বহুমাত্রিক কলা ও কৌশল। দীর্ঘ ইটের সারি দিয়ে সাজানো যায় সৈয়দ শামসুল হকের নির্মানের রাস্তা; জলেশ্বরীর উঠোন থেকে পরিব্যাপ্ত সারা বাংলায়, আটষট্টি হাজার গ্রামের সবুজ পাড়ের জমিনে।

চিরকাল ছিলেন দৃঢ়, ঋজু, উন্নত শিরে, তীক্ষ্ণ তীব্র সাবলিল উচ্চারণে, পা ফেলেছেন শক্ত মাটিতে। যেখানে পা রেখেছেন, মুহুর্তে মাটি হয়েছে আপন, গভীর গোপন সর্ম্পকের মতো। গল্প, কবিতা, নাটক, কাব্যনাটক, উপন্যাস, সাহিত্যিক ভাষ্য- লেখার বিচিত্র ভুবনকে নির্মিত করেছেন নিজস্ব শক্তির আলোকিত পথে।

বিজ্ঞাপন

জীবনের পরিধিতে সৈয়দ হক গল্প লিখেছেন চৌষট্টিটি। গল্পের এই তালিকা পাওয়া যায় ২০১০ সালে অনন্যা থেকে প্রকাশিত তার গল্পসমগ্র-এ। সৈয়দ শামসুল হক ‘গল্পসমগ্র’এ অনন্য একটি ভূমিকা লিখেছেন। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন- ‘গল্প লিখছি আজ অনেক বছর হয়ে এল, প্রথম বছরের মাথাতেই গল্প লেখার ইতি ঘটে যেত যদি না আমার প্রথম গল্পের প্রকাশক একদিন এক দুঃখের সন্ধ্যায় আমার কাঁধে হাত না রাখতেন। ব্যক্তিটি প্রয়াত ফজলে লোহানী, অগত্যা নামে এক অসাধারণ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তার কাগজে আমার প্রথম গল্পটি ছাপা হয় এবং গল্পটি ষোলোআনা আমার ছিল না- প্রবোধকুমার সান্যালের ‘ক্ষয়’ নামে একটি গল্পকে অদলবদল করে, চরিত্রগুলোর মুসলমান নাম রেখে তৈরি করেছিলাম লেখাটি, লোহানী পরে সেই হাফচুরি ধরতে পেরেও আমাকে বঞ্চিত করেননি তার সাহচর্য এবং প্রশ্রয় থেকে। ততদিনে আমার দ্বিতীয় গল্প লেখা হয়ে গেছে, একেবারে আমার তৈরি গল্প, কারো কাছে হাত পাতিনি, ডাকাতি করিনি, আপন কল্পনায় তাকে রচনা করেছি এবং এক সন্ধ্যায় গল্পটি পড়ে উঠেছি পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের পাক্ষিক বৈঠকে। ...আমি থাকবো কি না দূরের কথা, আছি কি না ভাবি, এখন যে গল্প লিখি তাকে আর গল্পও বলি না, বলি- গল্প প্রবন্ধ, এখন কেবল সম্ভবপরতাই নয়, তার সঙ্গে আরো ধরতে চাই একটি স্বপ্নরোপিত কৃষিক্ষেত, এই বইয়ের কোনো একটি রচনাতেও যদি তা হয়ে থাকে তাহলে জানব- কুড়িগ্রামের গণ্ডিকে আমি অতিক্রম করতে পেরেছি।’

সৈয়দ হক কোনো ভান করেননি, নিরেট নিজেকে বুনে দিয়েছেন গল্প সমগ্রের ভূমিকায়। যা সত্যি, যা অনিবার্য, শ্বাশত এবং প্রেরণার উৎস, অকপটে লিখেছেন সৈয়দ হক। কোনো দ্বিধা বা সংকোচকে তিনি আমলে নেননি। এখানেই তিনি, সৈয়দ শামসুল হক অনেকের চেয়ে এগিয়ে, একরোখা এবং অনড়। তার নিজস্ব শিল্প কৌশলের প্রকরণে, মেজাজের ধ্রুপদী সঞ্চালনায় গল্প, গল্পের জমিজমা বা আখ্যান হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র মহিমায় প্রদীপ্ত। সেই আঠারো বছর বয়সে, পিতা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার সৈয়দ সিদ্দিক হোসেনের বলিষ্ঠ তাগাদা ও অনুপ্রেরণায় কুড়িগ্রামের ঘাস উঠোন বহেরাতলা, পুকুরের কাজল কালো জল, জলের সম্মোহন ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছেন- ঢাকায়। সেই ঢাকা তার জীবনের ঠিকানা হয়েছিল অন্তিমকালেও।

বিজ্ঞাপন

সৈয়দ শামসুল হক অন্তিমে যাত্রা করেছেন, ফিরে আসবেন না আর। কিন্তু রেখে গেছেন চৌষট্টিটি গল্প। এই গল্পগুলোর ভেতর দিয়ে তিনি নশ্বর জগতে রেখে গেছেন অবিনশ্বর দাগ। গল্পে, গল্পের কলকব্জায় সৈয়দ হক অংকন করেছেন শব্দের কালিতে, অনুভবের তুলিতে বিচিত্র সব আখ্যান। মানুষের বিচিত্র স্বভাব, মন, ক্রোধ, তৃষ্ণা, ঘৃণা, হতাশা, প্রেম- প্রতি প্রেম, দাবদাহ, প্রতিবাদ, চুম্বন, ধর্ষণ, মর্ষকামিতা- ব্যবচ্ছেদ করেছেন দক্ষ মেধাবী আর সৃজনশীল খুনির ধারাবাহিকতায়। খুনি! সৈয়দ শামসুল হক নিজেই বলেছেন, দু-এক জায়গায় লিখেছেনও, লেখক মাত্র খুনি। না, হাতে তীক্ষ্ণ তরবারি নিয়ে কারও গলায় চালিয়ে দেন না গল্পকার, ফিকনি দিয়ে বের হয় না টাটকা রক্ত- কিন্তু গল্পকার তবুও খুনি। গল্পকার কেন খুনি? পাঠকের মনের আস্তিনের লুকিয়ে রাখা রিরিংসাকে গল্পকার বের করে আনেন চাতুর্যের ঘোড়ায় চড়ে, চরম দক্ষতায়, নিমিষে পাঠককে নিয়ে যান রক্তমাখা তেপান্তরের মাঠে। দাঁড় করিয়ে দেন উন্মূক্ত কৃপাণের সামনে, যে কৃপাণ একদিন নিজেই ধার দিয়েছিলেন, অন্যকে বধ করবার জন্য! ঘটনার পরম্পরায়, সেই ধারওয়ালা নিজেই হা হা হা খা খা খা তরবারীর নিচে পেতে দিতে বাধ্য হচ্ছে, নিজের নির্ভিক গর্দান। এ তো গল্পকারের হাতেই নির্মিত গল্পের আখ্যানে সম্ভব। গল্পকার যখন পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন, নিজের আয়নায়, নিজের সন্মুখে, তখন খুনি না হয়ে যায় কোথায় গল্পকার? পাঠককে ভ্রান্তির জালে জড়িয়ে গল্পকার মজা দেখেন, আয়েশ করে পান চিবান নয়তো যুৎ করে সিগারেটে টান মেরে বাতাসে ধোঁয়ার রিং বানান। অন্যদিকে পাঠক নিজের বুকের গহীনে লুকিয়ে রাখা নিজেকে, নিজের কদাকার কিম্ভুত মুখ দেখে আঁতকে ওঠেন। চিৎকার করে বলেন, আমার এই গোপন মুখ গোপনে রাখতে চাই- মুখের দাঁতাল দাঁতে লেগে থাকা রক্ত কাউকে দেখাতে চাই না।

তো! গল্পকারতো খুনিই। গল্পকার সৈয়দ শামসুল হক কেমন খুনি ছিলেন গল্পের আলখেল্লায়! তার গল্পের আলখেল্লা খুলে একটু নিবিড় পর্যবেক্ষণে সেটাই এখন জানতে এবং বুঝতে চেষ্টা করবো। গল্প লিখেছেন সৈয়দ চৌষট্টিটি। ‘অনন্যা’ থেকে ২০০১ এ প্রথম প্রকাশিত, নয় বছরের ব্যবধানে ২০১০ এ দ্বিতীয় মুদ্রণে গল্পসমগ্রে পাই এই হিসেব। দীর্ঘ জীবনে সৈয়দ শামসুল হকের গল্পের সংখ্যা তুলনামূলক কম মনে হচ্ছে। যদিও জীবনের শিল্পযাত্রা শুরু করেছিলেন গল্প দিয়েই, কিন্তু অচিরেই শিল্পের বহুত্বধারায় নিজেকে ছড়িয়ে দিলেন মাটির চাতাল থেকে আসমানের নীলে। সৃজন সমুদ্রের বুকে আঁকলেন গল্প-উপন্যাস, নাটক, কবিতা, অনুবাদের তিল।

বিজ্ঞাপন

চৌষট্টি গল্পের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ‘মানুষ’ গল্পটি আকারে ছোট কিন্তু অনুধাবনে তীব্র, চেতনায় অঙ্গার। সৈয়দ হক গল্পটি লিখেছেন উত্তমপুরুষে। গল্পের আখ্যান শুরু করেছেন সিনেমা দেখা নিয়ে। একটা কাল ছিল, বাঙালির বিনোদনের সিনেমা দেখা। গল্পের শুরুতেই তিনি সেই সিনেমা দেখার প্রসঙ্গ আনেন। সিনেমা দেখে রাতে তিনি বাড়ি ফিরছেন। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়ে তিনি আশ্রয় নিলেন। আশ্রয় নেয়ার আগে গল্পকার যে বর্ননা দেন ঝড়ের, সেই ঝড়ের একটু পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার।

‘...আরো কয়েকটা টিন উড়ে পড়তে লাগল, একটা গাছের ডালের মড় মড় শব্দ শোনা গেল আমার পেছনে। হাঁপাতে হাঁপাতে আমি একটা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আর ঠিক তখন দপ করে বাতি নিভে গেল রাস্তার। অমাবস্যার মতো অন্ধকার হয়ে গেল সারা শহর। প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে ঝড় নেমে এসে চাবকাতে লাগল আমাকে, এই বাড়িগুলোকে, শহরকে, সারা পৃথিবীকে। আমি দম নেবার জন্যে বারবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলাম। এই হয়। বিধাতার সঙ্গে আমার কি শত্রুতা আছে, আমি জানি না, আমার সুখের মুহূর্তগুলো, কতবার দেখেছি, বেশিক্ষণ বেঁচে থাকে না, একটা কিছু ঘটে, আর তারা মরে যায় যেমন আজ।’

বিজ্ঞাপন

একজন মানুষের জীবনের আশা ও নিরাশার মানচিত্র আঁকলেন গল্পকার সৈয়দ হক, উপরের মাত্র কয়েকটি লাইনে। উপভোগ্য সময় কতো দ্রুত নিরাশায় পরিনত হয়, নিখুঁত কৌশলে তিনি বর্ননা করে আমাদের জন্য গল্পের ট্রেনে উঠাবার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। ফলে, পাঠকদেরও গল্পকারের সঙ্গে গল্পের শেষ সীমানায় পৌঁছানোর প্রবল তাগাদা অনুভব করতে বাধ্য হন। কি এক প্রবল তাড়নায় রুদ্ধশ্বাসে পাঠক আমূল চমকে ওঠেন, পরের প্যারায়। এখানেই অদ্বিতীয় গল্পকার সৈয়দ হক হয়ে ওঠেন নির্মম খুনি।

কেনো?

উত্তমপুরুষের তিনি দেখলেন, নির্মম ঝড়ের মধ্যে পাশেই আর একজন এসে দাঁড়িয়েছে। সর্বনেশে ঝড়ের রাতে, শহরের চৌকাঠে কোনো বাড়ির বারান্দায় দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা অধিক মানুষ আশ্রয় নিতেই পারে। নেয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুজন দুজনকে দেখে চমকে উঠবেন কেন? পূর্ব পরিচিত? হতেই পারে। মানুষের সংসারে বা হাটবাজারে কখন কার সঙ্গে কিভাবে দেখা হয়, নির্ণয় করা কঠিন। তো আমাদের ‘মানুষ’ গল্পের গল্পকারের সঙ্গে এই রকম এক প্রবল ঝড়ের রাতে কোনো বাড়ির বারান্দায় একজন পরিচিত মানুষের দেখা হতেই পারে। দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চয়ই দুজনে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করবেন। একে অপরের কুশল জিজ্ঞেস করবেন। এবং ভয়ংকর ঝড়ের প্রভাব সম্পর্কিত কথা বলবেন। হয়তো একটু নির্ভারও হবেন, দুজনে, একে অপরের পরিচয়ের সূত্র ধরে। কিন্তু গল্পকার আমাদের নির্ভার না হওয়ার সুযোগ না দিয়ে নিয়ে যান অজানা এক বধ্যভূমিতে।

দুজন দুজনকে দেখে চমকে উঠেছেন, কারণ পরস্পর শত্রু। ঘটনার বিবরণে সৈয়দ শামসুল হক জানান, কোনো একটা অফিসে চাকরি করার সময়ে দশ টাকার বিনিময়ের কারণে গল্পকারের চাকরিতো চলে যায়ই, অধিকন্তু জেলও খাটতে হয়েছে। জেল খাটতে খাটতে গল্পকার ভেবেছেন, বাইরে বের হয়েই লোকটাকে খুন করবেন।

কিন্তু জীবনের বিন্যাস, স্তর প্রতি মুহূর্তে পাল্টে যায়। জেল থেকে বের হওযার পর গল্পকারের সামনে এসে দাঁড়ায়, জীবনের লড়াই। বেঁচে থাকার আকুলতা। জীবনের দরজা থেকে হারিয়ে গেছে প্রতিশোধের আগুন। একজনকে খুন করার চেয়ে নিজেকে রক্ষা করা শ্রেয় হয়ে দাঁড়ায়। সেই লড়াই চালাতে চালাতে গল্পকার যখন জীবনের সুস্থ প্রান্তরে, চেতনার নোটবুক থেকে হারিয়ে গেছে এই শত্রু, ঠিক তখন, আবার ঝড়ের রাতে মুখোমুখি- দুজনে।

লোকটার প্রতিক্রিয়া কী?

গল্পকার জানাচ্ছেন, ‘লোকটা আমাকে দেখেই বারান্দার শেষ মাথায় সরে গেছে। বারে বারে বাইরের দিকে তাকাচ্ছে, আকাশ দেখছে, ফাঁকে ফাঁকে চোরচোখে দেখছে আমাকে।... গল্পকার মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, সুযোগ পেয়েও ওকে কিছু বলবেন না।

কিন্তু সে আরও সঙ্কুচিত হয়ে গেলো। প্রতি মুহূর্তে, না দেখতে পেলেও বুঝতে পারছিলাম, ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে সে। তখন আমি তার সঙ্গে কথা বলবার জন্য এক পা এগুলাম। তখন সে সেই ঝড়ের মধ্যেই লাফ দিয়ে নেমে গেল বারান্দা থেকে। ...চিৎকার করে বললাম, শুনুন ও সাহেব শুনুন..।’

প্রিয় পাঠক, আপনাদের এখন প্রশ্ন করি- লোকটা কি ফিরেছে? আপনি বা আমি হলে কি ফিরতাম? হোক না প্রবল ঝড়ের রাত কিন্তু সন্মুখে দাঁড়ানো নিশ্চিত আততায়ীর হাত থেকে তো বাঁচতে হবে! নগদ বাঁচাটাই মানুষের প্রথম অভিপ্রায়। সেই অভিপ্রায়কে সামনে রেখে লোকটি প্রাণের দায়ে ঝড়কেও জয় করে ফেলার কথা। আমরা, নিরীহ পাঠকেরা বলবো- যাক বাবা, বেঁচে গেছে লোকটা। খুনোখুনিতো হলো না। গল্পকার সৈয়দ শামসুল হক একটি খুন থেকে আমাদের নিস্কৃতি দিলেন। সত্যি কি সৈয়দ আমাদের নিস্কৃতি দিলেন? তাহলে এই গল্পটি লিখবার কি দরকার ছিল? গল্পের মোড় কই? আমারা ঠোঁট মুড়ে বলতাম, সৈয়দ কি গল্প লিখছেন? এটা কোনো গল্প হলো? আকছার এই রকম মহত্বের কতো গল্পই জানি আমরা। এই তো সেদিন...। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই মহত্বের অনেক উদারহণ দিতে পারতাম। খুনি গল্পকার সৈয়দ শামসুল হক আমাদের খুন না করে নিস্কৃতি দেবেন, তিনি কি সেই গল্পকার? নিশ্চয়ই না।

গল্পের শেষ তিনটি লাইন- ‘ঝড়ের মধ্যে হয়তো একটা উড়ে আসা টিনে তার মৃত্যু হতে পারে। আমার বুক হিম হয়ে গেল। আকুল হয়ে আরেকবার ডাকলাম আমি। কিন্তু কোথাও আর তাকে দেখতে পেলাম না। গলাটা ধরে এল আমার। আমি তো মানুষ, তাই সে আমাকে বিশ্বাস করতে পারল না।’

আমার মনে হয়, মানুষ নামক আদিম ও আধুনিক প্রাণীর চরিত্র মনস্তত্ব এবং হিংসা-বিদ্বেষ বুঝবার জন্য একটি শ্রেষ্ঠ গল্প ‘মানুষ’। মানুষ হয়ে মানুষের এমন হন্তারক চরিত্র আর দ্বিতীয় কোথাও, কোনো গল্পে পাঠ করিনি আমি। মানুষ হয়ে যেমন আমরা গর্বিত উল্টোপিঠে কতোটা পৈশাচিক, পরস্পর বিরোধী ভূমিতে, ‘মানুষ’ গল্পে প্রমানিত। সৈয়দ শামসুল হক মানুষের লোভের রক্তপানের ঘৃণার অপমানের নৃশংসতার মানচিত্র অসম্ভব দক্ষতায় পাঠ করতে পারতেন বলেই, আমাদেরকে রেখে দেন শূণ্যতা বোধের অলীকপুরে। যেখানে রক্তই পান করে রক্ত।

মনস্তত্ব কতো জটিল আর বিচিত্র হতে পারে, ‘গন্তব্য, অশোক’ গল্পটি শ্রেষ্ঠ উদারহণ হতে পারে। গল্পটি লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। শুরুই করেছেন তিনি গল্পটা প্রবল আক্রোশের সংলাপ নির্মানের পথ ধরে- ‘ধরো, আমার কোনো বন্ধু তোমার দিকে তাকালো আর তোমার মনে হলো, তুমি উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছো, আঁচল পড়ে যাচ্ছে, বোতাম ছিঁড়ে যাচ্ছে, তুমি কি করবে? এখনো বিশ্বাস হতে চায় না যে বিয়ের রাতেই সামাদ; তার স্বামী এ ভয়াবহ প্রশ্নটি করেছিল। বলো, তুমি কি করবে?’

বিয়ের রাতে নতুন বৌ শিরিনকে যে প্রশ্ন দিয়ে বাসরযাত্রা শুরু করেছিল, সেই যাত্রার পথে পথে বিচিত্র ভঙ্গিতে বিষাক্ত সাপের বিষ মুখে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সংসারে শিরিনের দিনরাত্রি, সংসার জীবন। বাসররাত! এক নারীর জীবনে সারা জীবনের স্বপ্নমধুর কল্পনা বিলাস আর কামনা রঙিন সুখের সংরাগ নিয়ে আসে। আর শিরিনের জীবনে তার স্বামী কি মধু নিয়ে এলো? এ মধু না বিষ? না, সামাদ কেবল প্রশ্ন করেই শেষ করেনি পাশবিকতার মাত্রা। গল্পকার সৈয়দ হক আরও বর্ননা দেন স্বামী সামাদের বাসরযাত্রার।

তিনি লেখেন- ‘সামাদ তাকে কঠিন দুহাতে ঠেসে ধরে কানের কাছে চাপা চিৎকার করে উঠেছিল, বলো, এতোক্ষণ উত্তর না দিয়ে কি ভাবছিলে? ভাবছিলে, দেখুক তোমাকে? ভাবছিলে, ভালোই তো কেউ যদি দেখে? না। তুমি আমার, শুধু আমার। বুঝেছো? আমার।

একটানে বুকের কাপড় সরিয়ে হঠাৎ কামড় বসিয়ে দাঁতের ভেতরে মাংস রেখে সামাদ তখন অবিশ্রান্ত বলে চলেছিল, তুমি আমার, তুমি আমার।’

আমরা বুঝতে পারি, সামাদ- মোহগ্রস্থ, বিকারগ্রস্থ এক চরিত্র বা মানুষ অথবা পুরুষ। পুরুষ শব্দে ‘গন্তব্য, অশোক’ গল্পে আমরা সামাদ এবং তার পরিপার্শ্বকে বর্ননা করবো। কারণ, পুরুষ শব্দের ভেতর দিয়ে একজন বিকারগ্রস্থ সামাদকে অনুধাবন করা সহজ হয়ে উঠতে পারে।

বিয়ের পর সামাদ কর্মস্থলে নিয়ে আসে শিরিনকে। সামাদ কালীগঞ্জে একটা কলেজের শিক্ষক। বাসায় থাকে বুদ্ধিতে খাটো কাজের ছেলে হাসান আলী। এখানে সামাদের কোনো বন্ধু নেই। সামাদ একা একজন মানুষ বা পুরুষ। গল্পের ব্যাসের ভেতরে প্রবেশের আগে সৈয়দ হকের সামাদের জটিল মনস্তত্ব জেনে নিলে সুবিধা হবে শিরিনের বয়ানে।

‘মাত্র কয়েকদিনে ভেতরেই শিরিন টের পেয়ে গিয়েছিল যে সামাদ যা করে, ভেবেচিন্তেই করে। তার সমস্ত কিছুর পিছনে আছে গাঢ় ভাবনা, গভীর সিদ্ধান্ত। সে ভাবনার হদিশ পায় না শিরিন। সে সিদ্বান্ত বিকট নিষ্ঠুর মনে হয় তার।’ -লিখেছেন সৈয়দ হক।

অনেকের মনে হতে পারে, সামাদীয় সঙ্করণের মানুষ সমাজ রাষ্ট্রে সত্যি আছে কী? এমন মর্ষকামী, হন্তারক মানুষ সংসারে থাকতে পারে? বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে জীবনের এমন নির্মম জটিল স্তরে নেমে যেতে পারে? আমরা সবকিছু খোলা চোখে, নিরপরাধ সুখের আলোয় সন্মোহন করি, তাই কিছুই দেখি না। সুন্দর সুজ্জিত শার্ট-প্যান্টের নীচে গরম এবং আগুনের মতো লাল লৌহশলাকার মতো মানুষ, নিজেকে আরও সজ্জিত বিন্যাসে সাজিয়ে গুছিয়ে গোপনে গোপন রাখে। সেই মানুষের ভেতরের অর্থহীন ক্রুদ্ধ লোলুপতা প্রকাশ করে চার দেয়ালের ভেতরের নিরীহ অর্ন্তমুখি প্রিয় স্ত্রীর ওপর। সৈয়দ হক অনেক ঘাটের পানির উপর সাঁতার কেটেছেন। পাঠ নিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যর বিপুল ভাণ্ডারের, লক্ষ্য করেছেন মানুষের গোপন মুখোশের ঘৃণিত পাদটিকা।

সেইসব ঘৃণিত পাদটিকার আলেয়া থেকে তৈরী করেছেন গল্প ‘গন্তব্য, অশোক’। দেখিয়েছেন, মানুষ বা পুরুষ কতোটা খেলারাম হয়ে উঠতে পারে, তার নন্দিত বিচ্ছুরণ। মানুষ, সে নারী হোক কিংবা পুরুষ- মানুষতো! রক্ত মাংসের মানুষতো বটেই। পরাজয় যতোই হোক নিজের ভেতরে খেলা তো চলতেই থাকে। সেই খেলা খেলতে খেলতে শিরিনের মধ্যেও একটা খেলার ঘুঁটি জেগে ওঠে।

অনেক সাহস সঞ্চয় করে একদিন স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, আমিও তো বলতে পারি, আপনি কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না। আপনার কলেজে কতো ছাত্রী আছে। তারা আমার ছাত্রী। আমি অধ্যাপক। এতোক্ষণে একটা উত্তর দেয় সামাদ। কিন্তু সে উত্তর যেন বর্শার মতো তীক্ষ্ণ। তা হোক। শিরিন ভয় কাটিয়ে উঠেছে।

ছাত্রীদের দেখে আপনার ইচ্ছে হয় না?

না।

তাদের কাউকে আপনার পছন্দ হয় না?

না।

কেন হয় না? তারা সুন্দরী না? আমার মতো বুক তাদের নেই? আমার মতো হাত পা? আমার মতো চুল? আমার মতো শরীর? শিরিন নিজেই বুঝতে পারেনি যে, প্রতিটি প্রশ্নে তার গলার পর্দা চড়ে যাচ্ছিল, চিৎকার করছিল সে। বুঝলো তখন, যখন প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিল সামাদ তার গালে। সমস্ত মুখটাতে আগুন ধরে গেলো। দাঁতে দাঁত পিষে সামাদ শুধু বললো- ‘শরীর দিয়ে আমাকে কেউ ভোলাতে পারে না, এই কথাটা জেনে রাখো।’

সামাদের আরো নির্দয় সম্ভোগের এককালে, খেলার মধ্যে খেলাটা মনে পড়ে শিরিনের। শিরিন চিঠি লেখে রুবিকে। রুবি মানুষ হয়েছে শিরিনদের বাড়িতে। দুজনে প্রায় একইবয়সী। রুবি চলে আসে, বেড়ানোর নাম করে। শিরিনের টোটাল বিপরীত মেরুর কন্যা রুবি। বাসায় রুবির হঠাৎ আগমনে রুষ্ট সামাদ। মনে হচ্ছে, তার এতোদিনের নিরঙ্কুশ শাসনের ও ত্রাস রাজত্বের মধ্যে উটকো এক ঝামেলা জুটেছে। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা দীর্ঘ বাক্যে রুবির আয়তক্ষেত্র সর্ম্পকে ধারনা নেয়া যেতে পারে। তিনি রুবি সর্ম্পকে লিখেছেন- ‘সারা শরীরে বেসামাল ঢেউ তুলে অবিরাম খসে পড়া শাড়ি টানতে টানতে খল খল করে হাসতে হাসতে রুবি মুহুর্তেই ভরে দেয় সামাদের সংসারে। এবং সামাদ একটি মন্তব্যও করে শিরিনকে- তোমার এই বোনটির একটা বাচ্চা থাকা উচিৎ ছিল। তাহলে লাগাম পরতো।’

একটা পাবশিক সংসারে একজন মানুষের, একজন নারীর আগমনে পাল্টে যায়। রুবি লেগে থাকে সামাদের পেছনে। হাসি ঠাট্টায় সামাদের লৌহকপাট মুখে আনে হাসির জেল্লা। সংসারের নানা ঘটনা, সংলাপ, বাক্যর আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে রুবি দিনের পর দিন আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। শিরিন টের পায়, বুঝতে পারে- শীতের রাতে শীতল সাপ ঢুকেছে তার নির্মম সংসারের চৌকাঠ পার হয়ে। মানুষের মন, নারীর মন কখন যে কোন ঘুঙুরের নৃত্যে কোথায় যে বীন বাজাবে, বোঝা বা অনুভব সম্ভব নয়। সেই অসম্ভব যাতনার পাশাখেলার পাশ থেকে শিরিনের মর্মবেদনা প্রকাশ করেন সৈয়দ হক, ‘হঠাৎ মর্মের ভেতরে শিউরে উঠল শিরিন। ঈর্ষা তাকে ছোবল দিয়েছে। একেবারে হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিতভাবে। যেন ঘর থেকে পা বাড়াতেই গোখরো সাপের মাথায় পা পড়ছে তার।’

আমরা জানতে পারি ‘গন্তব্য, অশোক’ গল্পের শিরিন এক সময়ে বাধ্য হয়ে স্বামী সামাদকে বলে, আপনি বলুন রুবিকে চলে যেতে। সামাদ জানিয়ে দেয়, সে বলবে না। তাহলে? পুরুষতো! হোক সে অধ্যাপক, বা গম্ভীর একজন। গড়ে তুলুক না কেন নিজের চারপাশে এক ধরনের লৌহকপাট। লৌহকপাট! যে কোনো লৌহকপাট যেকোনো নারী চাইলে বোতলের তরলের মতো গলিয়ে দিতে পারে সেই কপাট। শেষ পর্যন্ত গলে যায় কপট, তির তির করে নিভে যায় আলো। চারদিকে জমে ওঠে জমাট অন্ধকার, আরও ঘন নিকষ কালো অন্ধকার। সেই অন্ধকারের ভেতরে এক রাতে শিরিন নিজের চোখে দেখে রুবিকে কাতুকুতু দিয়ে হাসাচ্ছে সামাদ। দুজনেই দেখে শিরিনকে কিন্তু গ্রাহ্য করে না। গল্পটা কি এখানেই শেষ? হওয়া উচিৎ ছিল কি? গল্পকারই জানেন তিনি গল্প কোথায় শেষ করবেন। বুঝলাম, এখানেই শেষ। সামাদ নির্মোহ খুলে অজগর হয়ে ঢুকে যায় রুবির মখমল শরীরের নিশি-বৃন্দাবনে। দুজনে রচনা করে কামনাসিন্ধুর নির্লজ্জ মধুবন। তখন শিরিন কি করে বা করবে? নিজের সংসারের সাজঘরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করবে রক্তবাঁশির সুর?

আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয় না শিরিনের জন্য। গল্পকার, বাংলা গল্পের শ্রেষ্ঠ বংশীবাদক সৈয়দ শামসুল হক শিরিনের একটা ঠিকানার ব্যবস্থা না করেই গল্পের ছেদ টানতে পারেন না। আসুন, আমরা গল্পের শেষ তিনটি লাইনের পাঠ নিই। অংকের খাতা খুলে যোগ বিয়োগ করে গল্পকারের লেখা গল্পের অংকের সঙ্গে মিলাতে চেষ্টা করি। দেখি গল্প অংক মেলে কি না? সৈয়দ লিখেছেন- ‘যদি তারা দেখতে পেত, তাহলে দেখত, শিরিন সেই সন্ধ্যে থেকে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ভেতরে খাল পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে বুকের ভেতরের আগুন নিয়ে এমন একটা গ্রামের দিকে যাচ্ছে, যেখানে আর কোনো শোক নেই’।

উপসংহারে লিখতে পারি, এই গল্পের প্রধান চরিত্র শিরিনের সামনে আর কি করার ছিল?

অনেক কিছু করতে পারতো শিরিন। চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে পারতো। ঘরের দরজা জানালা ভেঙ্গে চুরমার করতে পারতো। রুবিকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারতো। সামাদকে খামচিয়ে রক্তাক্ত করতে পারতো। চারপাশের লোকজন ডেকে বিহিত চাইতে পারতো। কিন্তু শেষ ফলাফল কি হতো? আমরা, কিংবা গল্পকার সৈয়দ শামসুল হকও জানতেন না। সব গল্পের শেষ জানা যায়? জানা সম্ভব? জীবন তো এক অন্তহীন যাত্রা। কেবল যাত্রা আছে, বিরাম নেই, যতি চিহ্ন নেই। নেই কমা বা দাড়িও। নিমিষে জীবন চলে জীবনের চক্রে। সেই চক্রের আঁধারে নিপতিত একজন শিরিন নিজের মতো করে নিয়েছে প্রতিশোধ। আত্মহননকে কি প্রতিশোধ বলা যায়? কার সঙ্গে অভিমানে এই আত্মহত্যা? কিংবা নিজেকে বিসর্জন দেওয়া? আমি সংসারের একজনের সঙ্গে আত্ম-অভিমানে নিজেকে বিসর্জন দিলাম মৃত্যুর য়ুপকাষ্ঠে, তাতে সংসারের কি আসে যায়? কেউ কি মনে রাখে? প্রতিদিন, প্রতিরাতে কতো মানুষ প্রিয় মানুষের সঙ্গে অসহায় অভিমানে মৃত্যুর সঙ্গে করেছে পরম আলিঙ্গন। তারপর? চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে। কেউ মনে রাখেনি। সবাই জানে, অভিমানের কোনো খেয়া নেই।

শিরিন সব জেনেও গেছে সর্বনাশের দিকে। পরম যাত্রার দিকে। হয়তো, গল্পকারের সামনে কোনো পথও ছিল না। কি করবেন তিনি, নিরুপমা এই কন্যাকে নিয়ে! সুন্দর মৃত্যুই তখন হয়ে ওঠে আরাদ্ধ। মৃত্যু মুক্তির ঠিকানা কখনো কখনো। সেই দিকেই যেতেই শিরিন বাধ্য হয়। গল্পকার সৈয়দ হক প্রকৃতপক্ষে শিরিনকে মুক্তি দিয়েছেন। মানুষের মুক্তিই তিনি চেয়েছিলেন সব সময়ে।

এই লেখার শুরুতে হকের গল্পসমগ্রের তেষট্টিটি গল্প। সেই তেষট্টিটি গল্প থেকে মাত্র দুটি গল্প নিয়ে আমি আমার মতো করে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ লিখলাম। সৈয়দ শামসুল হক গল্পের কারিগর। গল্পের মতো জীবন, গল্প তিনি লেখেন না, গল্প তিনি আবিষ্কার করেন। গল্পের সঙ্গে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

লেখক: সাহিত্যিক

সারাবাংলা/এসবিডিই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন